একটি ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিকৃতি নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় চলছে তীব্র বাদুনাবাদ। একপক্ষ বলছে, এটি বিগত সরকারের সময়ের মঙ্গল শোভাযাত্রার দৃশ্য; অন্যপক্ষের দৃঢ় অবস্থান- এর সঙ্গে মঙ্গল শোভাযাত্রার কোনো যোগসূত্র নেই, সেটি ছিল আওয়ামী লীগের দলীয় শোভাযাত্রা।
‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যায়িত করে এবারের চারুকলার বৈশাখের আয়োজন থেকে ২৬তম ব্যাচ সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর অনেকেই এর দায় দিচ্ছেন বর্তমান সরকার সংশ্লিষ্টদের।
কারণ রীতি অনুযায়ী, এবারের বৈশাখের আয়োজন ওই ব্যাচের তত্ত্বাবধানে হওয়ার কথা ছিল।
এর মাঝেই অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল একটি ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিকৃতির ছবি সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে সঙ্গে লিখে দেন- “তখন বৈশাখটা কেমন ছিল? এই নোংরামির জন্য কেউ ক্ষমা চেয়েছে?।”
আসিফ নজরুলের পোস্ট করা ছবিতে দেখা যায়, গোলাপী শাড়ি পরানো এবং হাতে পেট্রোল বোমা ধরিয়ে দেওয়া একজন নারীর প্রতিকৃতি ট্রাকের উপর দাঁড়া করিয়ে রাখা হয়েছে।
নিজের ভ্যারিফায়েড ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে ওই পোস্ট প্রকাশের পর মন্তব্যের ঘরে প্রায় ছয় হাজার প্রতিক্রিয়া এসেছে, শেয়ার হয়েছে এক হাজারের বেশি।

ওই পোস্ট ঘিরে কেউ কেউ আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ এনেছেন, আবার কেউ বলছেন সেটি ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মঙ্গল শোভাযাত্রার দৃশ্য। সহমত পোষণ করেও তার পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেক অনুসারী।
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরিফ জেবতিক ওই পোস্টের একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে আসিফ নজরুলের সমালোচনা করে লিখেছেন, “চারুকলার সার্বজনীন শোভাযাত্রাকে বিতর্কিত করতে আসিফ নজরুল আবারও মিথ্যাচার করলেন। আওয়ামী পন্থিদের ক্যাম্পেইনের ছবিকে চারুকলার শোভাযাত্রার ছবি হিসেবে প্রচার করছেন উনি।”
পোস্টের নিচে আবরার শাহরিয়ার শাফি নামে একজন লিখেছেন, “আপনার ক্লেইমকে সাপোর্ট করে এমন কোন পুরাতন আর্টিকেল অথবা নিউজ লিংক সংযুক্ত করেন। এই ছবিটা সব সময় সোশাল মিডিয়াতে প্রচার হয়ে আসছে মঙ্গল শোভাযাত্রার ছবি হিসেবেই। আপনার এই পোস্টের আগ পর্যন্ত আমিও তাই জানতাম।”
পারভীন রূপা নামে আরেকজন যুক্তি খণ্ডন করে লিখেছেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রার ভেতর কখনো এইভাবে গাড়ি, ট্যাক্সি ঢুকেছে কখনো? আজব!!! একটা আসিফ বেকুব।”
“বাংলাদেশের একমাত্র গুজব উপদেষ্টা হইলো আসিফ নজরুল,” মন্তব্যের ঘরে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম মণ্ডল নামে একজন।
ভিন্ন একটি পোস্টে ওই একই ছবি শেয়ার করে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নির্দেশক অপরাজিতা সংগীতা দাবি করেছেন, “ঘটনা হলো, ২০১৪ সালে জামাত-বিএনপি যখন সারাদেশে টানা অবরোধ এবং পেট্রোল বোমা হামলা চালাচ্ছিলো সেই সময়ে একটি সংগঠন আয়োজিত প্রোগ্রামের ছবি এটি।
“আওয়ামী লীগের সমালোচনা করার লজিক্যাল অনেক বিষয় আছে। হুদাই এসব মিথ্যা গল্প বানানোর কী দরকার বুঝি না!”

তিনি আরও লিখেছেন, “এই ছবিটা ক্রপ করে নিচের অংশ বাদ দিয়ে ভাইরাল করা হয়েছে। পুরো ছবিটায় পরিষ্কার দেখা যায় এটা ট্রাকের উপর রাখা। একটা গ্রুপ এটাকে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার ছবি বলে এবারের শোভাযাত্রা নিয়ে তৈরি করা সার্কাসকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ট্রাকে কোনো মোটিফ ক্যারি করা হয় না।”
ছবিটির ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা ঘটেছে। কারণ গুগলে কোনো সংবাদপত্রে এরকম ছবির সন্ধান মেলেনি, যেটি পাওয়া গেছে সেটি এ সময়ের আলোচিত ও সমালোচিত ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট, পিভট্টাচার্য ডটকমে।
২০১৯ সালের ৮ মে প্রকাশিত ওই ব্লগেও অবশ্য ছবিটির খণ্ডিত অংশ জুড়ে দিয়ে পিনাকী ভট্টাচার্য শিরোনামে লিখেছিলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রায় খালেদা জিয়ার প্রতিকৃতি এবং তার হাতে পেট্রোল বোমা!’
ওই ব্লগে তিনি লিখেছিলেন, “যদি বলা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা আওয়ামী বিরোধীদের ডিমনাইজ করার একটা সাংস্কৃতিক প্রকল্প, এই অভিযোগ চারুকলা কিভাবে খণ্ডাবে?

“আওয়ামী লীগের মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আলগা আগ্রহের কারণ এইটাই যে এই শোভাযাত্রাকে ব্যবহার করে সে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দানবরূপে উপস্থাপনের সুযোগ পায়। এর আগে মঙ্গল শোভাযাত্রায় দাঁড়ি টুপিকে ইসলামী পোশাককে ডিমনাইজ করা হয়েছে। এবার এসেছে খালেদা জিয়ার প্রতিকৃতি, তার হাতে পেট্রোল বোমা। কোন এক মঙ্গল শোভাযাত্রার এই ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে এভাবেই গতকাল থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এভাবেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যুগে যুগে ডিমনাইজ করা হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রায়। পরিকল্পিত ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বলেন, “লক্ষ্য করলে দেখবেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যে ছবিটি শেয়ার করেছেন তার সঙ্গে পিনাকী ভট্টাচার্যের ছবির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুটো ছবিরই নিচের অংশ ক্রপ করা হয়েছে। সম্ভবত এর মূল কারণ ওই ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিকৃতি যে ট্রাকের উপর বসানো রয়েছে তা যেন বোঝা না যায়।
“আমার ধারণা পিনাকীর কাছ থেকেই বিতর্কের আইডিয়া এবং ছবি নিয়েছেন আসিফ নজরুল।”