গণভোটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কোথায়?

গণভোটে সরাসরি ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার, যার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে জেনারেল জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ-না ভোটের প্রচারণা।
গণভোটে সরাসরি ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার, যার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে জেনারেল জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ-না ভোটের প্রচারণা।

হালে ভোট এলেই যে কথাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হচ্ছে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। যার অর্থ নির্বাচনের মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেকে সামনে রেখে বিএনপি মঙ্গলবারই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বলে এসেছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। এর দুদিন আগে জামায়াতে ইসলামীও একই কথা বলে এসেছে।

আর কিংস পার্টি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আগে থেকেই বলছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।

তাদের সবার মোদ্দা কথা হলো- নির্বাচনের মাঠে সবাই সমান সুযোগ পাচ্ছে না, প্রশাসন এখানে পক্ষপাত করছে। অর্থাৎ প্রশাসনের এখানে রেফারির ভূমিকায় থাকার কথা থাকলেও তারা খেলোয়াড় হিসেবে নেমে পড়েছে।

সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে যাই হোক না কেন, গণভোটের ক্ষেত্রে প্রশাসন থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার যে রাখঢাক না রেখেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে নেমে পড়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর এবারের সংসদ নির্বাচন হচ্ছে ভিন্ন মাত্রায়। কারণ এবার একই সঙ্গে গণভোটও হচ্ছে। গণভোটে জুলাই সনদ অনুসরণ করে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হবে।

তবে এই ভোটে রেফারির ভূমিকায় না থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের নেমে পড়া নিয়ে এরই মধ্যে উঠেছে প্রশ্ন।

গণভোট হবে কী প্রশ্নে?

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি গণভোটের জন্য আরেকট ব্যালট পাবেন ভোটাররা। সেখানে হ্যাঁ কিংবা না ভোট দিতে হবে।

জুলাই সনদে যে ৩০টি প্রস্তাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতৈক্য হয়েছে, সেগুলো নিয়ে চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে—

১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে সরকারের প্রচার।

৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

এই চারটি বিষয় উল্লেখের পর প্রশ্ন থাকবে- আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?

এতে হ্যাঁ এর পক্ষে বেশি ভোট পড়লে সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিরা একইসঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ বা সিনেট গঠন করা হবে।

সরকারের সাফাই

গত কিছু দিন ধরেই বিভিন্ন উপদেষ্টা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তারা এমনও বলছেন, গণভোটে না জয়ী হলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আবার ফিরে আসতে পারে।

তাদের এই পক্ষ নিয়ে নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে হাজির হন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম. অতিকথনের জন্য যিনি এরই মধ্যে সমালোচনায় পড়েছেন।

তাকে গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সরকার যখন হ্যাঁ-না ভোটের (গণভোট) আয়োজন করছে, তখন সরকারই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষের প্রচারণা চালাবে, এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন কি?

জবাবে শফিকুল আলম বলেন, ‘এটা নিয়ে কেউ কেউ দ্বিমত করতে পারেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলছি, সরকার এখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য বলবে, জনগণকে বলবে।’

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপদেষ্টা ফেইসবুক পেইজে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার এরই মধ্যে শুরু করেছেন।

শফিকুল আলম তার ব্যাখ্যায় বলেন, ‘এটা বলার মূল কারণ হচ্ছে এই সরকার হচ্ছে সংস্কারের সরকার। এই সরকার ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে এই সংস্কারকে একটি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চেষ্টা করেছে। এটাই এখন গণভোটে দেওয়া হচ্ছে।’

‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে বলতে গিয়ে আওয়ামী লীগের জুজু দেখিয়ে প্রেস সচিবও বলেন, ‘আমরা জনগণকে বলছি, আপনারা যদি আর অপশাসন না চান, আপনারা যদি স্বৈরাচারকে আর ফেরত না চান, অবশ্যই তাহলে আপনারা হ্যাঁ ভোট দেবেন।’

রাজনৈতিক দলগুলোর কী অবস্থান?

অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় তাদের এই নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। তবে তারা এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রেখেছে।

জুলাই সনদের সই না করলেও এনসিপি গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচারে নেমেছে। জামায়াতও হ্যাঁ এর পক্ষে সরব। ইসলামী দলগুলোও বলছে, হ্যাঁ না জিতলে অভ্যুত্থানের বৈধতা মাঠে মারা যাবে।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দল বিএনপির অবস্থান এক্ষেত্রে কিছুটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। জুলাই সনদের সব বিষয়ে একমত না হওয়া বিএনপির স্থানীয় নেতারা না এর পক্ষে অবস্থান জানাচ্ছেন মাঝে-মধ্যেই। কিন্তু দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, তাদের অবস্থান হ্যাঁ এর পক্ষে।

কিন্তু এনসিপি, জামায়াত যেভাবে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, বিএনপির তেমন কোনো উদ্যোগই নেই।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গত শুক্রবার সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “সংস্কার আমাদের মজ্জাগত। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, চলতেই থাকবে। সেখানে ‘না’ বলার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।”

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের গণভোট নিয়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচ্ছদ। ভোটের ফলাফল ছিল, ৯৮.৯% হ্যাঁ।

ফেইসবুকে না এর পক্ষে বিএনপি সমর্থকদের প্রচার নিয়ে মঙ্গলবার দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামকে প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি তা সমর্থকদের ব্যক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে যান।

তিনি পাল্টা বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকেও তো গণভোট নিয়ে প্রচার হচ্ছে। সেটি যদি অন্যায় না হয়, অন্যরা করলে অন্যায় হবে কেন?”

এরমধ্য দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, হ্যাঁ ভোটের পক্ষে যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রচার করছে, তা ঠিক হচ্ছে না।

এদিকে অভ্যুত্থানের পর থেকে বিএনপিকে চাপে রাখা এনসিপি গণভোটে দলটির অবস্থান নিয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মঙ্গলবার বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল, তারা না ভোটের পক্ষে কথা বলা শুরু করছে। তারা ইনিয়েবিনিয়ে না ভোটের পক্ষে মানুষ যাতে ভোট দেয়, সেই প্রচারণার চেষ্টা করছে।

“এই ভুল করার চেষ্টা করবেন না। যদি না ভোটের পক্ষে চলে যান, জনগণের বিপক্ষে চলে যাবেন। নির্বাচনেও জয়ী হতে পারবেন না বলে বিশ্বাস করি। নির্বাচনে জয়ী হতে হলে অবশ্যই হ্যাঁ ভোটের পক্ষে থাকতে হবে।”

গণভোটে না এর পক্ষে বেশি ভোট পড়লে কোনো সংস্কারই আর হবে না। তবে সেই ফল যে তার চেয়েও যে বেশি কিছু, তা স্পষ্ট করেছেন ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, গণভোটে জুলাই সনদের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন প্রদর্শিত না হলে অন্তর্বর্তী সরকার, সংসদ নির্বাচনসহ সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এথেকে একটি ধারণা পাওয়া যায় যে কেন ইউনূস সরকার গণভোটে হ্যাঁকে জেতাতে উঠেপড়ে লেগেছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads