ইতালিতে ভিসা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকায় দেশটির দূতাবাসের তিন কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে আটকের খবর এসেছে ইতালির প্রথম সারির গণমাধ্যমে।
আটকদের মধ্যে যে দুইজন বাংলাদেশির নাম এসেছে তাদের মধ্যে রোমপ্রবাসী নজরুল ইসলামকে বলা হয়েছে মূলহোতা, যিনি নিজেকে একটি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে পরিচয় দিতেন। পাশাপাশি ‘এল সিচিলিয়ানো ফিস’ নামে একটি রেস্তোরাঁরও মালিক তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে ইতালি আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন নজরুল। বিভিন্ন সভা ও সমাবেশে তার সরব উপস্থিতি দেখা যেত বিগত সময়ে।
মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশে তাদের আটক করা হয়েছে বলে এক্স হ্যান্ডলে এক পোস্টে জানিয়েছেন ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিয়ো তায়ানি।
চক্রটির সদস্য ঢাকার ইতালি দূতাবাসের ভিসা সেক্টরের প্রাক্তন প্রধান রবের্তো আলবের্গো ওয়ার্ক পারমিট (নুল্লাওস্তা) যাচাই-বাছাই ছাড়া ভিসা ইস্যু করে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর দূতাবাসের আরেক কর্মকর্তা নিকোলা মুসকাতেল্লো ইতালির বিভিন্ন শহরের, বিশেষ করে রোম ও নাপোলির ইমিগ্রেশন অফিস থেকে টাকার বিনিময়ে ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহে সাহায্য করতেন।
তুরস্কে বদলি হওয়ার আগে ঢাকায় ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণে দায়িত্বে ছিলেন মুসকাতেল্লো।
এছাড়া দূতাবাসের আরেক কর্মকর্তা জুসেপ্পে সুয়িয়াকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। রবের্তো আলবের্গো ও নিকোলা মুসতাতেল্লোর বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদনের সিস্টেমে সরাসরি প্রবেশ করার অধিকার ছিল বলে প্রসিকিউশন অফিস জানিয়েছে।
যেভাবে ঘটনার উদঘাটন
ঘুষ এবং অবৈধ ভিসা পাচারের এই ঘটনা উদঘাটিত হয় একজন স্থানীয় এমপির অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে। ইতালির ব্রাদার্স (এফডিআই) দলের ওই এমপি, যিনি আবার পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য, তাকে ঘুষ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করার পর দুর্নীতির ঘটনাটি প্রকাশ পায়।
আন্দ্রেয়া ডি গিউসেপ্পে নামে ওই এমপিকে ২০ লাখ ইউরো এবং ইতালিতে প্রবেশকারী অভিবাসীর আয়ের একটি অংশ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
অবশ্য অর্থ নেওয়ার পরিবর্তে প্রমাণ রেকর্ড করে তা প্রসিকিউটরদের সরবরাহ করেন গিউসেপ্পে।
পরে অনুসন্ধানে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, অবৈধভাবে কাজের ভিসা বিক্রির হোতা নজরুল বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন সহজ করার জন্য ওই অবৈধ চুক্তিটি করতে চেয়েছিলেন।
রোম প্রসিকিউটরদের মতে, ওই বাংলাদেশি উদ্যোক্তাকে সহযোগিতা করছিলেন ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের উল্লেখিত তিন কনস্যুলার কর্মকর্তা, যাদের বিরুদ্ধে কাজের ভিসা ইস্যু করার বিনিময়ে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন, বিলাসবহুল ঘড়ি এবং দুবাইয়ে ভ্রমণের খরচ নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন তারা।
তারা তাদের বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমেও ইতালিতে অভিবাসনে ইচ্ছুকদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন বলেও জানায় প্রসিকিউটর অফিস।
তদন্তকারীদের মতে, ভিসার জন্য অভিবাসীদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করতেন এই সন্দেহভাজনরা। ভিসাপ্রতি ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হতো, যদিও ইতালিতে পৌঁছার পর দেখা যেত প্রতিশ্রুত চাকরির অস্তিত্বই নেই।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ভিসার আবেদনের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য অস্তিত্বহীন কোম্পানির সঙ্গে কাল্পনিক চুক্তিও তৈরি করা হয়েছিল।
ইতালির প্রথম সারির পত্রিকা ‘এল সোলে’কে উদ্ধৃত করে ‘ব্রাসেলস সিগনাল’ জানিয়েছে, রোমের ইমিগ্রেশন ডেস্ককে ফাঁকি দিয়ে এসব করা হতো, কারণ সেখানে কম্পিউটার সিস্টেমে যাচাই-বাছাইয়ের তেমন একটা সুযোগ ছিল না। এর ফলে সন্দেহভাজনরা পরিবর্তিত বা সম্পূর্ণ মিথ্যা নথি দিয়ে পার পেয়ে যেতেন।
জালিয়াতিটি মূলত ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে বলে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন। রোম ও নাপোলিতে অবস্থিত ইমিগ্রেসন কর্মকর্তাদের সন্দেহজনক যোগসূত্র থাকারও তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।
অভিযুক্ত পাঁচজনের মধ্যে ইতালির দুই কর্মকর্তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে এবং দুই বাংলাদেশিকে দুর্নীতি, অবৈধ অভিবাসনে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে পাঠানো হয়েছে কারাগারে।
এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি জার্মানিতেও একই রকম একটি মামলা উঠে আসে, যাতে খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটস (সিডিইউ) এবং সোশ্যালিস্ট পার্টির (এসপিডি) বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদকে ভিসার বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তাদের বিরুদ্ধে চোরাকারবারীদের একটি দলের কাছ থেকে অবৈধভাবে প্রবেশকারী প্রতি জনের জন্য ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।