৭৩০ কোটি টাকা রেমিটেন্স! আসলে কী?

faruqi-hasan-pratik-group

বিদেশ থেকে রেমিটেন্স হিসাবে ৭৩০ কোটি টাকা দেশে আনার খবর আলোচনায় এখন প্রতীক গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম ফারুকী হাসান। তার এই দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে সংবাদ প্রকাশের পর বিবৃতি দিয়ে তিনি দাবি করেছেন, তিনি কোনো অবৈধ কাজ করেননি। তবে তার এই দাবি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

গত সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এক মতবিনিময় সভায় বলেন, “একজন ব্যক্তি… ৭৩০ কোটি টাকা দেশে এনেছেন। নিজেকে একজন কর্মী হিসেবে পরিচিতি দিয়ে দাবি করেছেন তার এই অর্থ করমুক্ত।”

তার ওই কথার পর টিবিএস মঙ্গলবার ফারুকী হাসানকে নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল- ‘১৮০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়ে নিজের কাছেই ৭২১ কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাঠান যে রহস্যময় ব্যক্তি’। 

টাকার অঙ্কটি ৭২১ কোটি হবে উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে অবস্থান করে বিদেশ থেকে কোনো পরামর্শ ফি হিসেবে আয়ের অর্থ দেশে আনা হলে তার ওপর স্বাভাবিক কর প্রযোজ্য।

এনিয়ে আলোচনার মধ্যে বুধবার ফারুকী হাসানের পক্ষে ব্যারিস্টার দেওয়ান হোসেন সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠান। সেখানে বলা হয়, ফারুকী হাসান চীন ও তুরস্ক সরকারের মালিকানাধীন কোম্পানি থেকে বৈধভাবে আয় করা অর্থ বৈধ চ্যানেলে দেশে এনেছেন এবং সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের প্রণোদনা গ্রহণ করেননি। তিনি কোনো চতুরতার আশ্রয় না নিয়ে ওই অর্থ তার ট্যাক্স ফাইলে দেখিয়েছেন।

ফারুকী হাসান সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, তা কর কর্তৃপক্ষ অনুমোদনও দিয়েছে। এতে কোনো প্রক্রিয়াগত ব্যত্যয় ঘটেনি।র্

ফারুকী হাসানের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। ২০০১ সালে তিনি কানাডায় পাড়ি জমান। পরে দেশে ফিরে এসে ব্যবসা শুরু করেন। প্রতীক সিরামিক, প্রতীক ডেভেলপার, হোটেল লেক ক্যাসেল, প্রতীক ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড, প্রতীক বোন চায়না লিমিটেড, প্রতীক লজিস্টিক, প্রতীক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, চেরি ইন্টারন্যাশনাল তারই কোম্পানি। তিনি বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকেরও উদ্যোক্তা পরিচালক।

কানাডার অন্টারিও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ফারুকী হাসান। তবে বেশ কয়েক বছর আগে রাজনীতি ছেড়ে পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগী হন বলে জানান তিনি।

সংবাদমাধ্যমে রেমিটেন্স নিয়ে খবর প্রকাশের পর ফারুকী বুধবার দৈনিক প্রথম আলোতে যোগাযোগ করে তার বিদেশ থেকে প্রতীক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে দেশে অর্থ আনার প্রক্রিয়াটি তুলে ধরেন।

তিনি জানান, চীনের সরকারি বিভিন্ন জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের হয়ে এজেন্ট ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন তিনি। ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের সরকারি বিভিন্ন জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৫টি জাহাজ কিনেছে। এসব জাহাজ বিক্রির ক্ষেত্রে তিনি এজেন্ট ও পরামর্শক সেবা দেন। তার বিনিময়ে ১৩ বছরে ৭৩০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ এজেন্ট ও পরামর্শ মাশুল পেয়েছেন। এই আয়ের ওপর চীনে করও পরিশোধ করেছেন। পরে সেই অর্থ প্রবাসী আয় হিসেবে বাংলাদেশে এনেছেন। তবে এ জন্য প্রবাসী আয়ের বিপরীতে নগদ প্রণোদনা প্রাপ্য হলেও তিনি তা নেননি।

ফারুকী হাসান বলেন, তার নামে দেশে কোনো ব্যাংকঋণ নেই। চীন থেকে তিনি তার আয়ের অর্থ ইস্টার্ন ব্যাংকের হিসাবের মাধ্যমে বৈধভাবে দেশে এনেছেন। এই অর্থ তিনি একেবারে আনেননি। কয়েক বছর ধরে ধাপে এনেছেন।

ফারুকী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, “যখন যে বছর আমি এই অর্থ এনেছি, প্রতিবারই এনবিআরের পক্ষ থেকে আমাকে প্রত্যয়ন সনদ দেওয়া হয়েছে। এখন কেন এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, বুঝতে পারছি না। বিদেশে সেবা দিয়ে দেশে অর্থ এনেছি, এটা তো আমার অপরাধ হতে পারে না।”

এখন এনবিআরের দিক থেকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় এনবিআরের সঙ্গে কথা বলতে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরামর্শক ফি যদি দেশে আনা হয়, তবে সেটি করমুক্ত নয়। সাধারণত ব্যাংকগুলো শুরুতে ১০ শতাংশ কর কাটে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হয়।

স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ুয়া টিবিএসকে বলেন, “বাংলাদেশে বসে বিদেশ থেকে কোনো পরামর্শ ফি হিসেবে আয় হলে, তথ্যপ্রযুক্তি খাত ছাড়া অন্য যে কোনো খাতের আয়ের ওপর কর প্রযোজ্য।”

এনবিআরের কর নীতির সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম টিবিএসকে বলেন, “এই টাকার ওপর কর হওয়ার কথা। কেন আদায় হয়নি, তা স্পষ্ট নয়।”

এনবিআরের কর নীতির আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, “উনি যদি দেশে বসে বিদেশ থেকে বৈধভাবেও পরামর্শ ফি হিসেবে অর্থ আনেন, তবে তার ওপর কর প্রযোজ্য। আইন অনুযায়ী, এনবিআর গত ছয় বছরের জন্য তার কাছ থেকে কর দাবি করতে পারে। তবে, এর আগের সময়ের অর্থও যদি কোথাও বিনিয়োগ হয়ে থাকে, তবে সেটির ওপরও কর প্রযোজ্য।”

ফারুকী হাসান দাবি করেছেন, তিনি বিদেশ থেকে আনা অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। এর অর্থ হলো, অতীতের যে কোনো বছরে আনা অর্থের ওপরই তাকে কর দিতে হবে।

ফারুকী বিষয়ে পদক্ষেপ জানতে টিবিএস যোগাযোগ করেছিল এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সঙ্গে। তিনি শুধু বলেন, বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তারা কাজ করছেন।

আরও পড়ুন