ভোটের ফলে কিংবা সাংগঠনিক শক্তিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই ধরতে হয়। সেই দলকে ছাড়াই বৃহস্পতিবার সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে দেশটিতে। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে বাদ দিলেও ভোটে দলটির গুরুত্ব এখন প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
গত কয়েকদিনের সংবাদপত্রগুলোতে চোখ রাখলেই ধরা পড়ে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটই নৌকাবিহীন এই নির্বাচনে ফল নির্ধারণ করে দেবে। তাই বিএনপি, জামায়াত দুই দলেরই লক্ষ্য এখন আওয়ামী লীগের ভোটার।
আবার যে ‘ইনক্লুসিভ’ সমাজের কথা আউড়ে যাচ্ছিল ইউনূস এবং জুলাই অভ্যুত্থানকারীরা, আওয়ামী লীগকে বাদ দেয়ায় নির্বাচনটি যে ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে না, তা স্বীকার করতে হচ্ছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতো প্রতিষ্ঠানকেও।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ নির্বাচনী রাজনীতিতে বরাবরই আছে সামনের কাতারে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি হেরে গেলেও ভোট পেয়েছিল ৩০.০৮ শতাংশ, আর সরকার গঠনকারী বিএনপির ভোট ছিল ৩০.৮১ শতাংশ।
১৯৯৬ সালে ৩৭.৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি পায় ৩৩.৬২ শতাংশ। ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রায় দুইশ আসন জেতা বিএনপির ভোটের হার ছিল ৪০.৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ৬২ আসন জিতলেও ভোট পেয়েছিল ৪০.১৩ শতাংশ।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে, বিএনপি পায় ৩২.৫ শতাংশ ভোট। এরপরের তিনটি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকায় সেই হিসাব বাদ দিলেও আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকে না।
২০২৪ সালের নির্বাচনের সাত মাসের মাথায় এক অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তারপর দলটি তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুঃসময় পার করছে এখন। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নির্বাসনে রয়েছেন ভারতে, তার বাড়ি থেকে শুরু করে সারাদেশে দলটির কোনো অফিস অক্ষত নেই। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভাষ্যে, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ এর অংশ হিসেবে এই অভ্যুত্থানে তাদের টার্গেট করা হয়েছে।
এরপর ইউনূস সরকার এসে প্রথমে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করে। তারপর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপরও দেয় নিষেধাজ্ঞা। তা দেখে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করায় আওয়ামী লীগের ভোটে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

শেখ হাসিনার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সজীব ওয়াজেদ জয় তখনই বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে সুযোগ করে দেয়নি। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বলেন, পাশার দান উল্টে যাবে বলেই বঙ্গবন্ধুর এই দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হচ্ছে।
ভারতে থাকা শেখ হাসিনা এরই মধ্যে এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছেন। সোশাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা প্রচার করছেন – ‘নো বোট, নো ভোট’। বিদেশে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতারাও ভোট বর্জনের জন্য দেশে থাকা দলীয় সমর্থকদের আহ্বান জানাচ্ছেন।
এই সমর্থক কত? সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন জরিপে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা মোট ভোটারের ৩২ শতাংশের কম হবে না।
এই ‘৩২%’ ই এখন তুরুপের তাস হয়ে উঠছে ভোটে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মিত্রতার বন্ধন ছিড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়া বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই আওয়ামী লীগের ভোটারদের টানতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তাই আওয়ামী লীগের মন জয়ের জন্য এমন কথাও বলছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ওপর অবিচার করা হবে না। আবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহেরকে তার নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাউকে কাউকে নিয়ে ভোট চাইতেও দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া সম্প্রতি বিভিন্ন আসনে বিএনপির এমপি প্রার্থীদের আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে টানতে দেখা গেছে। জামায়াতও একই রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আবার হিন্দুদের আওয়ামী লীগের ভোটার ধরে নিয়ে তাদের মন জয়ের চেষ্টাও করছে দল দুটি। জামায়াত তো তাদের ইতিহাসের বিপরীতে গিয়ে এক হিন্দুকে প্রার্থীও করেছে।
প্রবীণ সাংবাদিক সোহরাব হোসেন তার এক কলামে লিখেছেন, ‘একটানা ১৫ বছরের শাসন ও তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমেছে সত্য, কিন্তু ভূমিধস হয়নি। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন যদি সর্বনিম্ন স্তরেও এসে থাকে, তারপরও তারা নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।’
তার মতে, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের অর্ধেক ভোটারও যদি কেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন, তারা যে দল ও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এখন আওয়ামী লীগের এই বিশাল সমর্থকরা কী করেন, তাই দেখার বিষয়। আর তা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিই দেখা যাবে।



