প্যাঁচ লেগেছে গণভোটের ফলে; এক আসনে ভোট পড়েছে ২৪৪ শতাংশ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।

আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের হিসেবে বড় ধরনের গড়মিল ধরা পড়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত ফলাফলে এমনও আসনের হদিস মিলেছে যেখানে ভোট পড়ার হার ২৪৪ শতাংশ।

এবার মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন, যাদের মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।

প্রদত্ত ভোটের হিসেবে ৬০.২৬ শতাংশ ভোটার গণভোটে তাদের মত জানিয়েছেন। আর বাতিল বা অবৈধ হয়েছে ৭৪ লাখ ২ হাজার ২৮৫টি ভোট।

টিবিএস বাংলা এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, নির্বাচন কমিশন গণভোটের যে ফল প্রকাশ করেছে তাতে বড় ধরনের গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে।

গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে পত্রিকাটি জানায়, রাজশাহী-৪ আসনে ২৪৪.২৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে, যেখানে খাতায় কলমে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৯ জন।

তবে ভোট পড়ার হিসেবে দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৩টি।

এই আসনে ‘না’ ভোটের পক্ষে পড়েছে ৬ লাখ ১২ হাজার ২২৯ ভোট এবং ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে পড়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮২ ভোট।

অবিশ্বাস্য ভোটে তালগোল পাকানো এই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল বারী সরদার।

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গণভোট পড়ার হার দেখানো হয়েছে মাত্র ৭.৮৯৯ শতাংশ, যা একই দিনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে পড়া ভোটের তুলনায় অনেক কম।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটিতে ভোট পড়েছে ৬০.৮৩ শতাংশ। ১ লাখ ১৬ হাজার ৬১৩ ভোট পেয়ে এই আসনে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী সেলিম রেজা।

শুধু রাজশাহী বা সিরাজগঞ্জ নয়, নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪ এবং নেত্রকোনা-৫ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ওই আসনগুলোর মোট ভোটারের চেয়েও বেশি দেখানো হয়েছে।

এরমধ্যে নেত্রকোনা-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৬৮৬ জন হলেও ‘হ্যাঁ’ তে ভোট পড়েছে ৫ লাখ ২ হাজার ৪৩৮টি। অথচ সেখানে প্রদত্ত মোট ভোটের সংখ্যার স্থলে দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৮ ভোট এবং ভোট পড়ার হার দেখানো হয়েছে ৫৬.৬৫৯ শতাংশ।

নেত্রকোনা-৪ ও নেত্রকোনা-৫ আসনেও একইভাবে ভোটের হিসেবে গরমিল ধরা পড়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল এবার।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পড়েছে মোট ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ ভোট এবং ‘না’-এর পক্ষে পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে গণভোট প্রদানের গড় হার ৬০.২৬ শতাংশ।

ভোটের এই হিসেবেও গড়মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী।

তিনি হিসেব করে দেখিয়েছেন, দুটো যোগ করলে হয় ৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৬ জন। সে হিসেবে গণভোটে প্রদত্ত হার হওয়ার কথা ৫৫.৩৪ শতাংশ, যা নির্বাচন কমিশনের গণভোটের হারের চেয়ে ৪.৯২ শতাংশ পয়েন্ট কম।

সাইফুল আলম মনে করেন, এক্ষেত্রে একটি যুক্তি হতে পারে ওই ৪.৯২ শতাংশ পয়েন্ট ভোট বাতিল হয়ে গেছে।

“যদি সেটি ধরেও নেই, তাহলে বাস্তবসম্মত হবে কী না সে প্রশ্ন উঠবে। কারণ এটি ধরলে ৫১ লাখ ৮ হাজার ৪৭২টি ভোট বাতিল হয়ে গেছে। সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৭৬১টি। সে হিসেবে প্রতি কেন্দ্রে গড়ে ১২০টির বেশি ভোট বাতিল হয়েছে।”

এদিকে, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১১টি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে পার্বত্য তিন জেলার তিনটি এবং গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে ‘না’ জয়ী হয়েছে।

এরমধ্যে খাগড়াছড়ি আসনে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে পড়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৫ ভোট এবং ‘না’ এর পক্ষে পড়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪২ ভোট।

রাঙামাটি আসনে ‘হ্যাঁ’ এর চেয়ে ‘না’ ভোট ১ লাখ ৮ হাজার ১০৬টি বেশি পড়েছে। বান্দরবানেও ‘না’ ভোট ১৮ হাজার ৭৩৯টি বেশি পড়েছে।

গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই ‘হ্যাঁ’ এর চেয়ে প্রায় তিন গুণ ভোট পড়েছে ‘না’ তে।

গোপালগঞ্জ-১ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫৪ হাজার ৭১৬টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ২৯৮টি। গোপালগঞ্জ-২ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৪ হাজার ৩০২টি এবং ‘না’ ভোট ১ লাখ ৭ হাজার ২৯০টি। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৩ হাজার ৪৯৮টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৯৩ হাজার ৩৬৮টি।

এছাড়া অন্য যে আসনগুলোতে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঝিনাইদহ-১, সুনামগঞ্জ-২, চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-১২ এবং রাজশাহী-৪।

‘না’ ভোট বেশি পাওয়া এই ১১টি আসনের মধ্যে ১০টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে জয়ী হয়েছেন। শুধু রাজশাহী-৪ আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী।

এদিকে, গণভোটের হিসেব নিয়ে শোরগোল শুরু হলে রাতে সিরাজগঞ্জ-১ ও রাজশাহী-৪ আসনের গণভোটের ফলাফল পরিবর্তন করে নতুন ফল প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।

ভোটের সংখ্যায় ঘষামাজার পর শতকরা হার ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা বেড়েছে, কমানো হয়েছে ‘না’ ভোটের সংখ্যা।



আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads