বিএনপির জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি হারাল কেন?

লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনের সময় নিজের কার্টুন ফেইসবুকে পোস্ট করে বাহবা কুড়িয়েছিলেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার পর তাকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন। এখন আর সেগুলো তার প্রোফাইলে দেখা যাচ্ছে না। ছবি: সংগৃহীত
লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনের সময় নিজের কার্টুন ফেইসবুকে পোস্ট করে বাহবা কুড়িয়েছিলেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার পর তাকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন। এখন আর সেগুলো তার প্রোফাইলে দেখা যাচ্ছে না। ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতায় যাওয়ার সুবাতাস কি পাচ্ছে বিএনপি? দলটির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কথায় অবশ্য তেমন আভাসই মিলছে। আর এই বাতাসে উড়ে যাচ্ছে দলটির জাতীয় সরকার গঠনের পুরনো প্রতিশ্রুতি।

ক্ষমতায় তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপির তখন দুঃসময়। বিরোধী অন্য দলগুলোকে বিএনপির কাছ থেকে দূরে সরাতে বেশ তৎপর ছিল আওয়ামী লীগ, অনেকটা সফলও হয়েছিল। সেই সময় বিএনপি আওয়াজ তুলেছিল জাতীয় সরকারের।

বিএনপির নেতারা তখন বলেছিলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে সব দলকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করবেন।

জাতীয় সরকারের কথা বললেও তার কোনো রূপরেখা বিএনপি দেয়নি। তবে একটি ধারণা দলটির নেতারা দিয়েছিলেন যে আওয়ামী লীগের বাইরে দলকে নিয়েই সরকার গঠন করবেন তারা।

এমন একটি সরকার ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনাও করেছিলেন সরকার গঠনের সময়। তিনি তার নাম দিয়েছিলেন জাতীয় ঐকমত্যের সরকার। তবে সেই সরকারে সবার অংশগ্রহণ ছিল না। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা যে মহাজোট সরকার গঠন করেন, বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকেও নিয়েছিলেন। তবে তাকে জাতীয় সরকার বলা হয়নি।

২০২৪ সালে অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতিই দিয়ে যাচ্ছিল বিএনপি।

ওই বছরের নভেম্বরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আমরা আগে থেকেই বলে আসছি যে, নির্বাচিত হয়ে আসলে আমরা একা দেশ চালাব না। আমরা একটা জাতীয় সরকার গঠন করে যারা আমাদের সাথে আন্দোলন করেছে, তাদেরকে নিয়ে দেশ চালাব।”

তারেক রহমান ২০২৫ সালের মার্চ মাসে লন্ডনে থাকা অবস্থায় ঢাকায় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে বিএনপির ইফতার অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “নির্বাচনে বিএনপি জনগণের রায়ে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলে গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং নির্বচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে।”

তারেক রহমান তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তখন বেঁচে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি লন্ডন থেকে দেশে ফেরার চার দিন পর মা মারা গেলে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তিনি।

তবে এর আগেই জাতীয় সরকারের কথা বিএনপি নেতাদের মুখ থেকে আর শোনা যাচ্ছিল না। এর মধ্যে মির্জা ফখরুলের এক কথায় অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত জানুয়ারি মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “নির্বাচনে জয়লাভ করলে আমরা একা সরকার গঠন করব না; বরং যারা আমাদের সাথে দীর্ঘ সময় রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তাদের নিয়েই একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। তবে এটি কোনো সর্বদলীয় সরকার হবে না।”

এরপর নির্বাচনের ঠিক আগে সম্প্রতি তারেক রহমান রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ও দলের আগের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেন।

বিএনপি চেয়ারম্যান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থাৎ দেড় শতাধিক আসন পাওয়ার বিষয়ে তিনি বেশ আশাবাদী।

এরপরই জাতীয় সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে তিনি বলেন, “আমি কীভাবে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে সরকার গঠন করব, তাহলে বিরোধী দলে কে থাকবে?”

জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করেই একথা বলেন তারেক, যে দলটি জাতীয় সরকার গঠনে আগ্রহ দেখিয়েছিল। জামায়াতকে নিয়েই ২০০১ সালে জোট সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতাকে মন্ত্রীও করা হয়েছিল তখন।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে একসঙ্গে জোটে থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতের মৈত্রী বন্ধন ঢিলে হতে থাকে জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে। দুই দলের নেতারা একে অন্যকে আক্রমণ করতে থাকেন। নির্বাচনের প্রচারে নেমে তা এখন আরও বেড়েছে।

তারেক রহমান থেকে শুরু করে বিএনপির সব নেতা এখন জামায়াতের একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার কথা সামনে আনছেন, যদিও এর আগে এই দলের শীর্ষনেতাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়ার কাজটি বিএনপিই করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ আমলে ওই দুজন যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত হয়ে ফাঁসিকাষ্টে যান।

অন্যদিকে জামায়াত নেতারাও বিএনপি আমলের দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে এখন উচ্চ কণ্ঠ; যদিও ২০০১ সালে তখন সরকারের অংশীদার তারাও ছিল।

আওয়ামী লীগশূন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে আভাস দেওয়া হচ্ছে। আর সেই কারণেই হয়ত বিএনপি এখন আর জাতীয় সরকারের প্রয়োজন দেখছে না।

এদেখে যে কেউ ভাবতেই পারে যে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে অনেক প্রতিশ্রুতিই দেয়, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তা ভুলে যায়। তবে বিএনপির ক্ষেত্রে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গটি একটু আগেই হলো।

এ সম্পর্কিত আরও খবর:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads