শূকরের মাংস কীভাবে চীনের বাণিজ্য যুদ্ধের হাতিয়ার

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনের শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রে দৈনন্দিন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনের শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রে দৈনন্দিন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

চীনের মানুষের শূকরের মাংসের প্রতি আকর্ষণ ভিন্ন মাত্রার। গত বছর তারা প্রায় ৫৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন শূকরের মাংস সাবার করে দিয়েছে, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি। 

বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার জিনফাদিতে শূকরের মাংসের বিভাগটি এত বড় যে এটি একটি আলাদা ভবনে অবস্থিত। এই ভবনের ভেতরের বাতাস মাংসের মিষ্টি গন্ধে ভরপুর এবং ভারী কুড়ুল দিয়ে হাড় কাটা ও চর্বি ছাঁটার শব্দে মুখর।

চীনের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও ভাষায় শূকরের মাংসের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, চীনা ভাষায় ‘বাড়ি’ বা ‘পরিবার’ শব্দের প্রতীক হলো একটি ছাদের নিচে শূকরের ছবি। আর ‘মাংস’ বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ ‘রো’ সাধারণত শূকরের মাংসকেই নির্দেশ করে। 

আর এই শূকরের মাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করা রাজনৈতিকভাবে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি দেশকে দুর্দিনে সহায়তার জন্য একটি ‘কৌশলগত শূকরের মাংস মজুদ’ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে।

তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনা পণ্যের ওপর শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং যখন পাল্টা আমেরিকান শূকরের মাংসে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, তখন অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে দৈনন্দিন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

শূকরের মাংস যখন দুই প্রভাবশালী দেশের রাজনীতির অংশ।

চীন যুক্তরাষ্ট্রে যত পণ্য বিক্রি করে, তার তুলনায় সেখান থেকে ততটা পণ্য কেনে না। তাই চীনকে এমন উপায় বের করতে হয়েছে, যাতে দেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের ক্ষতি না করে ট্রাম্পকে চাপে রাখা যায়।

আমেরিকান কৃষিপণ্য লক্ষ্য করাই চীনের প্রতিক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন ২১ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান পণ্যে ১০-১৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শূকরের মাংস, মুরগি, সয়াবিন এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য। 

এসব পণ্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। এগুলো সেই অঞ্চল যেখানকার বাসিন্দারা গত নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টিকে ভোট দিয়েছিল। এর মধ্যে আইওয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা ও মিসৌরি অঙ্গরাজ্য উল্লেখযোগ্য। গত বছর জাপান ও মেক্সিকোর পর চীন ছিল আমেরিকান শূকরের মাংসের তৃতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক।

শূকরের মাংসের প্রতি চীনের বিশেষ পছন্দ থাকলেও আমেরিকান শূকরের মাংসে শুল্ক বসানোর ফলে চীনকে তেমন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে না। কারণ চীন আমেরিকান শূকরের মাংসের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং নিজের পক্ষে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে সফল হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র গত বছর চীন থেকে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শূকরের মাংস কিনেছিল। এটি দেশটির মোট আমদানির মাত্র ৭ শতাংশ এবং মোট সরবরাহের শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।  

জিনফাদি বাজারের কসাইরা শুল্কের কারণে ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। ঝাং হাইফু নামের এক কসাই বলেন, “আমরা শুধু দেশে উৎপাদিত শূকরের মাংস বিক্রি করি। বাণিজ্য উত্তেজনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।” ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকের সঙ্গে বলার সময় তিনি তাজা কাটা শূকরের পায়ের মাংস সাজিয়ে রাখছিলেন।  

যুক্তরাষ্ট্র গত বছর চীন থেকে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শূকরের মাংস কিনেছিল।

জিনফাদির শূকরের মাংসের বিভাগে প্রবেশপথের কাছে একটি বড় ইলেকট্রনিক বোর্ড ঝোলানো আছে। সেখানে মঙ্গলবার বিক্রির জন্য থাকা ১ হাজার ৭৯৫টি শূকরের দাম (প্রতি পাউন্ড প্রায় ১ ডলার) ও খামারের অবস্থান দেখানো হচ্ছে।

চীনে শুকরের সব অংশেরই চাহিদা রয়েছে। কান, পেট, পা এবং অন্যান্য ভুঁড়ি জাতীয় অংশ সেখানে সুস্বাদু খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ, যেখানে এসব অংশ কম খাওয়া হয়, সেখান থেকে চীনে বিপুল পরিমাণে আমদানি হয়।

গত বছরে চীনে আমদানি হওয়া শুকরের ভুঁড়ির প্রায় ২৫ শতাংশ (৩ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন) যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাংস রপ্তানি সংস্থা জানিয়েছে, চীনা ক্রেতারা যে দামে এসব অংশ কেনে, সেই পরিমাণে কোনো বিকল্প বাজার পাওয়া কঠিন।

আর চীনা কর্তৃপক্ষ মনে করছে, ব্রাজিল ও স্পেনের মতো দেশের খামারিরা তাদের বিশাল বাজারের চাহিদা মেটাতে সহজেই আগ্রহী হবে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেইজিং আমেরিকান কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। এজন্য তারা দেশে শুকর উৎপাদন বাড়িয়েছে। এটি এখন চীনের মোট চাহিদার ৯৭ শতাংশ। তবে ২০১৮ সালে সোয়াইন ফ্লু এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পরিমাণ রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল।

এরপর থেকে চীনের ছোট খামারগুলো বেইজিংয়ের উৎসাহে বড় আকারের বহুতল খামারে পরিণত হয়েছে। চীনের গণমাধ্যম এসব খামারকে কখনও ‘হগ হোটেল’ বলে থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বিভিন্ন দেশ থেকে শুকরের মাংস ও পশুখাদ্য আমদানি বাড়িয়েছে। গত বছর প্রথমবারের মতো রাশিয়া থেকে শুকর আমদানি করা হয়। এটি চীনের মোট আমদানির খুব ছোট অংশ হলেও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এটিকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চাইনিজ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের গবেষক ঝু জেংইয়ং জানান, গত দুই বছরে দেশে শুকরের সরবরাহ স্থিতিশীল ছিল এবং উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে।

ঝু বলেন, ব্রাজিল, স্পেন ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি বাণিজ্য যুদ্ধের সময়ও চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট হবে। তিনি আরও জানান, “দীর্ঘমেয়াদে ট্রাম্প এই নীতি চালিয়ে গেলে আমেরিকান শুকরের মাংস চীনের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।”

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে শুকরের মাংসের ওপর তেমন প্রভাব না পড়লেও বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে পশুখাদ্যের ব্যয় বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়বে এবং চীনে শুকরের মাংসের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে।

চীন আমেরিকান শুকরের তুলনায় আমেরিকান সয়াবিনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। আমেরিকান সয়াবিন চীনের মোট সরবরাহের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এটি মূলত পশুখাদ্য ও রান্নার তেলে ব্যবহৃত হয়। চীনা গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো সয়াবিন মজুত করছে এবং ছয় থেকে নয় মাসের জন্য চুক্তি করে দাম স্থির রাখছে।

বাণিজ্য যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব অনুভব করতে সময় লাগবে। ক্রেতাদের জন্য এই প্রভাবগুলো সরাসরি নির্দিষ্ট শুল্কের সঙ্গে সম্পর্কিত করা কঠিন।

ইউএস-চায়না বাণিজ্য যুদ্ধ বিষয়ক গবেষক কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জ্যাক ঝাংয়ের মতে, শুল্কের কারণে তৈরি হওয়া খরচ এতটাই বিস্তৃত যে, ক্রেতারা সাধারণত বুঝতে পারেন না যে তারা দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এই খরচগুলো পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু তা খুবই অস্পষ্ট।

বেইজিং মনে করছে, তার পাল্টা পদক্ষেপ ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। তারা ইতোমধ্যেই নিজেদের চীনের ভোক্তা ও সরবরাহকারীদের অধিকার রক্ষার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে দাবি করেছে। এর মধ্যে ওয়ালমার্টের পরিচালকদের সতর্ক করা হয়েছে। কারণ রিপোর্ট রয়েছে, আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি তাদের সরবরাহকারীদের দাম কমাতে ও ট্রাম্পের শুল্কের খরচ ভাগ করতে চাপ দিচ্ছিল।

শুল্কের প্রকৃত প্রভাব অনুভব করতে কিছু সময় লাগবে। বাণিজ্য যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত চীনে শুকরের মাংসের দাম বাড়াতে পারে। তবে চীনের দুর্বল অর্থনীতিতে, মূল্যস্ফীতি সামান্য বৃদ্ধি খারাপ কিছু হবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতিক মাসগুলোতে শুকরের মাংসের দাম স্থির ছিল।

ট্রিভিয়াম চায়নার চীনা কৃষি নীতির বিশেষজ্ঞ ইভেন পের মতে, শুল্কের কারণে দাম বাড়ানো চীনের ঘরোয়া শুকর খামারের কোম্পানিগুলোর জন্য ভালো খবর। যুক্তরাষ্ট্রের শুকরের ওপর শুল্ক চাপালে সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যাবে। আর এতে লাভবান হবে স্থানীয় খামারিরা।

অনেক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক চিন্তিত যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ চীনা অর্থনীতিতে আরও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। খরচ কমাতে ও ভোক্তা চাহিদা আরও কমিয়ে দিতে পারে।

চীন তার বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে রীতিমত কসরত করছে। কারণ দেশটির পরিবারগুলো ট্রাম্পের চাপ বাড়ানোর আগে থেকেই খরচ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল। গত রবিবার বেইজিং একটি ‘বিশেষ কর্ম পরিকল্পনা’ ঘোষণা করেছে ভোক্তাদের খরচ বৃদ্ধি করার জন্য।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads