খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত থেকে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন তার ছেলে তারেক রহমান। প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতে এখন অনেকেই তাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। তবে বিরোধীদের সন্দেহ, দেড় দশকের বেশি সময় লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফেরার ক্ষেত্রে ভারতের হাত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে তলানিতে গিয়ে ঠেকা সম্পর্কের বিষয়ে তার মূল্যায়ন এবং পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতুহল।
শুক্রবার নিজের দলীয় কার্যালয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বাভাবিকভাবেই তাই প্রসঙ্গটি এলো। জানতে চাওয়া হয়েছিল- নির্বাচনে জয়ী হলে ভারত থেকে সরে গিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকবেন কি না?
ভারতীয় সাংবাদিকের প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে কার্যত দুই দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ও জাতীয় স্বার্থের ইঙ্গিত দিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সক্ষমতা রয়েছে, এমন অংশীদারদের প্রয়োজন।
“আমরা যদি সরকারে থাকি, তাহলে আমাদের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য আনতে হবে, যাতে নতুন চাকরি সৃষ্টি হয় এবং মানুষ ভালো জীবন যাপন করতে পারে।
“তাই বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যে–ই আমার জনগণ ও দেশের জন্য জুতসই প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই আমরা বন্ধুত্ব রাখব, নির্দিষ্ট কোনো দেশের সঙ্গে নয়।”
২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে তারেক রহমানের ‘প্যারালাল সরকার’ এবং ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়ে নানা মহলে আলোচনা রয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেকের যোগাযোগ নিয়ে দিল্লি এক সময় উদ্বিগ্ন ছিল, যে খবরটি ভারতের সংবাদমাধ্যমেও এসেছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব কমে এলেও দেশটির সঙ্গে সমঝোতা করেই তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন বলে বিএনপির এক সময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করে আসছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ১৬ মাস পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন জিয়া পরিবারের এই উত্তরসূরী।
ঢাকার একটি আদালত গত বছর রায়ে বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার জন্য শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তাকে আশ্রয় দেওয়ার নয়াদিল্লির সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
এর আগে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে দলটি নির্বাচনের দৌড়েও নেই। শেখ হাসিনা ছাড়াও দলটির বেশিরভাগ নেতা গা ঢাকা দিয়েছেন, অনেকে পালিয়ে গেছেন ভারতসহ বিভিন্ন দেশে।
তারেক রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- শেখ হাসিনার সন্তানেরা বিদেশ থেকে ফিরে রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারবেন কি না? জবাবে তিনি বলেন, “যদি কাউকে মানুষ গ্রহণ করে, যদি মানুষ তাদের স্বাগত জানায়, তাহলে যে কারও রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে।”
রয়টার্সকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ঘুরেফিরে এসেছে জাতীয় সরকারের বিষয়টিও। তবে এমন প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন বিএনপি প্রধান।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। একসময় নিষিদ্ধ থাকলেও এখন দলটির পুনরুত্থান ঘটেছে। এই দুই দল মিলে ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করেছে। এর মধ্যে জামায়াত বলেছে, দেশকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করার জন্য একটি ঐক্য সরকারের জন্য ওই অংশীদারত্ব পুনরায় চালু করার বিষয়ে রাজি আছে তারা।
ঐক্য সরকারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, “আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে কীভাবে আমি সরকার গঠন করি, তাহলে বিরোধী দল কে হবে? আমি জানি না, তারা কতটি আসন পাবে। তবে তারা যদি বিরোধী দল হয়, তাহলে আমি আশা করি তাদেরকে ভালো বিরোধী দল হিসেবে পাব।”
তারেক রহমানের সহযোগীরা বলছেন, নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় লাভের বিষয়ে বিএনপি আশাবাদী। নির্বাচনে ২৯২টি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাকি আসনগুলোতে তাদের জোট শরিকেরা লড়ছেন।
নির্বাচনে বিএনপি কত আসনে জয় পেতে পারে, সে সংখ্যা বলতে চাননি তারেক রহমান। তবে তিনি বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী, সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক আসন আমাদের থাকবে।”
সব জনমত জরিপেই বিএনপি জয়ী হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। তবে তাদেরকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলেও জরিপে এসেছে। তরুণদের নেতৃত্বে হাসিনাবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা জেন–জিদের দল (এনসিপি) জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ঐক্যে যুক্ত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:



