ট্রাম্প কি পারবেন তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে

President trump

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটির সংবিধান অনুসারে, কেউ দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবেন না। কিন্তু ট্রাম্প রবিবার এনবিসি নিউজ  চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি তৃতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে চান। আর এটি তিনি মজা করে বলেননি।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি দ্বিতীয় মেয়াদের পরও পদে থাকতে চান? এর আগে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন এবং কখনো কখনো বলেছেন, তিনি মজা করছেন। তবে এবার উপস্থাপক ক্রিস্টেন ওয়েলকারকে ট্রাম্প বলেন, “এমন কিছু পদ্ধতি রয়েছে, যার মাধ্যমে এটি করা সম্ভব।” এবার তিনি স্পষ্ট করে জানান, এটি কোনো রসিকতা নয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনবার দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করার কিছু “পদ্ধতি” রয়েছে। যদিও তিনি নিশ্চিত কোনো “পরিকল্পনা” উল্লেখ করেননি।

ট্রাম্প বলেন, “আমি মজা করছি না… অনেক মানুষ চায় আমি এটি করি। আমি সাধারণত তাদের বলি, এখনো অনেক পথ বাকি।” 

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে তার বয়স হবে ৮২ বছর। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের “সবচেয়ে কঠিন কাজ” চালিয়ে যেতে চান? উত্তরে তিনি বলেন, “আমি কাজ করতে ভালোবাসি।” 

তিনি এবারই প্রথম এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, তা নয়। জানুয়ারিতে তিনি সমর্থকদের বলেছিলেন, “একবার নয়, দুইবার, এমনকি তিন বা চারবার প্রেসিডেন্ট হওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান হবে।” তবে পরে তিনি বলেন, এটি ছিল “ভুয়া সংবাদ মাধ্যমের জন্য একটি রসিকতা।”

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান কী বলে

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী: “কেউ দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবেন না। এছাড়া যদি কেউ অন্য কারও নির্বাচিত মেয়াদের দুই বছরের বেশি সময় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে তিনি আর একবারের বেশি নির্বাচিত হতে পারবেন না।”

সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের তিন-চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্যের সরকারকেও এটি অনুমোদন করতে হবে।

ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এছাড়া, ৫০টির মধ্যে ১৮টি অঙ্গরাজ্যের আইনসভা ডেমোক্র্যাটিক দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ২২তম সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য ও আইন উভয়েরই লঙ্ঘন হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সংশোধনী গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে ‘নির্বাচিত রাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি এড়ানো যায়।

এই সংশোধনী ১৯৪৭ সালে কংগ্রেসে গৃহীত হয় এবং ১৯৫১ সালে অঙ্গরাজ্যগুলোর সম্পূর্ণ অনুমোদনের মাধ্যমে সংবিধানের অংশ হয়। ১৮০৪ সালে অনুমোদিত ১২তম সংশোধনীর সঙ্গে এটি আইনিভাবে যুক্ত। ২২তম সংশোধনী ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতার বিষয়েও প্রভাব ফেলে।

ট্রাম্প কীভাবে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন

সংবিধানের ২২তম সংশোধনীর সীমাবদ্ধতা এড়ানোর সবচেয়ে সরাসরি আইনগত উপায় হলো এটি বাতিল করা। তবে এটি একটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া। এটি একটি নতুন সংশোধনী পাসের মাধ্যমে করতে হবে।

প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রথমে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হতে হবে। এরপর এটি তিন-চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় অনুমোদিত হতে হবে।

এ পর্যন্ত হাজারো সংশোধনী প্রস্তাবিত হলেও, কেবল একটি সংশোধনী বাতিল হয়েছে—১৮তম সংশোধনী। সেটি মদ নিষিদ্ধকরণের আইন প্রণয়ন করেছিল।

জানুয়ারিতে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে মনোনয়নের পর শুনানিতে পাম বন্ডি বলেন, ট্রাম্প ২০২৮ সালে তৃতীয়বার নির্বাচন করতে পারবেন না। সেনেটর ক্রিস কুনসের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “যদি না সংবিধান পরিবর্তন করা হয়।”

ওই মাসেই টেনেসির প্রতিনিধি অ্যান্ড্রু ওগলস একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যাতে ২২তম সংশোধনীর সীমাবদ্ধতা পরিবর্তন করে ট্রাম্পকে তৃতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়।

এই প্রস্তাবের ওপর এখনো ভোট হয়নি। কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২তম সংশোধনী অনুমোদিত হওয়ার পর থেকে এটি বাতিলের জন্য বহু প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

এটি কার্যকর হলে ট্রাম্পই একমাত্র যোগ্য প্রার্থী হতেন। কারণ বারাক ওবামা, বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ বুশ পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ট্রাম্প ২০১৬ সালে জয়ী হয়ে ২০২০ সালে হেরেছিলেন। এরপর ২০২৪ সালে আবার জয় পান।

তবে সংবিধান সংশোধনের কঠোর প্রক্রিয়ার কারণে ওগলসের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। যদিও এটি আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

ট্রাম্পের সমর্থকরা মনে করেন, সংবিধানে একটি ফাঁক রয়েছে, যা আদালতে এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। তাদের দাবি, ২২তম সংশোধনী শুধু কাউকে দুইবারের বেশি “নির্বাচিত” হতে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু “উত্তরাধিকারসূত্রে” দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেনি।

এই যুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প কোনো অন্য প্রার্থীর, যেমন তার নিজের সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের সহপ্রার্থী হতে পারেন। তারা জয়ী হলে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট শপথ নেওয়ার পরই পদত্যাগ করতে পারেন। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন।

