বাংলাদেশ কি এখন ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’?

১০ নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রবেশদ্বারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় একজনকে।
১০ নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রবেশদ্বারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় একজনকে।

বলিউডের বক্স অফিস কাঁপানো মুভি ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’। এই সিনেমায় এমন একটি সমাজকে দেখানো হয়েছে যেখানে প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা, দুর্নীতি আর আধিপত্য নিয়ে সংঘাত ছিলো নিত্য দিনের খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

বাংলাদেশে গত কয়েক মাসে আধিপত্যের লড়াই, ভাড়ায় খুন এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী তৎপরতা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। আর অপরাধীরা রয়ে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

১০ নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রবেশদ্বারে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন তারিক সাইফ মামুন (৫৫) নামের এক ‘তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী’।

লাল রঙের একটি মোটরসাইকেলে মুখোশ পরা দুই ব্যক্তি মামুনকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি চালায়। ধারণা করা হচ্ছে দীর্ঘ দিনের কোন্দল থেকেই এই হত্যাকাণ্ড।

ঢাকা শহরের আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড এখন দগদগে। সেটি ঘটে এ বছরের ৯ জুলাইয়ের। ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী লাল চান্দ সোহাগ ওরফে সোহাগ নামের এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্য দিবালোকে মাথর মেরে মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করা হয়। স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই থেকে থেকে সেই হত্যকাণ্ড হয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য ছাড়াও স্থানীয়দের বয়ানে উঠে এসেছে।

এর বাইরে শুধু চট্টগ্রামে গেল আট মাসে নিশানা করে হত্যার অন্তত চারটি ঘটনা ঘটে। ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খোন্দকীয়া পাড়ায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগের সময় গুলিতে নিহত হন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা। আহত হন এরশাদ উল্লাহসহ চারজন।

তার আগে মার্চ মাসে বাকলিয়া একসেস রোড এলাকায় প্রাইভেট কার থামিয়ে গুলি করে দুইজনকে খুন করা হয়। মে মাস পতেঙ্গা সৈকতে গুলি করে খুন করা হয় আরেক তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া’ আকবরকে।

৭ অক্টোবর হাটহাজারীর মদুনাঘাট ব্রিজের কাছে একদল লোক প্রাইভেট কার আটকে রাউজানের ব্যবসায়ী আবদুল হাকিমকে গুলি করে হত্যা করে।

সিনেমার ’গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ এর মতোই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিশৃঙ্খলা,  চাঁদাবাজি, আধিপত্য নিয়ে খুন এখন যেন পুরো বাংলাদেশ জুড়ে স্বাভাবিক ঘটনা। ভয়, আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার এক জনপদ এখন সমগ্র বাংলাদেশ।

এই পরিস্থিতির মধ্যে সন্ত্রাসীদের দেখামাত্র সাবমেশিনগান (এসএমজি) থেকে ‘বার্স্টফায়ার’ নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ।

কোথা থেকে এল এত অস্ত্র?

জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানকালে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ৫,৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ১,৩৪২টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।

একই সময়ে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭২১টি উদ্ধার করা গেলেও এখনও ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৭টি গোলাবারুদ নিখোঁজ রয়েছে।

গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে রাজশাহী থেকে আসা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনে অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনী ৮টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় পাঁচ কেজি বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করে।

প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার পর এভাবে খোলা রাস্তায় ফেলে রাখা হয় ব্যবসায়ীর লাশ।

অভিযান সম্পর্কে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানায়, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য ছিল যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দেশে প্রবেশ করছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর একটি দল ট্রেনে অভিযান চালায়।

অভিযানে একটি বগি থেকে ৮টি বিদেশি পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬ রাউন্ড গুলি, ২.৩৮৭ কেজি গান পাউডার ও ২.২২৮ কেজি প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। এসব বিস্ফোরক ও গানপাউডার দিয়ে মূলত ককটেল ও হাতবোমা তৈরি করা হয় বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মাধ্যমে কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে দেশে অস্ত্র আসছে বলে জানিয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র। এসব অস্ত্র পাচারে রোহিঙ্গা চক্রের সদস্যরাই মূল ভূমিকা রাখছে।

এই অবস্থার মধ্যেই ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে মোবাইল সিম দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—যা নিয়ে নিরাপত্তা মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে রোহিঙ্গাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি ছিল না।

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার থেকে যেভাবে অস্ত্র প্রবেশ করছে, এমন পরিস্থিতি গত কয়েক বছরেও দেখা যায়নি। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের সাতটি পথে পাচারকারীরা নিয়মিতভাবে অস্ত্র আনছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১৪টি অস্ত্র, ১,৭২৫ রাউন্ড গুলি, ৩৯টি ম্যাগাজিন, ৯টি মর্টারশেল ও ১১টি গ্রেনেড জব্দ করা হয়েছে।

এর মধ্যে ছিল ২টি এসএমজি, ১২টি রাইফেল, ২টি রিভলভার, ৩৬টি পিস্তল এবং ৬২টি অন্যান্য অস্ত্র।

সীমান্ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে—এসব অস্ত্রের মূল গন্তব্য কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার সন্ত্রাসীদের আস্তানা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমার থেকে যেভাবে অস্ত্র প্রবেশ করছে, এমন পরিস্থিতি আগে কখনও দেখা যায়নি। এখন মাদক চোরাচালানের পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রও যুক্ত হয়েছে অস্ত্র ব্যবসায়, ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

দেশের অভ্যন্তরে অবৈধ অস্ত্র, সীমান্ত দিয়ে আসা আগ্নেয়াস্ত্র এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা—সব মিলিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

‘টার্গেট কিলিংয়ের’ একের পর এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ মঙ্গলবার বলেন, “চট্টগ্রাম মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে টার্গট কিলিং শুরু হয়েছে… চট্টগ্রাম মহানগরীকে আমরা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নিরাপদ অভয়ারণ্য হতে দিতে পারি না।

“এর জন্য যা যা করতে হয়, একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত যেত আমরা প্রস্তুত। এর বাইরে যেতে হলে তাও যাব।”

অনেকেই বলছেন, যদি এই প্রবণতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ উপমাটিও হয়তো অচিরেই বাস্তব রূপ পেতে পারে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads