‘ক্যান্টনমেন্ট থেকে’ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনার অভিযোগ সামনে এনে এনসিপি যখন সেনাবাহিনীর মুখোমুখি, যখন তাদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে জামায়াত ও হেফাজতে ইসলাম; আওয়ামী লীগও দিয়েছে পাল্টা হুঁশিয়ারি।
দলটির মুখপাত্র সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা কারো নেই।
এনসিপি বিরোধিতা করলেও বিএনপি, জাতীয় পার্টি, কমিউনিষ্ট পার্টি বলছে, জনগণের সিদ্ধান্তের উপরই আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি ছেড়ে দিতে চায়।
আর গণ অধিকার পরিষদ এনসিপির দিকে ইঙ্গিত করে বলছে, সরকার পতনে সেনা কর্মকর্তাদের অবদান অস্বীকার করে বিভাজন তৈরির ষড়যন্ত্র চলছে।
আওয়ামী লীগবিরোধী দলগুলোর শক্তি ব্যবহার করে যে বৈষম্যবিরোধীদের আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতন হয়েছিল, সেই সংগঠনই খোলনলচে পাল্টে ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ বা এনসিপি নামে রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে সম্প্রতি।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিনিধিত্বও রয়েছে একমাত্র তাদেরই।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ’র এক ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দৃশ্যপটে ঘুরেফিরে আসছে সেনাবাহিনীর নাম।
ওই পোস্টে হাসনাত দাবি করেছিলেন, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে।
বিষয়টিকে তিনি ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে ‘নতুন একটি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন তার লেখায়।
হাসনাত দাবি করেন, তিনিসহ আরও দুই জনের কাছে গত ১১ই মার্চ দুপুর আড়াইটায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ওই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয় এবং তাদেরকে বলা হয়, তারা যেন আসন সমঝোতার বিনিময়ে ওই প্রস্তাব মেনে নেয়।

হাসনাতের ফেইসবুক স্ট্যাটাসে উত্তেজনার মধ্যে শুক্রবার রাতে সংবাদ সম্মেলন করে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কি পারবে না, এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা বা প্রস্তাবনা দেওয়ার এখতিয়ার সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো সংস্থার নেই।”
এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) শুক্রবার সকালে বিবিসি বাংলাকে জানায়, হাসনাত আব্দুল্লাহ’র স্ট্যাটাসের ব্যাপারে তাদের কোনও বক্তব্য নেই।
ভিন্ন প্রেক্ষাপটের দাবি
এনসিপি নেতা হাসনাত তার স্ট্যাটাসে যেমনটি জানিয়েছেন, ঘটনার ভিন্ন প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতিবিষয়ক সংবাদ নিয়ে কাজ করা একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তৈমুর ফারুক তুষারের ভাষ্যে।
দৈনিক কালের কণ্ঠের রাজনীতিবিষক সংবাদের এক সময়ের এই সমন্বকারী ফেইসবুক স্ট্যাটাসে দাবি করেন, ঘটনার শুরু সারজিস আলমের নতুন বউ নিয়ে সেনাবাহিনীর কিউএমজি ফয়জুরের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়ার পর।
তিনি লিখেছেন, “সারজিস নতুন বউ নিয়ে সেনাবাহিনীর কিউএমজি ফয়জুরের বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়েছিল। সঙ্গে ছিল হাসনাত ও আসিফ মাহমুদ। সেই বিশেষ ডিনারে উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। সেদিন দাওয়াতের আড়ালে মূলত জাতীয় নাগরিক কমিটিকে আগামী নির্বাচনে যাতে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করে সেটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। ফয়জুর আশ্বস্ত করলেও নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। তিনি হাসনাতদের সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।”
তৈমুর ফারুক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত একটি বাংলা সংবাদপত্রের সম্পাদক।
ওই স্ট্যাটাসে আরও লিখেন, হাসনাত, সারজিসরা একাধিকবার ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিল যেন নির্বাচনে সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু সেনাবাহিনী তাদের চাহিদা অনুযায়ী ভোটে অন্যায় সুবিধা দিতে রাজি হয়নি। কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পেয়ে এখন রঙ মাখিয়ে সেনাবাহিনীকে হেয় করার চেষ্টা করছে।”
পরবর্তীতে তৈমুর তার লেখার আপডেটে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম, আদিলুর রহমান রহমান খান শুভ্রও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান।
এনসিপি’র সহযোগীদের ভাষ্য
এদিকে, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তার ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্টে লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন জনগণ মেনে নেবে না।”
“আওয়ামী লীগের চ্যাপ্টার ৩৬ জুলাই ক্লোজড হয়ে গিয়েছে। নতুন করে ওপেন করার কোনই অবকাশ নেই।”
হেফাজতে ইসলামও একইরকম ভাষ্য নিয়ে পাশে রয়েছে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর।
জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটকে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “এ দেশের তৌহিদি জনতা তাদের বিদায় করেছে। তাদের পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। যদি দেশে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা আমাদের লাশের ওপর দিয়ে করতে হবে।”
আওয়ামী লীগের হুঁশিয়ারি
ওদিকে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা কারো নেই বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত।
অজ্ঞাত স্থান থেকে টেলিফোনে ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, “আমি যেটা জানি তা হলো, আওয়ামী লীগের যেভাবে পুনর্গঠনের কথা বলছেন তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এখনো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে। নেতৃত্ব পুনর্গঠনের কোনো সুযোগ আছে সেটা আমি মনে করি না। সেটা হবে না। আর দলকে পুনর্গঠন করা, সংগঠিত করা সেটা তো অন্য জিনিস। সেটা তো প্রতিনিয়ত হচ্ছে।”
“বাংলাদেশে এমন কোনো শক্তি নেই যে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে পারে। যে দেশ জন্ম দেয়, তাকে নিষিদ্ধ করা যায় না,” যোগ করেন তিনি।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে আরাফাত বলেন, “ইউনূস সরকারের অধীনে তো আমরা নির্বাচনে অংশ নেব না। আর আওয়ামী লীগ ছাড়া তো ইনক্লুসিভ নির্বাচন হবে না।”

জুলাই গণহত্যার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ জাতির কাছে ক্ষমা চাইবে কিনা প্রশ্নের জবাবে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আরাফাত বলেন, “৫ আগস্টের পর যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার জন্য ওরা ক্ষমা চাবে? আগেও বলেছি আমরা ক্ষমতায় থাকাকালে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার দায় আমাদের আছে। কারণ আমরা তো ক্ষমতায় ছিলাম। সেই দায় স্বীকার করে আমরা এটাকে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা কমিশন গঠন করেছি। জাতিসংঘকেও ডেকেছিলাম। কিন্তু ওরা তো এখন রাজনৈতিকভাবে এটাকে ব্যবহার করছে। ওরা প্রকৃত হত্যাকারীদের কেন খুঁজে বের করছে না? ৭.৬২ কাদের হাতে ছিলো?”
বিএনপির ইঙ্গিত
আওয়ামী লীগের আমলে সংসদের বাইরে বিরোধীদল হিসাবে বিগত বছরগুলোতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অবশ্য বলছেন, “গণহত্যা ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত নন, এমন কারও নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোনও বাধা নেই।”
রিজভীর বক্তব্যে বিএনপির অবস্থানের এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ ফিরলে, তাতে তাদের আপত্তি থাকবে না।
রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখানে হাজী শুকুর আলী মাদ্রাসাসংলগ্ন মাঠে শুক্রবার দুস্থদের মধ্যে ঈদসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
রিজভী বলেন, “যে লোক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসবেন, তিনি যদি অপরাধ না করেন, তিনি যদি ছাত্রহত্যা না করেন, তিনি যদি কোনো অর্থ লোপাট না করেন, টাকা পাচার না করেন; এ রকম লোক যদি নেতৃত্ব আসেন, তাহলে সেই আওয়ামী লীগ কেন রাজনীতি করতে পারবে না। আমার বক্তব্য হচ্ছে এটা।”
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন ডিডাব্লিউকে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারে এখনো ছাত্রদের দুইজন উপদেষ্টা আছেন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই- প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের পর তাদের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত। তারা যদি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একমত না হন তাহলে তাদের সরকার থেকে অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে যারা আন্দোলন করছে তাদের সঙ্গে শামিল হওয়া উচিত।”
জাতীয় পার্টির ভাষ্য
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবির বিরোধিতা করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরও।
শুক্রবার রংপুর নগরীর সেনপাড়ায় তার বাসভবন দ্য স্কাই ভিউতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে নই। আওয়ামী লীগ একটি দল, যারা দলের ভেতরে বাস করছে, তারা খারাপ হতে পারে। আওয়ামী লীগ একটি গাড়ি তার ড্রাইভার খারাপ হতে পারে কিন্তু গাড়িটা তো খারাপ না।”
বিপক্ষে কমিউনিস্ট পার্টিও
বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে। যে আলোচনা হওয়া দরকার সেটা হলো জুলাই গণহত্যার বিচার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। প্রফেসর ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে যা বলেছেন তা আইনি এবং নৈতিক জায়গা থেকে বলেছেন। আর যেসব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি করেছে সেটা তারা দলীয়ভাবে দাবি করতেই পারেন।”
নুরের দল যা বলছে
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক (নুর) বলেন, “গণ–অভ্যুত্থানে সামরিক বাহিনী যদি জনগণের পাশে এসে না দাঁড়াত তাহলে দেশে একটি গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতো। অথচ গণ–অভ্যুত্থানের পরে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে।”
শুক্রবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, “ছাত্র সমন্বয়কেরা তদবির করে আওয়ামী লীগের দোসরদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে, আর দোষ চাপাচ্ছে সেনাবাহিনী ও সরকারের ওপর।”
সরকারি সুযোগ–সুবিধা নিয়ে যারা দল গঠন করেছে, তারাও শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট দল হতে চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।