দ্য ইকোনমিস্টের দৃষ্টিতে এই নির্বাচনে শাখের করাতে বাংলাদেশ

ইকোনমিস্টের ওয়েবসাইটে গেলে বাংলাদেশ দিয়ে সার্চ করলেই দেখা যাচ্ছে এই নিবন্ধ ও পডকাস্ট।
ইকোনমিস্টের ওয়েবসাইটে গেলে বাংলাদেশ দিয়ে সার্চ করলেই দেখা যাচ্ছে এই নিবন্ধ ও পডকাস্ট।

আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন দলটির নেতারা প্রায় বলতেন, শেখ হাসিনার বিকল্প কে? জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীরা তার জবাব তুলেছিল, বিকল্প আমরা সবাই। দেড় বছর গড়াতে অভ্যুত্থানের সেই রঙ ফিকে হতে চলেছে। সামনে নির্বাচন, অনির্বাচিত সরকারের অধ্যায় শেষে গণতন্ত্রে ফিরবে বাংলাদেশ, সেই আশাই করা হচ্ছে।

কিন্তু আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচন নিয়ে প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট সোমবার যে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশের ভোটাররা শাঁখের করাতেই পড়েছে। তার সামনে আছে কলঙ্কিত অতীতের একটি দল, তার বিকল্প হিসেবে আছে তালেবান ঘরানার একটি দল। এর মধ্য থেকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি বেছে নিতে হবে বাংলাদেশিদের।

ইকোনমিস্টের ওয়েবসাইটে গেলে বাংলাদেশ দিয়ে সার্চ করলেই দেখা যাচ্ছে এই নিবন্ধটি; পাশে একটি পডকাস্ট, যার শিরোনাম, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পরে কী?

নিবন্ধটিতে তালেবান ঘরানার দল হিসেবে বোঝানো হয়েছে জামায়াতে ইসলামীকে, যারা আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর স্বাধীন বাংলাদেশে নিজেদের সবচেয়ে সুসময় পার করছে। আর কলঙ্কময় দল হিসেবে বোঝানো হয়েছে বিএনপিকে, যে দলটি এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলছে।

নির্বাচনী প্রচারে নেমে তারেক রহমানের ব্যাপক সাড়া পাওয়ার বর্ণনা দিয়েই শুরু হয়েছে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনটি। যেখানে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের বুলেটপ্রুফ বাস যখন ময়মনসিংহের পানে চলছিল, তখন সড়কের দুই ধারে উচ্ছ্বসিত সমর্থকরা জড়ো হওয়ার পাশাপাশি গার্মেন্ট শ্রমিকরাও উঁকিঝুঁকি মারছিল তাদের কারখানা থেকে।

সাবেক দুই রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছেলে ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান যে জনপ্রিয় একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে রাজনীতিতে আছেন, সেকথাও বলা হয়।

জেন-জি অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা থেকে পতনের পর আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কথাও আছে নিবন্ধটিতে।

এতে বলা হয়, গণতন্ত্রে ফেরার এই প্রক্রিয়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান টানাপোড়েনের সম্পর্ক মেরামতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সময়ে ভোট যে একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের কথাও এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএসের) শাফকাত মুনিরের জবানীতে।

তিনি বলেন, “আমার জীবনের ২০টি বছর এমন ভাবে কেটেছে যে আমার ভোটের কোনো দামই ছিল না।”

তবে যে স্বপ্ন দেখিয়ে অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই স্বপ্ন যে অনেক দূরে চলে গেছে, তাও তুলে ধরেছে ইকোনমিস্ট। এখানেই জামায়াতের উত্থানকে বড় চমক হিসেবেই দেখছে ইকোনমিস্ট।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতায়ই শুধু করেনি, পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে হত্যা-ধর্ষণ-লুটপাটেও নেমেছিল।

২০২৪ সালে পতনের আগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধী অন্তর্বর্তী সরকার আমলে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি জেগে উঠেছে দলটি।

ইকোনমিস্টের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশে জুলাইয়রে পট পরিবর্তনের পর সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে দেখা যাচ্ছে জাময়াত এবং বিএনপিকে। তবে এখানে সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে জামায়াত।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন মনে করেন, জামায়াতের এই নতুন জনসমর্থনের কারণ শুধু ইসলামপন্থী দল হওয়ার কারণে নয়, এর বাইরেও কারণ আছে।

জামায়াত জোর দিয়ে বলছে, তারা ক্ষমতায় গেলে মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে, দেশ পরিচালনায় সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। তারপরও যে শহুরে মানুষ আতঙ্কে, তা তুলে ধরেছে ইকোনমিস্ট। কারণ তারা দেখছেন, নির্বাচনে নারী প্রার্থী বর্জিত জামায়াত নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ার নানা ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সংসদে এখন অবধি সর্বাধিক ১৮টি আসনে জেতা জামায়াত এখন বড় দল বিএনপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে। আওয়ামী লীগ থাকাকালে এই দুটি দল ছিল মিত্রতার বন্ধনে, এখন তাদের সেই বাঁধন আলগা হয়ে গেছে।

জনমত জরিপে বিএনপির এগিয়ে থাকার তথ্য তুলে ধরেই ইকোনমিস্ট লিখেছে, এর আগে বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় গেলেও তাদের শাসনকাল ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান কোনো পদে না থেকেও যে সব কিছু চালাতেন, তাও এসেছে নিবন্ধে।

ইউকিলিকসের ফাঁস হওয়া তথ্যরে বরাতে বলা হয়েছে, তারেক রহমান তখন ছিলেন বাংলাদেশে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একজন, ঘুষ নেওয়ার জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন কুখ্যাত। তার লন্ডনে থাকাটি ছিল স্বেচ্ছা নির্বাসন, তাও বলা হয়েছে নিবন্ধে।

১৭ বছর পর লন্ডন থেকে ফেরা তারেক রহমান এখন ক্ষমতায় গেলে নানা ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তাকে এখন উদারপন্থী অনেকেই সমর্থন দিচ্ছেন। তারা ভাবছেন, ১৭ বছর আগের তারেক রহমান আর এই তারেক রহমান এক নয়।

কিন্তু তারপরও এই নির্বাচনে বাংলাদেশিদের জন্য বিকল্প দুটি মোটেই আকর্ষণীয় নয় বলে দেশের একজন বিশ্লেষকের বরাতে বলেছে ইকোনমিস্ট।

ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন কলঙ্কিত অতীতের দলটির (আধুনিকতার প্রতিশ্রুতি এখন যারা দিচ্ছে) শাসনে, নাকি তালেবান ঘরানার কোনো শাসনে পড়বে, সেটাই ভোটারদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads