খামেনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে চুপ, বাংলাদেশ নিন্দা জানাল ইরানের বিরুদ্ধে

আয়াতোল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে শোকাহত ইরানিরা। ছবি: তাসনিম নিউজ (ইরান)
আয়াতোল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে শোকাহত ইরানিরা। ছবি: তাসনিম নিউজ (ইরান)

ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে এই হামলা চালায়। এরপর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের মধ্যে উদ্বেগ জানিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারও একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে রোববার। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই বিবৃতি নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় উঠেছে সমালোচনার ঝড়। কারণ বিবৃতিতে ইরানে হামলার কোনো কথাই বলা হয়নি। বিপরীতে অন্য দেশগুলোতে ইরান যে পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তার নিন্দা জানানো হয়েছে।

গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালিয়েছিল, তখন তার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। প্রথমে ইসরায়েল হামলা শুরু করলেও পরে ওই হামলায়ও যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিয়েছিল।

গত বছরের ১৩ জুন দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ইরানে ইসরাইলের সামরিক হামলার নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানাচ্ছে বাংলাদেশ।

বিবৃতিতে বলা হয়, এ হামলা জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি ও ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তায় একটি গুরুতর হুমকি।

সব পক্ষকে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি একটি স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করার উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বানও জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।

মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে পাশে থাকার জন্য ইরান বাংলাদেশকে ধন্যবাদও জানিয়েছিল, যা ওই বছরের ২৬ জুন সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।

ঢাকার ইরান দূতাবাসের বিবৃতিতে তখন বলা হয়েছিল, “ইহুদিবাদী ইসরায়েল এবং তার সহযোগীদের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় নিন্দার জন্য ইরান কৃতজ্ঞ। আমাদের প্রতি অমূল্য সমর্থন ও সংহতি প্রকাশের জন্য আমরা বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতীম ও ভ্রাতৃপ্রতীম জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

সেবারের হামলায় ইরানের পারমাণিক কেন্দ্রগুলোই ছিল লক্ষ্যবস্তু; তাতে দেশটির বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী নিহত হয়েছিলেন। এবার গত শনিবারের হামলায় শুধু সর্বোচ্চ নেতাই নন, ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, প্রতিরক্ষা বাহিনীর শীর্ষ জেনারেলরাও নিহত হয়েছেন। হামলায় একটি স্কুলের শতাধিক শিক্ষার্থীও প্রাণ হারিয়েছে।

তবে বাংলাদেশে নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপির যে সরকার এসেছে, তাদের অবস্থান দেখলে ইরান গতবারের মতো ধন্যবাদ দিতে পারবে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিটি শুরু হয়েছে ইরানে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে। এতে বলা হয়, ইরানে হামলার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সে দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

কারা হামলা করেছে, সেদিকে না গিয়ে বিজ্ঞপ্তির পরের বাক্যটি হলো- বাংলাদেশ সতর্ক করে বলছে যে শত্রুতার ধারাবাহিকতা আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং বেসামরিক জনগণের কল্যাণকে আরও বিপন্ন করে তুলবে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং মতপার্থক্য নিরসনে কূটনৈতিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি।

এরপর ইরানের নাম না নিলেও তেহরানের পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনেরও নিন্দা জানাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

ইরান আক্রান্ত হওয়ার পর কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর এসেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ওই দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তারা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলেও।

বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হামলার নিন্দা জানিয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকায় এটা ভাবার অবকাশ রয়েছে যে ইসরায়েলে হামলার নিন্দাও জানানো হয়েছে, কারণ এটিও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার নিন্দা জানিয়ে ঢাকার রাজপথে রোববার মিছিল করেছে বিভিন্ন বামপন্থী ও ডানপন্থী দল। তারমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিটি নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে সমালোচনা।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্বে পালন করে আসা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমে/রিকা নিয়ে গেছে। প্রেস রিলিজের শুধু লোগোটা বদলে দিলেই মনে হবে হোয়াইট হাউজ থেকে এসেছে মাশাআল্লাহ। পররাষ্ট্রনীতিতে মাথা উঁচু করে বাঁচার দিন শেষ।”

তার এই পোস্টে ১৭০০ জন এরই মধ্যে মন্তব্য করেছে। তাদের কেউ কেউ পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে দুষেছেন। খলিলুর রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে কাটানো বিতর্কিত এই ব্যক্তিকে তারেক রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন।

ফেসবুকে একজন লিখেছেন, “বাংলাদেশের তথাকথিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, পাক-আফগান যুদ্ধে বাংলাদেশ কারো পক্ষ নিবে না, ফেয়ার এনাফ। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে আমরিকা-ইজরাইলের যুদ্ধ তিনি উল্টা ইরানের বিরুদ্ধেই কন্ডেনেমেশন জানালেন। এ তো দেখছি, খুল্লাম খুল্লা চাটাচাটি শুরু হয়ে গিয়েছে।”

আরেকজন লিখেছেন, “বাংলাদেশ মূলত ইরানের বিপক্ষে ও ই*সরা*য়েল-আমেরিকার পক্ষে অবস্থান নিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল তথা বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র নীতি কী হবে, সেটি পুরোপুরি স্পষ্ট। সরকার আমেরিকান ব্লকে ঢুকে পড়বে। বিপদের কারণ হবে চীনের সাথে কনফ্লিক্ট। দেশটির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভেঙে পড়া মনে হচ্ছে অনিবার্য হয়ে উঠবে। চীনের ঋণ ও বিনিয়োগ ছাড়া কি আমরা চলতে পারবো?”

প্রবাসী ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্যও বিএনপি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যে ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা’, ইরানের নাম নেয়নি ঢাকা। মানে বাংলাদেশের মতে ইরানের সার্বভৌমত্ব লংঘিত হয় নাই? ইরানের বাচ্চাদের স্কুলে আক্রমণ করা হইছে। সেইটার উল্লেখ করলেও বুঝতাম বিবেকের তাড়না আছে সামান্য হলেও। একটা রাষ্ট্রের প্রধান নেতা মারা গেছে, আপনি সমবেদনা জানাবেন না?

“আমি বাদই দিলাম সেই প্রশ্ন, যে কোনো আন্তর্জাতিক আইনে ইরানের উপরে মার্কিন-ইজরায়েলের হামলা বৈধ? চাটার তো একটা লিমিট আছে? তাই বলে এইভাবে চাটতে হবে?”

অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান সরকারের সমালোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সোশাল মিডিয়ায় সক্রিয়তা রয়েছে। তবে সেখানেও বিএনপি সরকারের ইরান নিয়ে অবস্থানেসর বিষয়ে কোনো সমালোচনা কিংবা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads