ফিনল্যান্ডে বাচ্চাদের যেভাবে পড়ানো হয়

ফিনল্যান্ডের বাচ্চাদের স্কুলের শ্রেণিকক্ষ যেমন হয়।
ফিনল্যান্ডের বাচ্চাদের স্কুলের শ্রেণিকক্ষ যেমন হয়।

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করা যাক। কিছুদিন আগে আমার মেয়েকে স্কুলে মাছ কাটা শিখিয়েছে! এ নিয়ে ওর মাঝে যে উত্তেজনা দেখেছি তা ওর মাছ কাটার ‘প্রাকটিক্যাল লেসনের’ প্রতি আমাকেও আগ্রহী করে তুলেছিলো। উঠতে বসতে খাওয়া দাওয়া সবখানে কেমন করে যেন ও ওর মাছকাটা প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে আসছিলো! রীতিমতো ক্ষণ গণনা শুরু করে দিয়েছিলো সে।

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাসায় ফিরে ওর মাছা কাটার গল্প যেন শেষ হতেই চায় না। আমিও খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছিলাম। এক পর্যায়ে ও ওর বই এনে আমাকে একটা মাছ দেখিয়ে বললো- বলো তো বাবাই কোন মাছটা ছেলে আর কোনটা মেয়ে? আমি বললাম মাছের আবার ছেলে-মেয়ে দিয়ে কী হবে! ও আরও আগ্রহী হয়ে উঠলো যেন তার কাঙ্ক্ষিত ছাত্রকে পেয়ে গেছে! ছবিতে লিঙ্গ ভেদ দেখিয়ে বললো এটা মেয়ে আর ওটা ছেলে।

শুধু কী তাই? কীভাবে প্রজনন হয়, কখন ডিম পাড়ে- গড়গড় করে সব বলতে শুরু করলো। মাছের কোন অংশে কী থাকে সব শিখে এসেছে স্কুল থেকে।   

ওর স্কুল নিয়ে আরেকটি ছোট্ট ঘটনা বলি। তখন আমি একজন হাঙ্গেরিয়ান প্রফেসরের অধীনে গবেষণায় যুক্ত। রিসার্চ ইউনিটের প্রধানও ছিলেন তিনি। অনেকের চোখে একটু কড়া প্রকৃতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের হলেও আমার কাছে উনি ছিলেন নিতান্তই বন্ধুর মতো। আমাকে বেশ পছন্দও করেন। নানা গল্প শুনতেন আমার দেশের। জানতে চাইতেন আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। বুঝতে পারতাম এটা ওনার জানার ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করার একটি উপায়। যাইহোক, একদিন রিসার্চ ডিসকাশন শেষে মিটিং শেষে প্রফেসর জানতে চাইলেন ইউনিভার্সিটির বাইরে আমি সময় কাটাই কীভাবে।

বললাম- এইতো, ফ্যামিলি-বাচ্চাকে সময় দিই, খেলাধুলা করি, বাচ্চার পড়াশোনার খোঁজ খবর নিই, বিশেষকরে গণিতটা শেখাই। আমার কথা শুনে প্রফেসর চোখ বড় করে আমার দিকে তাকালেন। কপালে রীতিমতো ভাঁজ। বললেন- তুমি গণিত শেখাও মানে? তুমি কি গণিতের শিক্ষক? তোমার কি বাচ্চাদের ‘সাইকোলজি’ বোঝার বা তাদেরকে শেখানোর কোনো প্রশিক্ষণ আছে? আমি খুব বিনীতভাবে তাকে ‘না’ সূচক উত্তর দিলাম।

শ্রেণিকক্ষে বাচ্চাদের দিনের পড়া দিনেই শেষ করে ফিনিশ স্কুলগুলোতে।

উনি বললেন- দ্যাখো, সবকিছু সবার জন্য নয়। আমি জানি তুমি গণিতে ভালো। তোমার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা অসাধারণ। তাই বলে বাচ্চাকে শেখানোর মতো দক্ষতা তোমার রয়েছে বলে আমি মনে করি না! কারণ, এটার জন্য আলাদা পেশা রয়েছে। প্রশিক্ষণ রয়েছে। মানুষ রয়েছে। আমি বললাম- তাই বলে এই বয়সের বাচ্চাকে পড়ানোর মতো সক্ষমতা আমার নেই? রীতিমতো মানসম্মান ধূলোয় মিশে গেলো বলে!

প্রফেসর বললেন- না, তোমার নেই! আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম! উনি বললেন- আমার পরামর্শ হলো এই কাজটা তুমি আর কখনো করবে না। এতেই তোমার মেয়ের মঙ্গল। এটা শেখানোর বয়স নয়, এটা দেখানোর বয়স। আর দেখানোর জন্য তো শিক্ষকরা রয়েছেনই। তাই না?

আমি ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিলাম। তবে মাথার রয়ে গেল- ‘এটা শেখানোর বয়স নয়, এটা দেখানোর বয়স’।

দেখতে দেখতেই এখানে বাচ্চারা শেখে। এবার আসা যাক মূল বিষয়ে, মানে ফিনিশ শিক্ষা ব্যবস্থার আলোচনায়। অনেকেই জানেন হয়তো মানদণ্ডের বিবেচনায় ফিনল্যান্ডকে বলা হয় শিশুদের শিক্ষার পথ প্রদর্শক। বহুদেশ এখানকার শিক্ষার ‘মডেল’ ব্যবহার করে উপকার পেয়েছে।

ধারণা দেওয়ার জন্য বলে রাখি। অন্যান্য দেশের মতো এখানেও শিক্ষার বেশ কিছু স্তর রয়েছে, যার শুরু ‘শিশু শিক্ষা’ থেকে। তার মানে হলো ডে-কেয়ার থেকেই বাচ্চারা শিখতে শুরু করে। না, পড়াশোনা নয়। দৈনন্দিন আচার-আচরণ থাকে শেখার পথপরিক্রমার পুরোটা জুড়ে। জুতোর ফিতা বাধা থেকে শুরু করে খাওয়া, ঘুমানো, বন্ধুদের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া, গল্প বলা, গল্প শোনা, হাতের কাজ—এসবই তাদের শেখার উপকরণ। এই ব্যাপ্তি শিশুর বয়স সর্বোচ্চ ছয়ে পা দেওয়া পর্যন্ত। এরপর শুরু হয় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, ইংরেজিতে যাকে বলে প্রি-স্কুল এডুকেশন। এখানে মূলত বাচ্চারা মূল স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতিটা নিয়ে থাকে।

বলে রাখছি, প্রি-স্কুল হলো ‘ডে-কেয়ারের’ বর্ধিত সংস্করণ। এখানে শিশুরা সীমিত পরিসরে বর্ণমালা, সংখ্যা শিখে থাকে। সেই সঙ্গে শিশুদের ‘মটর স্কিল’ পর্যালোচনা করে থাকেন শিক্ষকরা। হাঁটা-চলার পাশাপাশি শিশুদের পেন্সিল ধরার দক্ষতা, লিখতে গিয়ে হাত ঘোড়ানোর দক্ষতা- এসবই মোটাদাগে দেখা হয়ে থাকে। শিশুর বয়স যখন সাতে পড়বে তখনই তাকে ‘গ্রেড ওয়ানে’ পড়ার উপযুক্ত বলে ধরে নেওয়া হয়। সাত বছরে পা দেওয়ার একদিন আগেও কেউ ‘গ্রেড ওয়ানে’ ভর্তির সুযোগ পায় না এখানে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে এই নিয়মে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। ক্ষেত্র বিশেষে ছয় বছরেও শিশু গ্রেড ওয়ানে পড়ার সুযোগ পেতে পারে। এখানে শিশু কোন স্কুলে পড়বে সেটাও নির্ধারিত হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে, মানে ঠিকানা অনুযায়ী। যার যার বাসার ঠিকানার নিকটতম স্কুলেই যাবে সেই শিশুটা। সুতরাং বাচ্চারা আগে থেকেই জেনে যায় সে কোন স্কুলে যাবে। সেকথা ভেবেই প্রি-স্কুলের শিক্ষকরা (যাদেরকে ফিনল্যান্ডে কিন্ডারগার্টেন সেবিকা বলা হয়) বাচ্চাদের সম্ভাব্য স্কুল এবং তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে যান মূল স্কুলে। গ্রেড-ওয়ান থেকে গ্রেড- সিক্স পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপ্তি। শুনতে অবাক লাগলেও এই ছয় বছরের শিক্ষায় শিশুদের তেমন কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয় না। মোটাদাগে বলা যায়, পরীক্ষাহীন পড়াশোনা। ক্লাসে যেসব পরীক্ষা নেওয়া হয় তাকে প্রতিযোগিতামুক্ত রাখতে চেষ্টা করেন শিক্ষকরা। অনেকেই বলতে পারেন তাহলে বাচ্চাদের মূল্যায়নটা হয় কীভাবে?

শ্রেণিকক্ষের বাইরে ইনডোর ও আউটডোরে খেলাধুলার পাশাপাশি শেখানোর জন্য রয়েছে নানা কার্যক্রম।

আমাদের বাচ্চার অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। ও এখন পড়ছে গ্রেড-টু-তে। এ পর্যন্ত ওকে কোনো ধরনের বার্ষিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি। তার মূল্যায়ন হচ্ছে দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে। কিছুদিন আগে তাকে আমি গণিতের সাপোর্টিং লেসন দেওয়ার জন্য ওর স্কুলে আবেদন করেছিলাম। সপ্তাহে একদিন ওই সাপোর্টিং ক্লাস নেওয়া হতো। কয়েক সপ্তাহ যেতেই ওর শিক্ষক খুবই বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, ওকে আমি যে কারণে অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ দিচ্ছি সেটা অমূলক। গণিতে ওর দক্ষতা অন্যান্য বাচ্চাদের চাইতে কোনো অংশে কম নয়, সুতরাং তারা বাচ্চাকে এই অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার পক্ষপাতি নয়!

পাঠ্যপুস্তকের কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হবে প্রথম দর্শনে মনে হবে খুবই সাধারণ মানের পাঠ্যপুস্তক। সত্যিই সাধারণ। তবে ধারাবাহিকতা চমৎকার। গল্পে গল্পে শেখার মতো পুস্তক, উপকরণ। আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি, এই বয়সের একটি বাচ্চাকে ওরা স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখাচ্ছে। সৃজনশীল উপায়ে যেকোনো বিষয়ে বলতে এবং লিখতে শেখাচ্ছে। গণিত শেখাচ্ছে গল্পের মধ্য দিয়ে। ছবি আঁকার মাঝেও যে জ্যামিতিক বিষয়াদি ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাদের কারিক্যুলাম না দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।

এ তো গেল পাঠ্যপুস্তক। মূলত ওদের শিক্ষা ব্যবস্থা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডনির্ভর। ব্যবহারিক শিক্ষাটাই ওদের মূল শিক্ষার কেন্দ্র। যেমন, সেদিন হঠাৎ করে জানতে পারলাম মেয়ে একা একা অউলু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গিয়েছে। সেখানে গিয়ে নিজের প্রিন্টিং কার্ড ব্যবহার করে তিনটি ছবির ‘কালার প্রিন্ট’ বের করেছে। সেগুলো দিয়ে একটি ছোট্ট অ্যালবাম বানিয়ে তা শিক্ষকের কাছে জমা দেওয়াই ছিল পরিকল্পনার অংশ। এই যে স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি গেল, মাঝ পথে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে রাস্তা পার হলো, সম্পূর্ণ অজানা পরিবেশে প্রিন্টিং কার্ড ব্যবহার করে প্রিন্ট বের করলো- এটা ওর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে খাপখাওয়াতে বেশ কাজে দেবে। ওরা নিয়ম করে বাচ্চাদের লাইব্রেরিতে নিয়ে যায়, নিজে নিজে বই পছন্দ করে নিয়ে আসে- এই বয়সেই। খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট কোর্স রয়েছে। ইনডোর ও আউটডোর- দুটোই। ওরা এভাবেই শেখে। ওদের ‘হোম ওয়ার্ক’ বলতে যেটা আছে সেটা আসলে হোম ওয়ার্কের পর্যায়ে পড়ে না! সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় আমার মেয়ের।

ওদের রাজ্যের বইয়ের বোঝা বহন করতে হয় না। ওরা বইয়ের ঝোলা যেটা নেয়, সেটা শীতকালীন অতিপ্রয়োজনীয় ‘স্টাফ’ কিংবা ‘পেন্সিল বক্স’ নেওয়ার জন্য। বই বহন করার জন্য নয়। বইয়ের জায়গা স্কুলে তাদের ব্যক্তিগত শেলফে, ব্যাগে নয়!

গ্রেড-সিক্স পর্যন্ত এভাবেই পড়ানো হয় শিশুদের। এরপর সিক্স থেকে শুরু হয় নিম্ন মাধ্যমিক পাঠ্যধারা। তিন বছরের এই পড়াশোনায় মূল্যায়নটা বেশ গুরুত্ব বহন করে। ভালো গ্রেড তুলতে পারলে পড়ার সুযোগ হবে মূল ধারায়, না হলে বিকল্প বৃত্তিমূলক শিক্ষায়। এখানে ফের তিন বছর কাটিয়ে তবেই বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কারিগরি ইনস্টিটিউটে পড়ার সুযোগ মেলে শিক্ষার্থীদের।

আরও পড়ুন