তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের মাসেই গ্রেপ্তার হলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। মানব পাচারের একটি মামলায় তাকে সোমবার রাতে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডেও নেওয়া হয়।
মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের পর থেকে তারেক রহমানকে জড়িয়ে উঠছে আলোচনা। সদ্য কারামুক্ত সাংবাদিক আনিস আলমগীরও এনিয়ে লিখেছেন। দেড় দশক আগে বাংলাদেশে ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই সাংবাদিক। ২০০৭ সালের ২২ আগস্ট কারফিউর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। গ্রেপ্তারের সময় সেনাবাহিনীর পিটুনির শিকারও হয়েছিলেন তিনি। পরপরই অবশ্য ছাড়া পেয়েছিলেন তিনি।
সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আনিস আলমগীর লিখেছেন, “কয়েকদিন পর একটি বিদেশি দূতাবাসের অনুষ্ঠানে তখনকার প্রভাবশালী জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেননি; বরং বিষয়টি ভুলে যেতে বলেন।”
মাসুদ উদ্দিনের গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেই স্মৃতি আবার জেগে ওঠার কথা জানিয়ে আনিস আলমগীর লিখেছেন, “আমি ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন দেখলাম সেই জেনারেল গ্রেপ্তার হয়েছেন, তখন বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা স্মৃতি আবার জেগে উঠল। তিনি যাদের হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত করেছেন, মাজা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন- তারাও সেটা ভোলেনি।”
আনিস আলমগীর উহ্য রাখলেও এখানেই আসে তারেক রহমানের প্রতিশোধের বিষয়টি। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির দুই মাস পর মার্চে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক। তখন পিটিয়ে তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সেই বিষয়টি ধরে প্রবাসী ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য ফেইসবুকে লিখেছেন, “কথিত আছে তার নেতৃত্বেই তারেক রহমানের উপরে নির্যাতন করা হয়েছিল।”
ফলে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের আঙুল উঠবে, তা স্বাভাবিক বলেই মনে করেন তিনি।
পিনাকী লিখেছেন, “গ্রেপ্তার যেই কারণেই করা হোক, মানুষ মনে করবে এই গ্রেপ্তার প্রতিশোধমুলক। বিএনপি রেজিমের ওয়ান ইলেভেন নিয়ে কোন ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রতিশোধ নেওয়ার উপায় নাই।
“কারণ বেগম খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন- ‘আমি প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা মেটাবার জন্য কোনো সময় ব্যয় করব না। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আমি ঘোষণা করছি, যারা আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অতীতে নানা রকম অন্যায়-অবিচার করেছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন, আমি তাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করছি। আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম’।”
মাসুদ উদ্দিনকে মানব পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও এই মামলা তার বিরুদ্ধে আগেই ছিল। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করাকে সবাই যে সন্দেহের চোখে দেখবে, তা তা রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ‘এক-এগারো’ বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমদের কথায়ও উঠে এসেছে।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ওই সময় যে কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি।
“আর বিএনপি নিজেকে ওয়ান-ইলেভেনের ভিকটিম মনে করে। এ কারণেই অনেকে মাসুদ চৌধুরীর গ্রেপ্তারকে প্রতিশোধ মনে করতে পারেন।”
মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর বক্তব্যও সমর্থন করে মহিউদ্দিনের কথাটিকে। দুদু লিখেছেন, “প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে ধন্যবাদ। ১/১১’তে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার শুরু করার জন্য।”
মাসুদ উদ্দিন: ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব
মাসুদ উদ্দিন এখন ব্যবসায়ী পরিচয় নিয়ে থাকলেও তার আরেকটি পরিচয়, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে সংসদ সদস্য ছিলেন। তার আগে রাষ্ট্রদূতও ছিলেন তিনি। তবে তার সব পরিচয় ছাপিয়ে যায় ওয়ান-ইলেভেনের সময় তার ভূমিকা।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, তাই ওয়ান-ইলেভেন নামে পরিচিত। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মইন উ আহমেদ। তারপরই সবচেয়ে বেশি কর্তৃত্ব ছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিনের।
সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি বা অধিনায়ক হিসেবে তিনিই তখন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে চাপ দিয়ে জরুরি অবস্থা জারিতে বাধ্য করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

এরপর দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দুদকের মাধ্যমে মামলা দিয়ে রাজনীতিক-ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা পেছনেও ছিল তার উদ্যোগী ভূমিকা। তখন দুই প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে ডজন খানেক দুর্নীতির মামলাও দায়ের করা হয়।
পরের বছর রাজনৈতিক সমঝোতায় তারেক রহমান মুক্তি পেয়ে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। এরপর আওয়ামী লীগের জমানায় আর ফেরেননি তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর গত ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফেরেন।
মা খালেদা জিয়ার মৃত্যূর পর বিএনপি তারেকের নেতৃত্বেই নির্বাচনে যায়। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের মাঠে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক। তার ৩৩ দিনের মাথায় গ্রেপ্তার হলেন মাসুদ উদ্দিন।
‘গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়’
মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, ওয়ান ইলেভেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন।
তখন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের পর সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন তিনজন সেনা কর্মকর্তা। তারা হলেন- মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তখনকার ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ফজলুল বারী এবং তখনকার ডিজিএফআইয়ের আরেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন। এর মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়া অন্যদের কেউই দীর্ঘকাল ধরে দেশে নেই।
২০০৭ সালের মার্চ মাসে তখনকার উপদেষ্টা এম এ মতিনকে চেয়ারম্যান এবং জেনারেল মাসুদ উদ্দিনকে প্রধান সমন্বয়কারী করে গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠনের ঠিক এক দিন আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তারেক রহমানকে।
তার আগে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে মাসুদ উদ্দিনের তৎপরতার কথা মইন ই আহমেদ তার ‘শান্তির স্বপ্নে’ বইয়ে লিখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীই গিয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদের বাসায় এবং তাকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে রাজি করিয়েছিলেন।
তিনি লিখেছেন, “এ সময়ে দেশের গোয়েন্দা বিভাগ ও সাভার ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে সর্বাত্মক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। সাভার ডিভিশনের জিওসি দীর্ঘদিন ডিজিএফআইতে কর্মরত থাকার সুবাধে তার মতামত এ পরিষদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
মাসুদ উদ্দিনের ভূমিকার আরো বিস্তারিত পাওয়া যায় মহিউদ্দিন আহমদের লেখা ‘এক-এগারো’ বইয়ে দেওয়া তখনকার বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজমের বর্ণনায়।
ফখরুল আজম বলেছিলেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তিনিসহ তিন বাহিনী প্রধানকে রাষ্ট্রপতি ডেকেছিলেন। তখন আলোচনার এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতিকে জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি রাজি হননি। তিনি তার সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপের জন্য সময় চাইছিলেন। তখন মইন উ আহমেদ তাকে মাসুদ উদ্দিনের ভয় দেখিয়েছিলেন।
ফখরুল আজমের ভাষ্যে, “মইন ইউ আহমেদ বলেন, ‘নাহ, আপনার কলিগদের এখানে কিছু করার নাই। ডিসিশন ইজ ইয়োরস। ডিসিশন আপনি নেবেন অথবা নেবেন না। আর আপনি যদি না নেন, তাহলে আমি মাসুদকে ডাকতেছি’।”
এই বলে মইন উ আহমেদ ফোন করে বলেছিলেন, “মাসুদ, তুমি ট্যাংক নিয়া চলে আসো।” এর কিছুক্ষণ পরই জেনারেল মাসুদ বঙ্গভবনে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে জানান ফখরুল আজম।
তবে এরপর মাসুদ উদ্দিন এতটাই কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছিলেন যে তিনি মইন আহমেদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ান। তখন ২০০৮ সালের জুন মাসে মাসুদ উদ্দিনকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পরও রাষ্ট্রদূত হিসেবে টিকে ছিলেন মাসুদ উদ্দিন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে রেস্তোরাঁ ও জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেন।
প্রথমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করলেও ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন মাসুদ উদ্দিন। ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন।
এরপর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ফের সংসদ সদস্য হন।



