বিএনপির বিশাল জয়ের আড়ালে যে অস্বস্তি

ভোট দিচ্ছেন তারেক রহমান। এই ভোটের ফল স্মরণ করিয়ে দেবে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে। এবারের মতোই একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল।
ভোট দিচ্ছেন তারেক রহমান। এই ভোটের ফল স্মরণ করিয়ে দেবে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে। এবারের মতোই একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল।

বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের ছেলে ববি হাজ্জাজকে প্রথম পরিচিতি পান জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এইচ এর এরশাদের উপদেষ্টা হয়ে। তারপর ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট নামে একটি দল গড়ে রাজনীতির মাঠে নামেন তিনি। কিন্তু তাতে হালে পানি পাননি।

তারপর হঠাৎ করেই বিএনপি ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজকে মনোনয়ন দেয়। ধানের শীষের হয়ে ভোট করতে তিনি নিজের গড়া দলও ছাড়েন। ভোটের মাঠে ববির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, হেফাজতে ইসলামের এই নেতা বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি গোঁড়া ইসলামী মনোভাবের জন্যও আলোচিত।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর জোটের প্রার্থী মামুনুল হকের সঙ্গে ববি হাজ্জাজের লড়াই হয় হাড্ডাহাড্ডি, শেষে তিন হাজার ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষ বিজয়ী হয় ওই আসনের মানুষের কাছে অনেকটাই অচেনা ববির হাত ধরে।

ভোটে মামুনুল জয়ী হবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু চিত্র বদলে যায় কয়েকদিন আগে। মামুনুল হকের গোঁড়া অবস্থানের পাশাপাশি নারীদের নিয়ে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের একটি পোস্ট আলোচনায় ওঠার পর। জামায়াত যদিও দাবি করে যে আমিরের এক্স একাউন্ট হ্যাক করে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছিল, তবে তা নিয়ে সন্দেহ করেন অনেকেই।

ওই ঘটনার পর মোহাম্মদপুর আসনের অনেকেই ফেসবুকে লেখেন যে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মামুনুলকে হারাতে তারা ভোট দিতে যাবেন। ভোট দেবেন ধানের শীষে, প্রার্থী যেই হোক। ভোট দেওয়ার পর ফল দেখে স্বস্তি প্রকাশের কথাও জানান তারা। এই দলে বিভিন্ন বাম আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন, ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী, আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন এমন কেউ কেউও ছিলেন।

এমন ঘটনা যে শুধু এই আসনে ঘটেছে, তা নয়, আরও অনেক আসনেই ঘটেছে। বাম দলের এক প্রার্থী, যিনি আগের বারের চেয়ে এবার অর্ধেকেরও কম ভোট পেয়েছেন, তিনি বলেন, এবার তার সমর্থক অনেকেও জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।

আওয়ামী লীগবিহীন ভোটের মাঠে বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে একাই তারা পেয়েছে ২০৯টি আসন। অর্থাৎ সরকার গঠন করতে তাদের কারো মুখাপেক্ষি হতে হবে না।

এই ভোটের ফল স্মরণ করিয়ে দেবে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে। এবারের মতোই একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল। সেবার বিএনপি ৩০টি আসনে জিতেছিল, যদিও ভোট পেয়েছিল ৩০ শতাংশের বেশি।

তবে ফারাকটা হলো এই যে এবার বিএনপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াত ৬৮টি আসনে জিতেছে, তাদের জোটসঙ্গীদের ধরলে আসন বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭টি। সংসদে এত বেশি আসনে আগে কখনও জেতেনি জামায়াত। এর আগে তাদের সর্বাধিক আসন ছিল ১৯৯১ সালে ১৮টি। জামায়াতের এই উত্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও চোখে পড়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৮৭ শতাংশের ওপরে। এবার ভোটের হার ছিল ৫৯ শতাংশ। ধরে নেওয়া যায়, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নিষেধাজ্ঞায় পড়া আওয়ামী লীগের বড় অংশ ভোটকেন্দ্রমুখো হয়নি। ধরে নেওয়া হয়, গড়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থন কমপক্ষে ৩০ শতাংশ করে হয়ে থাকে। সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ভোট যখন যেদিকে হেলে পড়ে, সেদল তখন ক্ষমতায় যায়।

ভোটের হার দেখাচ্ছে, মাঠের এক পাশ ফাঁকা, অন্য পাশে কাড়াকাড়ি করছে বিএনপি ও জামায়াত; এখন দেখার বিষয় সেই খেলায় কে জেতে।

২০০৮ সালে নবীন ভোটারদের বড় অংশ আওয়ামী লীগের পক্ষ নেওয়ায় তাদের ভোটের হার ৪৮ শতাংশে উঠেছিল। তাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারের এবং তরুণদের মন যোগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু বিএনপি কি তেমন িকছু করেছে? উত্তর আসবে- না।

ভোটের মানচিত্রে চোখ রাখলে দেখা যাবে, বিএনপি যে এলাকাগুলোতে আগে ভালো করত, সেই এলাকাগুলো ধরে রেখেছে। সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বিএনপি। আর জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারতবিরোধী জিগির তুলে আসা জামায়াত সাতক্ষীরা থেকে পশ্চিমে নওগাঁ অবধি সীমান্তের সব কয়ট আসনেই জিতেছে। আবার রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি তারা দখলে নিয়েছে। জাতীয় পার্টি এবার নির্বাচনে অংশ নিলেও নানামুখী বাধার মুখে পড়তে হয়, তারা কোনো আসনেই জেতেনি।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইসলামাইজেশনের যে ধারা বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, তাতে বিএনপির স্বস্তি বোধ করার কোনো কারণ নেই। সেই কারণে শেষ বেলায় বিএনপিকে হন্যে হয়ে বিভিন্ন আসনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ধরনা দিতে হয়েছে তাদের ভোট পাওয়ার আশায়। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বলতে হয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের সবাইকে নির্বিচারে হয়রানি করবেন না। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীরও বলেছেন একই কথা।   বলা হচ্ছে, ঠাকুরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন মির্জা ফখরুল। আরও আসনেও তাই ঘটেছে। একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াত ক্ষমতায় এল বলে- এই আওয়াজ তুলে বিএনপি নিজেদের ভোট বাড়িয়েছে। তবে এই ভোট যে বিএনপির স্থায়ী নয়, তা দলটির নেতাদের জানার কথা।

এটাই বিএনপির বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ানোর কথা। সেই সঙ্গে রয়েছে বিএনপির আদর্শিক অবস্থান। মধ্য ডানপন্থী দল বিএনপি যে বাম দিকে সরবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। এমনকি ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে আসা তারেক রহমানও নির্বাচনী প্রচারে ধর্মের কথাই বলেছেন। আবার ‘না’ ভোটের পক্ষে বলতে গিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতারা ধর্মের কার্ডই খেলেছেন, তারা বলেছেন, হ্যাঁ ভোট দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে না।

ধর্মের কার্ড বিএনপি আগেও খেলেছে, তবে তা আওয়ামী লীগকে হারাতে, সেই খেলায় বিএনপি সঙ্গী জামায়াতও ছিল। এবার ‍দুই পক্ষ দুই শিবিরে। তবে মোটা দাগে দুই পক্ষ আসলে একই দিকে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের বিভাজন রেখা আরো স্পষ্ট করে দিল।

ভোটের হার দেখলে বোঝা যায়, ভোটারদের অর্ধেকের কিছু বেশি ভোট দিয়েছেন। এই অংশের ভোটই বিএনপি ও জামায়াত ভাগাভাগি করেছে। বাকি প্রায় অর্ধেক ভোট দিতে যায়নি, এই অংশে রয়েছে আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল একটি অংশ।

এখন বিএনপি যদি মধ্য ডান থেকে বামে না হেলে তবে একদিকে থাকা বিএনপির সঙ্গে ওই অংশের কর্তৃত্ব পেতে লড়তে হবে জামায়াতের সঙ্গে। আর সেই লড়াইটা যে অত সহজ হবে না, তা ইসলামী দলগুলোর উত্থানেই টের পাওয়া যায়। মাঠের এক অংশ ফাঁকা থাকলেও অন্য অংশ থেকে বিএনপিকে হটিয়ে সেই অংশের দখল নিতে জামায়াত চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

বিএনপির নেতারা যে বিষয়টি টের পাচ্ছেন না, তা নয়। নির্বাচনের প্রচারে তারা জামায়াতকে পরাস্ত করতে একাত্তর, নারী স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। কিন্তু এতেই কি কাজ হবে, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ভোটের আগে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মন জোগানো কথা বললেও জয়ী হওয়ার পর জামায়াতের সমালোচনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগকেই অভিযোগ-বিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের নিপীড়ন-হয়রানিই জামায়াতের মতো ইসলামী দলগুলোর উত্থানের জন্য দায়ী।

কিন্তু এই কথাটি তিনি বলেননি, গত দুই যুগ ধরে কারা বিএনপিকে জোটের ছায়ায় রেখে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছিল, কারা জামায়াতের শীর্ষ নেতা দুই যুদ্ধাপরাধীর গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল। বিএনপি এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে?

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads