ক্রিকেটে রাজনীতিই থাকল, মন্ত্রী-এমপিদের ছেলে-বউ এল বোর্ডে

বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে আসা মির্জা ইয়াসির আব্বাস, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ, ইসরাফিল খসরু ও রাশনা ইমাম। তারা সবাই বিএনপি নেতার স্বজন।
বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে আসা মির্জা ইয়াসির আব্বাস, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ, ইসরাফিল খসরু ও রাশনা ইমাম। তারা সবাই বিএনপি নেতার স্বজন।

বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবিতে যেভাবে পরিবর্তনটি হলো, তাতে ২৫ বছর আগের কথা কারও মনে পড়তে পারে। সেবারও ঠিক একই কাজটি হয়েছিল। পার্থক্য কেবল এটুকুই যে শুধু মুখগুলো বদলেছে।

২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের কয়েকমাসের মধ্যে বিসিবির বোর্ড বা নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরীকে বাদ দিয়েছিল। কারণ সাবের হোসেন আওয়ামী লীগ করতেন। সেই প্রক্রিয়াটি তখন বেশ বিতর্তের জন্ম দিয়েছিল। অ্যাডহক কমিটি গঠন সঠিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়নি বলে সমালোচনাও হয়েছিল।

এবারও তাই ঘটল। বরং একটু বেশিই হলো বলে কারও কারও কাছে মনে হচ্ছে। কারণ দেখা যাচ্ছে যে ১১ সদস্যের বোর্ডে এমন চারজনকে নেওয়া হয়েছে, ক্রীড়ার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক কী, তা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। সেক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা ধরা যায়, তাদের কেউ মন্ত্রীর ছেলে, কেউ প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী, কেউ সংসদ সদস্যের ছেলে। আর অবধারিতভাবে তারা সবাই বিএনপির।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালে বিসিবিতে ছিল তাদেরেই একচ্ছত্র আধিপত্য। তবে নির্বাচনের মধ্যদিয়ে তা বৈধতা দেওয়া হতো। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পরিবর্তনের ফানুস উড়ালেও দেশের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া বোর্ড বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ গঠন হয়েছিল প্রভাবশালী উপদেষ্টার মনমাফিকই।

সেই হিসাবে গত দুই বছরে এনিয়ে চারবার বিসিবিতে পরিবর্তন এল। এবং এর কোনো পরিবর্তনই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। বরং দখলের মতোই হয়েছে এই পরিবর্তন, যার ছাপ এনিয়ে দেশের সংবাদপত্রগুলোর শিরোনামে স্পষ্ট। এনিয়ে সংসদেও উঠেছে আলোচনা।

বুধবার সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কটাক্ষ করে বলেছেন, বিসিবি ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে’ পরিণত হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারর আমলে তারা যখন সবকিছুতে প্রভাব খাটাতেন, তখনও একই পদ্ধতিতে পরিবর্তনটি হয়েছিল বিসিবিতে।

রাজনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব সবসময়ই ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে তা প্রকট হয়ে উঠেছে।

শুরুটা হয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থানের পর। ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাজমুল হাসান পাপনকে বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ছেলে নাজমুল হাসান আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারির সংসদি নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারে তিনি ক্রীড়ামন্ত্রীও হয়েছিলেন। তবে সাত মাস পর অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তার মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্যপদ চলে যায়। এরপর বিসিবি থেকেও বাদ দেওয়া হয় তাকে।

এরপর বিসিবি সভাপতির আসনে বসেন জাতীয় ক্রিকেটন দলের সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ। তিনি এর আগে আওয়ামী লীগ আমলেই প্রধান নির্বাচক ছিলেন। ফারুক বিসিবির সভাপতি হলেও দেশসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে দলে ফেরানোর বিষয়ে কিছু করেননি। আওয়ামী লীগের এমপি হওয়ার কারণে সাকিব ততদিনে দেশছাড়া।

তামিম ইকবাল এখন বিসিবির সভাপতি।

কিন্তু নয় মাসের মাথায় তাকে নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। অভ্যুত্থানের তরুণ নেতা আসিফ মাহমুদের মন জুগিয়ে চলতে না পারায় ফারুককে অপসারণ করা হয়। তার জায়গায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি করে।

এরপর নির্বাচনের মধ্যদিয়ে পদে থিতু হন বুলবুল। তবে গত অক্টোবরের ওই নির্বাচন ঘিরে অনেকটা প্রকাশ্যেই দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন বিএনপির নেতা ইশরাক হোসেন এবং তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।

সেই নির্বাচনের কিছুদিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে অনিয়মের এবং তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিলেন জাতীয় দলের সাবেক আরেক ক্রিকেটার তামিম ইকবাল। তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন ইশরাক হোসেন।

তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মধ্যে গত মঙ্গলবার একই প্রক্রিয়ায় বুলবুলকে সরিয়ে তামিমকে বসানো হলো বিসিবি সভাপতির চেয়ারে, আর তা নিয়ে কোনো আপত্তিই তুললেন না তিনি।

মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনরা বোর্ডে

বিসিবি সভাপতি বুলবু‍লের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে দিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে।

অ্যাডহক কমিটিতে আছেন- রাশনা ইমাম, আতহার আলী খান, মির্জা ইয়াসির আব্বাস, রফিকুল ইসলাম বাবু, সালমান ইস্পাহানি, তানজিল চৌধুরী, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, ইসরাফিল খসরু, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ ও ফাহিম সিনহা।

পরিচয় ঘাঁটতে গিয়ে দেখা যায়, মির্জা ইয়াসির আব্বাস প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ছেলে। সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে। ইসরাফিল খসরুর বাবা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। পেশায় আইনজীবী রাশনা ইমাম প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী।

এই প্রসঙ্গ ধরেই হাসনাত আবদুল্লাহ প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন যে বিসিবি ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে’ পরিণত হয়েছে। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জেলা কমিটিকে প্রভাবিত করে একতরফাভাবে বোর্ড গঠন করেছিলেন।

তবে বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্রীড়া সম্পাদক তাহমিদ অমিত বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এই বোর্ডটি একটি নির্বাচনকালীন বোর্ড। বলা হয়েছে যে তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন দেবে এই বোর্ড। এই বোর্ডের প্রধান প্রথমদিন বোর্ডে এসেই বললেন যে তিনি নির্বাচন করবেন। তাহলে অন্য যারা নির্বাচন করবে তাদের জন্য কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে?”

আইসিসি কি কিছু করতে পারে?

আমিনুল ইসলাম বুলবুল অ্যাডহক কমিটি ঘোষণার পর রাতেই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন কমিটিকে ‘অবৈধ’ ও ‘আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যায়িত করেছেন। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) হস্তক্ষেপও দাবি করেছেন তিনি।

কমিটি বাতিলের আগে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিসিবিতে অনিয়মের একটি তদন্ত করেছিল। কিন্তু আসিফ মাহমুদ তদন্ত কমিটির সামনে হাজিরই হননি। তিনি বলেছিলেন, এই তদন্ত বেআইনি ও মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নেই স্বায়ত্তশাসিত বোর্ডের কার্যক্রম তদন্ত করার।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলেও কিন্তু আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অভিযোগের কারণটা বোঝা যায়। তদন্ত কমিটির ১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের নবম পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে ক্রিকেট বোর্ডের সংবিধান মৌলিকভাবে যথেষ্ট নয়, যাতে স্বাধীন, ন্যায্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা যায় এবং সংবিধানের কাঠামোগত দুর্বলতা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যেখানে সনাক্তকৃত অনিয়মগুলো ঘটতে সুযোগ পেয়েছে।

অর্থাৎ, তদন্ত কমিটির দাবি অনুযায়ী. নির্বাচনে অনিয়ম হয়ে থাকলেও তা বিসিবির গঠনতন্ত্র মেনেই হয়েছে, আর সেক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করার আগে নির্বাচিত কমিটি ভেঙ্গে দেয়া ও নতুন অ্যাডহক কমিটির নিয়োগ কতটা আইনসম্মত হয়েছে, সে প্রশ্ন খুব একটা অযৌক্তিক নয়।

মঙ্গলবার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেশ করার সময় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক বলেন, নির্বাচনে অনিয়ম ও তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি আইসিসিকে অবহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, আইসিসির শরণাপন্ন হবেন তিনি। বুলবুল এক সময় আইসিসির কোচ হিসেবে চাকরি করেছিলেন।

এখন আইসিসি কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অভিযোগ বা ক্রীড়া পরিষদের বক্তব্যের ওপর খুব একটা নির্ভর করবে না বলে মনে করেন ক্রীড়া সাংবাদিক তাহমিদ অমিত।

তিনি বলেন, “আইসিসির একটি আলাদা সংস্থা আছে, যারা প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। কেউ অভিযোগ না দিলেও তারা নিজেদের মতো করে স্বাধীনভাবে তারা সেসব বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখে।”

এখন বিসিবির ঘটনায় আইসিসি কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন অমিত।

উদাহরণ হিসেবে তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের টানাপোড়েনের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কমিটি না ভাঙলেও অনেকবার বোর্ডের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এসেছে এবং অনেকবারই আইসিসি পদক্ষেপ নেয়নি।। কাজেই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইসিসি কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে আইসিসির সমঝোতার ওপর নির্ভর করে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads