বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে সেনা মো্তায়েন হয় বরাবরই; স্থানীয় নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের দাবি বিরোধী দল থেকে ওঠে প্রায়ই; তবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সেনা পাহারায় করার ইতিহাস নেই।
এবার তাই ঘটতে চলছে। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন সেনা পাহারায় করতে চাইছে বিশ্ববিদ্যালয় দুটির প্রশাসন।
শিক্ষার্থীদের চাওয়া মেনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত, এমন দািব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করলেও ভোটে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্য থেকে বলা হচ্ছে, কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময় থেকেই বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে রয়েছে প্রতিরক্ষা বাহিনী; এখন তাদের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও কাজে লাগানো হচ্ছে।
ছয় বছর পর আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন হবে। ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে ১১ সেপ্টেম্বর।
ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে মঙ্গলবার বিভিন্ন প্রার্থীদের মতবিনিময় সভার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভোটের দিন সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত জানায়।
এতে বলা হয়, ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রবেশমুখে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা সদস্যরা থাকবে। প্রয়োজনে তারা ক্যাম্পাসেও প্রবেশ করবে এবং ভোট শেষে ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র কর্ডন করে রাখবে।
অন্যদিকে জাকসু নির্বাচনের দিন সেনা সদস্য মোতায়েন চেয়ে গত ২০ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে চিঠি পাঠায়।
সেনাবাহিনী দিয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগে বিস্ময় প্রকাশ করেন সাবেক ছাত্রনেতারা, যারা সামরিক শাসনামলেও এমন ঘটনা দেখেননি।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দুই বার ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হওয়া মাহমুদুর রহমান মান্না বিবিসি বাংলাকে বলেন, “তখনকার সামরিক সরকারের সময়েও তো আমরা এরকম সিদ্ধান্ত নিতে দেখিনি। এমনকি পুলিশকে পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হতো না।”
বর্তমানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় মান্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটা স্পর্শকাতর জায়গায়, যেখানে সেনাদের সঙ্গে ছাত্র সংঘর্ষের নজির রয়েছে, সেখানে এমন একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো?”
এইচ এম এরশাদের শাসনামলে ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হওয়া মুশতাক হোসেনও নির্বাচন ধরে ক্যাম্পাসে সেনা মোতায়েনে আপত্তি জানান।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের। অতীতে সেভাবেই ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। এর জন্য সেনা মোতায়েনের কোনো প্রয়োজন নেই, সেরকম কোনো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি।”
ক্যাম্পাসে সেনা উপস্থিতি পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়ে বাংলাদেশ জাসদের নেতা মুশতাক বলেন, “ক্যাম্পাসে সেনা উপস্থিতির পরিণতি কী হতে পারে, সেটা অতীতে আমরা দেখেছি। এবারও যে আগের মতো অঘটন ঘটবে না, সেটার নিশ্চয়তা কে দেবে?”
এরশাদের শাসনামলে জাকসুর জিএস নির্বাচিত হওয়া আজিজুল হাসান চৌধুরী শাহীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে সেনা মোতায়েন সাংঘর্ষিক। প্রশাসন যদি দায়িত্ব পালন করে এবং সব সংগঠনকে নিয়ে বসে তবে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।”
তাদের সময় জাকসুসহ ডাকসু, রাকসু বা চাকসু নির্বাচনে কোনো ধরনের সেনা বা পুলিশ মোতায়েন হত না বলে জানান তিনি।
ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে প্রশাসেনে সিদ্ধান্তে ভিন্নমত জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মৃধা মো. শিবলী নোমান।
তিনি বিডিনিউজ েটায়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূল প্রশ্ন হল, সেনা মোতায়েনের ভাবনাটি এল কেন? প্রশাসন কি জাকসুকেন্দ্রিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ? যদি তাই হয়, তবে আগে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্বাচন করা যেত।
“কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক; অন্যদিকে নির্বাচন-পরবর্তী ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়েও শঙ্কা তৈরি করবে। এর কোনোটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না।”
‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে সেনাবাহিনীকে মাঠে রাখার সিদ্ধান্তে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কেউ অমন করেননি বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়।
তবে তাতে ভিন্নমত জানিয়ে স্বতন্ত্র প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমাদের কারো সাথে কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ইন্টারনাল (অভ্যন্তরীণ) ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনী কেন মোতায়েন করা হবে, সেটাও আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটা প্রচণ্ড রকমের লজ্জাজনক একটা ব্যাপার।”
এই সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানান জুলাই আন্দোলনের এই নেতা।
সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তটি জাকসুর প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলগুলো নানাভাবে দেখছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একে ইতিবাচক মনে করছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরও নিরাপত্তাগত দিক থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় বলে মনে করছে।
অভ্যুত্থানকারীদের গড়া সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশ মনে করে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করলেও তাদের ক্যাম্পাসের বাইরে রাখা উচিৎ। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রণ্টের একাংশ একে ‘প্রক্রিয়াগত ভ্রান্তি’ হিসেবে দেখছে।
সেনা মোতায়েনের পক্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদের যুক্তি, “রাষ্ট্রে এখন বিশেষ পরিস্থিতি চলছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীরও ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার আছে।”
জাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামানও বলেন, “দীর্ঘ ৩৩ বছর পর একটি অস্থিতিশীল সময়ে জাকসু নির্বাচন হচ্ছে। দীর্ঘদিন চেষ্টার পরেও মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করতে পারিনি। তারা বহিরাগত হিসেবে থেকে গেছে। এসব দিক বিবেচনায় আমরা নিরাপত্তা ঝুঁকি অনুভব করছি।”
তবে সেনাসদস্যরা ক্যাম্পাসে ঢুকবেন কি না, সেটা আলোচনা করে ঠিক করা হবে বলে জানান তিনি।
ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনও বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানো এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতেই সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ছাত্র-ছাত্রী এবং অংশীজনদের সাথে আগে বিভিন্ন সময় যখন আমরা আলাপ করেছি, তখন তারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। তখন আমরা বলেছিলাম যে তাদের নিরাপত্তায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতি ও শিক্ষার্থীদের চাওয়া অনুযায়ীই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তবে এখন শিক্ষার্থীরা না চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
“তাদের কথা ভেবেই আমরা বিএনসিসি ও পুলিশের পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনীর রাখার ঘোষণা দিয়েছি। এখন তারা যদি প্রয়োজন মনে না করে তাহলে সেনাবাহিনী থাকবে না।”