অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদে মুহাম্মদ ইউনূস বসার ঠিক আগেই বাতিল হয় তার সাজার রায়; এরপর তার বিরুদ্ধে করা শতাধিক মামলাও তুলে নেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের শাসনকালে ঝুলিয়ে রাখা কর অব্যাহতির সুবিধাও গ্রামীণ ব্যাংক ফিরে পায় ইউনূস ক্ষমতায় বসার পরপরই। এখন গ্রামীণ ট্রাস্টকে বিদেশে বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়া হলো।
সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর নোবেলজয়ী ইউনূস এই ব্যাংককে কেন্দ্র করে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানে ইউনূস চেয়ারম্যান। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের সরাসরি সংযোগ নেই, আবার আছেও। সবগুলো প্রতিষ্ঠানেরই কার্যালয় ঢাকার মিরপুরের চিড়িয়াখানা সড়কে একটি ভবনে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোরই একটি গ্রামীণ টেলিকম, যেট গ্রামীণফোনের এক তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিক। গ্রামীণ ট্রাস্টও এমন ধরনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান, যেটি দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থা ও সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
গ্রামীণ ব্যাংকের দর্শন ধারণ করে গ্রামীণ ট্রাস্ট বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়ে থাকে।
বিশ্বজুড়ে কাজ করলেও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগে রয়েছে সরকারের কড়াকড়ি। কিছু প্রতিষ্ঠানকে সরকার দেশের বাইরে বিনিয়োগের অনুমতি দিলেও ডলার সঙ্কটের কারণে গত কয়েক বছর ধরে এমন অনুমতি দেওয়া বন্ধই ছিল।
তার মধ্যেই নেপালি প্রতিষ্ঠানে গ্রামীণ ট্রাস্টের শেয়ারকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে রোববার দৈনিক সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে এক দশকের বেশি আগে নেপালের ক্ষুদ্রঋণদান প্রতিষ্ঠান নির্ধন উত্তান ব্যাংক লিমিটেডে এই শেয়ার পেয়েছিল গ্রামীণ ট্রাস্ট। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য সম্প্রতি শেয়ার ধারণকে বিদেশি বিনিয়োগের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

গ্রামীণ ট্রাস্টের স্বীকৃতির পর এখন দেশের বাইরে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াল ২৪টি।
আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর একটি প্রতিষ্ঠানে একই উপায়ে শেয়ার পেয়েছে গ্রামীণ ট্রাস্ট। শিগগিরই এই শেয়ারও বিদেশি বিনিয়োগের স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে বলে সমকাল জানিয়েছে।
ওই দুটি প্রতিষ্ঠানই পরিচালিত হয় বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক মডেলে। পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, কঙ্গো, ইয়েমেন, বলিভিয়া, যুক্তরাষ্ট্রেও গ্রামীণ ট্রাস্টের এমন কাজ রয়েছে।
সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালের ওই কোম্পানিতে গ্রামীণ ট্রাস্টের শেয়ার রয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ২৬৫টি বা ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যার বাজারমূল্য ৪ কোটি ৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৩ নেপালি রুপি।
নির্ধন উত্তান ব্যাংক ১৯৯৮ সালে নেপালের কোম্পানি আইনের আওতায় লাইসেন্স নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ২০১৭ সাল থেকে ব্যাংক অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট আইনের আওতায় লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে সম্প্রতি নির্ধন উত্তান লঘুবিত্ত বিত্তিয়া সংস্থা লিমিটেড (এনইউবিএল) হয়েছে। তাদের কৌশলগত জোট হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তালিকার এক নম্বরে রয়েছে গ্রামীণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ।
অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা হিসেবে ১৯৮৯ সালে গ্রামীণ ট্রাস্ট যাত্রা শুরু করে। এক দশক আগে নেপালের নির্ধন উত্তান ব্যাংকের ২ লাখ ১৪ হাজার ২৫০টি বা ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ শেয়ার পেয়েছিল গ্রামীণ ট্রাস্ট। তবে এতদিন তা বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে সমকাল জানায়, গ্রামীণ ট্রাস্টকে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে শুধু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য। এখানে দেশ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।
২০১৩ সাল থেকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১ সালে বিদেশে মূলধন বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি বিধিমালা জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিধিমালার আওতায় কেবল রপ্তানি আয় আছে, এমন প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ পাঁচ বছরের গড় রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অথবা সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের নিট সম্পদের ২০ শতাংশের মধ্যে যা কম, সেই পরিমাণ বিনিয়োগের আবেদন করতে পারে।
বিভিন্ন তথ্য ও সম্ভাব্যতা যাচাই, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি বিবেচনাসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত বাছাই কমিটি অনুমোদন নিয়ে এরপর বাইরে অর্থ নিতে হয়।
১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করা গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কর অব্যাহতি সুবিধা পেয়ে এলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় সেই সুবিধা বাড়ানো হচ্ছিল না। তার আগে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ইউনূসকে সরিয়ে দেওয়া হলে তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিবাদ চলতে থাকে।
তারমধ্যে ২০২১ সাল থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের কর অব্যাহতি সুবিধা বন্ধ করে দেয় শেখ হাসিনার সরকার। গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হলে দৃশ্যপট যায় বদলে।
ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।