বেকারত্ব আর অর্থনৈতিক মন্দায় নাকাল হয়েও আবারও সবচেয়ে সুখী দেশের মুকুট পেয়েছে ফিনল্যান্ড। এর মধ্য দিয়ে এক দশকে নবম বারের মতো বিশ্ব তালিকায় শীর্ষ স্থান ধরে রাখলো দেশটি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে নর্ডিক দেশগুলো প্রতিবারের মতো আধিপত্য ধরে রেখেছে।
অবশ্য ২০২৬ সালে চমকে দেওয়া অগ্রগতি নিয়ে হাজির হয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা।
১৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছে দেশটি। কোস্টারিকা বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিক উত্থান অব্যাহত রেখে ২০২৩ সালের ২৩তম স্থান থেকে লাফিয়ে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে।
শীর্ষে থাকা ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয়তে আইসল্যান্ড, তৃতীয় ডেনমার্ক, পঞ্চম সুইডেন, ষষ্ঠ নরওয়ে, সপ্তম নেদারল্যান্ডস, অষ্টম ইসরায়েল, নবম লক্সেমবার্গ এবং দশম সুইজারল্যান্ড।
প্রতি বছর গ্যালাপ (Gallup), অক্সফোর্ড ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার (Oxford Wellbeing Research Centre) এবং ইউএন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (UN Sustainable Development Solutions Network) যৌথভাবে এই র্যাংকিং তৈরি করে থাকে।
১৪০টি দেশের বাসিন্দারা নিজেদের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন তার তিন বছরের গড়ের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয় দেশগুলোর সুখের র্যাংকিং।
পাশাপাশি মাথাপিছু জিডিপি, সামাজিক সহায়তা, গড় আয়ু, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, উদারতা এবং দুর্নীতির ধারণার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কোনো বড় ইংরেজিভাষী দেশ শীর্ষ ১০-এ স্থান পায়নি। তালিকায় অস্ট্রেলিয়া ১৫তম, যুক্তরাষ্ট্র ২৩তম, কানাডা ২৫তম এবং যুক্তরাজ্য ২৯তম স্থানে রয়েছে।
এ বছর শীর্ষ পাঁচ দেশের প্রত্যেকটির সুখের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে প্রতিক্ষেত্রেই নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান ১১৬তম, যা পাকিস্তান থেকে ১২ ধাপ পেছনে। পাকিস্তান গত বছরের চেয়ে পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১০৪-এ উঠে এসেছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে নেপাল (৯৯তম)। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার অবস্থানে উন্নতি বা অবনমন কোনটিই হয়নি। ১৩৪তম অবস্থানে রয়েছে দেশটি।
বাংলাদেশ গেল বছর ১২৯তম অবস্থানে থাকলেও এবার দুই ধাপ এগিয়ে ১২৭-এ উঠে এসেছে। মিয়ানমার মাত্র দুই ধাপ পিছিয়ে, ১২৯তম অবস্থানে।
ফিনল্যান্ডের সুখের রহস্য
ফিনল্যান্ড সুখী দেশের তালিকায় কেন এগিয়ে থাকে তা অনেকের কাছেই রহস্য। বেকারত্বের হারে দেশটি গোটা ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে; বর্তমানে প্রতি ১০০ জনে ১১ জনই চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। দুর্বল অর্থনীতি, উৎপাদন খাতে স্থবিরতার পরও কীভাবে মানুষ সুখী হতে পারে তাহলে?
দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেকজান্দের স্তুব এক ফেইসবুক পোস্টে এ বিষয়ে লিখেছেন, “প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কেন আমরা এই ধরনের র্যাঙ্কিংয়ে এত ভালো করি।
“আমার মনে হয় না এর পেছনে কোনো জাদুকরী সমাধান আছে। তবে এমন একটি সমাজ থাকা অবশ্যই সহায়ক, যা স্বাধীনতা, সমতা এবং ন্যায়বিচারের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
“এর ভিত্তি হলো একটি উন্মুক্ত কল্যাণমূলক সমাজব্যবস্থা, শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা, নিরাপত্তার অনুভূতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ,” যোগ করেন তিনি।
‘নিখুঁতভাবে সুখী কোনো সমাজ নেই’ মন্তব্য করে প্রেসিডেন্ট স্তুব বলেন, “তবে এমন কিছু ভিত্তি তৈরি করা, যা আমাদের অর্থবহ জীবন যাপন করতে এবং অন্যদের সাহায্য করতে সুযোগ দেয়; জীবনের পথে আমাদের সঠিক দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।”
ফিনল্যান্ড কেন বারবার বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষে থাকে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে ‘সুখ’ বলতে মূলত বোঝানো হয় জীবন সন্তুষ্টিকে, আবেগগত আনন্দকে নয়।
হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক নীতি বিষয়ের ডক্টরাল গবেষক লারি হোক্কানেনের ভাষায়, এই ধরনের বৈশ্বিক সূচক আসলে মানুষের জীবনের প্রতি সামগ্রিক মূল্যায়নকে তুলে ধরে। এটি সুখের অনুভূতি নয়, বরং মানুষ তাদের জীবনকে কেমন দেখছে তার একটি মানসিক মূল্যায়ন।
তার মতে, এতে তীব্র ইতিবাচক বা নেতিবাচক আবেগের ভূমিকা সবসময় থাকে না।
হোক্কানেনের মতে, নর্ডিক দেশগুলোর ধারাবাহিকভাবে ভালো অবস্থানের পেছনে বড় কারণ হলো তাদের সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এসব দেশের নাগরিকরা কঠিন সময়েও মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে, কারণ তারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর আস্থা রাখে।
তিনি বলেন, “শীর্ষ দশে এতগুলো নর্ডিক কল্যাণরাষ্ট্রের উপস্থিতি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান মানুষকে নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি দেয়, কঠিন পরিস্থিতিতেও।”



