পৃথিবীর সুখী দেশের তালিকায় অষ্টম বছরের মতো শীর্ষস্থান ধরে রাখলো ফিনল্যান্ড। বাংলাদেশের হয়েছে অবনমন। পাঁচ ধাপ পিছিয়ে এ বছর ১৩৪তম অবস্থানে নেমে গেছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে’ সুখী দেশের তালিকায় ফিনল্যান্ড ছাড়াও নরডিক দেশগুলোর জয়জয়কার। ফিনল্যান্ডের পরেই রয়েছে ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড এবং সুইডেন – যেখানে নেদারল্যান্ডস স্থান পেয়েছে পঞ্চম শীর্ষ সুখী দেশের।
কোস্টারিকা এবং মেক্সিকো প্রথমবারের মতো শীর্ষ দশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের র্যাঙ্কিং সর্বনিম্ন ২৪তম স্থানে নেমে এসেছে।
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৫
১. ফিনল্যান্ড
২. ডেনমার্ক
৩. আইসল্যান্ড
৪. সুইডেন
৫. নেদারল্যান্ডস
৬. কোস্টারিকা
৭. নরওয়ে
৮. ইসরায়েল
৯. লুক্সেমবার্গ
১০. মেক্সিকো
গত বছরের মতো এবারও তালিকার সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। তলানি থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয়তে রয়েছে সিয়েরা লিওন ও লেবানন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কেবল আফগানিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের পেছনে। ২০২৪ সালে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৯তম।
এ বছর সুখী দেশের তালিকায় ভারত আছে ১১৮ নম্বরে। ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে নেপাল (৯২) ও পাকিস্তান (১০৯)। দক্ষিণ এশিয়ার আরও দুই দেশ মিয়ানমার ১২৬তম এবং শ্রীলঙ্কা ১৩৩তম অবস্থানে।
সুখী দেশের তালিকা করা সংগঠনটির মতে, এই র্যাঙ্কিং একটি মৌলিক প্রশ্নের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে:
“অনুগ্রহ করে এমন একটি সিঁড়ি কল্পনা করুন যার ধাপগুলোর নিচের দিকে ০ থেকে উপরে ১০ পর্যন্ত। সিঁড়ির চূড়া আপনার জন্য সম্ভাব্য সর্বোত্তম জীবন এবং সিঁড়ির তলানির অংশটি আপনার জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ জীবনকে প্রতিনিধিত্ব করে। সিঁড়ির কোন ধাপটিতে আপনি এই সময়ে দাঁড়িয়ে আছেন বলে মনে করেন?”
ফিনল্যান্ড তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও কেউ কেউ এনিয়ে তুলেছেন প্রশ্ন।
তাম্পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ইউহো সারি যেমন বলছেন, “আমার বোধগম্য নয়, কেন কিছু কিছু মানুষের কাছে সুখ এত দূরবর্তী ধারণা বলে মনে হয়।”
ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ঊলে নিউজকে তিনি বলেন, প্রতিদিনের সংবাদপত্রের দিকে তাকালে দেখবেন সাধারণত অপ্রীতিকর বিষয়গুলোকেই সামনে নিয়ে আসা হয় এবং সেখানে সাধারণত বিশ্বের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয় না।
“ছোট ছোট ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং প্রতিদিন ঘটে যাওয়া ভালো জিনিসগুলি প্রায়ই সংবাদে প্রদর্শিত হয় না। মিডিয়ার সুসংবাদ জানানোর কোনও ঐতিহ্য নেই,” যোগ করেন সারি।
এই সমাজবিজ্ঞানী আরও বলেন, ”মানুষ প্রায়ই তাদের নিজের জীবন এবং চারপাশের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা প্রচারে ব্যস্ত। মানুষের জীবন পরিসংখ্যান বা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের উপর নির্ভর করে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সারির মতে, আরেকটি বিষয় যা নেতিবাচকতার দিকে মানুষকে পরিচালিত করে তা হলো, যখন একটি সংবাদ প্রতিবেদন মানুষের মতামতকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দেয়।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলছিলেন, একটি স্থানীয় স্বাস্থ্য ক্লিনিক সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে যতক্ষণ না কোনো ত্রুটি নিয়ে একজন রাজনীতিবিদ কথা বলছেন। মূলত কেউ প্রশ্ন তুললেই পুরো কার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক হিসাবে দেখা হয়ে থাকে।
সারির মতে, সূচকগুলি ইঙ্গিত দেয় যে ফিনল্যান্ডে জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাচ্ছে। অবনতির কারণগুলির মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, ক্রমবর্ধমান দাম এবং মহামারীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব।
এ ছাড়া বর্তমানে জনগণের একটি বড় অংশ সরকারের বাজেট কাটছাঁট নিয়েও অসন্তুষ্ট, যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, ফিনল্যান্ডের মানুষের একটি চমৎকার দিক হলো তারা যেকোনো ভালো কাজের প্রশংসা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ড তুলনামূলকভাবে নিরাপদ দেশ যেখানে মানুষ সাধারণত একে অপরের পাশাপাশি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিশ্বাস করে, ভালোবাসে।
এই সমাজবিজ্ঞানীর মতে, ব্যাংকিং পরিষেবা, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থা, সেইসাথে অবসরকালীন ভাতা এবং বিভিন্ন সুুযোগ-সুবিধার মতো বিষয়াদি বেশ ভালোভাবেই এখানে কাজ করছে।
সারি বলেন, মূলত ছোট ছোট জিনিসগুলোই সুখের ভিত্তি রচনা করে দেয়। এসব বিষয়ের অনুপস্থিতি এর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। ধরুন, কলে কলে পানি আসছে না, কিংবা আপনার ব্যাংক কার্ড কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে- তখন কেমন উবলব্ধি হবে!
পরিসংখ্যা অনুযায়ী ফিনল্যান্ডে যেকোনো পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটার স্বল্প সময়ের মধ্যেই ৯০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, যোগ করেন সারি।
এই উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ব্যক্তি জীবনে সুখের মাত্রার ভিত্তি কোথায়।
২০১২ সাল থেকে গ্যালাপ, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক এবং গ্রুপের সম্পাদকীয় বোর্ডের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার প্রতিবছর এই সুখ পরিমাপের তালিকা প্রকাশ করে আসছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক সুখ দিবস’ হিসেবে গৃহীত হওয়ার পর থেকে তালিকা প্রকাশের অনুশীলন শুরু হয়।
১৪০টির বেশি দেশের ওপর বিশ্ব জরিপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতেই প্রস্তুত করা হয় সুখী দেশের এই তালিকা। এবছর তালিকায় মোট ১৪৭টি দেশের উপর জরিপ চালানো হয়েছে।