সাবেক উপদেষ্টা ও পডকাস্টার স্টিভ ব্যানন বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন ট্রাম্প আবার নির্বাচন করবেন এবং জয়ী হবেন। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কিছু “বিকল্প পথ” রয়েছে।

ট্রাম্পের তৃতীয় মেয়াদের বিরোধি কারা

ডেমোক্র্যাটরা এ বিষয়ে কঠোর আপত্তি জানিয়েছেন। নিউইয়র্কের প্রতিনিধি ড্যানিয়েল গোল্ডম্যান ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসনে প্রধান আইনজীবী ছিলেন। 

তিনি বলেন, “এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও গণতন্ত্র ধ্বংসের আরেকটি প্রচেষ্টা। যদি কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা সংবিধানে বিশ্বাস করেন, তবে তারা ট্রাম্পের তৃতীয় মেয়াদের আকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা করবেন।”

ট্রাম্পের নিজ দলেও অনেকে একে ভালো উদ্যোগ মনে করছেন না। ওকলাহোমার রিপাবলিকান সেনেটর মার্কওয়েন মুলিন ফেব্রুয়ারিতে বলেন, তিনি ট্রাম্পকে আবার হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবেন না।

তিনি এনবিসিকে বলেন, “আমেরিকার জনগণ না চাইলে সংবিধান পরিবর্তন হবে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেমের নির্বাচন আইন বিষয়ক অধ্যাপক ডেরেক মুলার বলেন, “সংবিধানের ১২তম সংশোধনী অনুযায়ী যিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অযোগ্য, তিনি ভাইস-প্রেসিডেন্টও হতে পারবেন না।”

তার মতে, যদি কেউ দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকেন, তবে তিনি ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থীও হতে পারবেন না। তিনি মনে করেন না, প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা এড়ানোর কোনো সহজ উপায় আছে।

বোস্টনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সংবিধান বিশেষজ্ঞ জেরেমি পল সিবিএস নিউজকে জানান, তৃতীয় মেয়াদের পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য আইনি যুক্তি নেই।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির সংবিধান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাইকেল সি. ডরফ বলেন, কিছু বিশেষজ্ঞ অনুমান করেছেন যে ২২তম সংশোধনী বাতিল না করেও তৃতীয় মেয়াদ পাওয়ার কিছু আইনি ফাঁক থাকতে পারে। তবে এসব যুক্তি এখনো আদালতে পরীক্ষিত হয়নি।

তিনি বলেন, “২২তম সংশোধনী ট্রাম্পকে তৃতীয়বার নির্বাচিত হওয়া থেকে বিরত রাখে। কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন থেকে নয়। আমি এটিকে একটি দুর্ভাগ্যজনক খসড়া ত্রুটি বলে মনে করি।”

কিছু ব্যক্তি আইনি ভিত্তি ছাড়াই দাবি করেছেন, ২২তম সংশোধনী কেবল পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য প্রযোজ্য। গত মাসে, নিউইয়র্কের প্রতিনিধি ড্যান গোল্ডম্যান এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যেখানে এই ব্যাখ্যাকে ভুল বলে উল্লেখ করা হয়।

ডরফ বলেন, ভাইস-প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করলে তা আইনি ও রাজনৈতিকভাবে জটিল হবে এবং ১২তম সংশোধনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আসতে পারে।

অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ মনে করেন, তৃতীয় মেয়াদের জন্য কোনো ফাঁকফোকর নেই।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ ডেবোরা পার্লস্টেইন এক ইমেইলে বলেন, “সংবিধানে খুব কম বিষয় এত স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যতটা এটি প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের সীমা নিয়ে স্পষ্ট। এই সংশোধনীর খসড়া প্রণয়ন ও অনুমোদনের ইতিহাস দেখায় যে, এটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে কেউ দীর্ঘ সময় ধরে একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে না পারে।”

পার্লস্টেইন আরও যুক্তি দেন যে, ১২তম সংশোধনীও এই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালনের জন্য সংবিধান অনুযায়ী অযোগ্য। বিষয়টি এখানেই শেষ।”

ব্যতিক্রমী উদাহরণ

ফ্র্যাংকলিন ডেলানো রুজভেল্ট চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি চতুর্থ মেয়াদের তিন মাস পর ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে মারা যান।

মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এসব কারণেই তার দীর্ঘ মেয়াদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

তখন প্রেসিডেন্টের জন্য দুই মেয়াদের বাধ্যবাধকতা আইন হিসেবে ছিল না। দুই মেয়াদের এই প্রচলিত রীতি ওয়াশিংটন ১৭৯৬ সালে তৃতীয়বার প্রার্থী না হয়ে স্থাপন করেছিলেন।

রুজভেল্টের মৃত্যু ও ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের সমাপ্তির পর কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা ১৯৪৭ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেন। তারা ১৯৪০ ও ১৯৪৪ সালের দলীয় ঘোষণায় এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যাতে আমেরিকার শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা যায়।

তাদের যুক্তি ছিল, প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা নির্ধারণ দেশকে একনায়কতন্ত্র থেকে রক্ষা করবে। এটি শুধু ওয়াশিংটন প্রতিষ্ঠিত দুই মেয়াদের ঐতিহ্যকে আইনে পরিণত করেছে।

১৯৪৭ সালে প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য আর্ল সি. মিচেনার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ দুইবারের চার বছর করে সীমিত করার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এটি ২৮৫-১২১ ভোটে অনুমোদিত হয়। পরের মাসে, সংশোধিত সংস্করণটি সেনেটে পাস হয়। সেখানে কেবল ডেমোক্র্যাটরা এর বিরোধিতা করেন।

১৯৫১ সালে মিনেসোটা ৩৬তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে এই সংশোধনী অনুমোদন করে। এরপর ১ মার্চ এটি কার্যকর ঘোষণা করা হয়।

আরও পড়ুন