আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনের সময় রাতের ভোটের অভিযোগ ওঠেছিল, যা নিয়ে কথাও শুনতে হয়েছে তাদের। মুহাম্মদ ইউনূসের জমানায় কারসাজির অভিযোগ উঠলো ভোটের এক মাস বাকি থাকতেই।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে এক জামায়াত নেতার বাসায় বিপুল সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট গণনার ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে চলছে আলোচনা–সমালোচনা।
বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা এলেও বিএনপির আপত্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আগামী মাসের ১২ তারিখে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা পেরিয়েছে; যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও শেষ। নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এছাড়া কাদের সিদ্দিকীর দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ বর্জন করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বাহরােইনের ওই ঘটনার একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ঘরে কয়েকজন ব্যক্তি পোস্টাল ব্যালটের খাম গুনছেন। খামের ওপর স্পষ্টভাবে বাহরাইনের ঠিকানা লেখা রয়েছে। দুই ধাপে গণনার পর জানা যায় সেখানে মোট ৪৯০টি ব্যালট ছিল।
ভিডিওর একপর্যায়ে একজনকে বলতে শোনা যায়, “আপনারা এখান থেকে যেগুলা আছে, সব লইয়া যানগা। আমার দরকার নাই। ভিডিও কইরেন না। ফেসবুকে ছাড়িয়েন না।”
আরেকজনের কণ্ঠে শোনা যায়, “একাধিকজন ভিডিও করলে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে যাবে। তখন ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে। এতে পোস্টাল ব্যালটে ভোট বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ভিডিওগুলো যেখানে ধারণ করা হয়েছে সেটি বাহরাইনের হিদ এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতার বাসা।
যদিও দেশটিতে প্রবাসীদের রাজনীতি করার বিষয়ে বিধি-নিষেধ রয়েছে, তারপরও অনেকেই স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
এ ঘটনা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ; অনেকেই এর পেছনে ভোট কারসাজির শঙ্কা করছেন।
দেশটির কয়েকজন বাংলাদেশি জানিয়েছেন, পোস্টাল ব্যালট কার্যক্রম শুরু করার পর পরই জামায়াতের লোকজনের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে সহায়তার নামে তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করে।
জামায়াত নেতার বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাহরাইনের একজন জামায়াত নেতা জানিয়েছেন, তারা কেবল বাহরাইন নয়, গাল্ফভুক্ত সব দেশেই ভোটারদের সহায়তা করছেন।
“মূলত ভোটারদের বেশিরভাগই শ্রমিক হওয়ায় অনেকেরই নির্দিষ্ট ঠিকানা নিয়ে জটিলতা ছিল। তাই আমরা আমাদের নিজেদের ঠিকানা অথবা নিকটস্থ দোকানপাটের ঠিকানা দিয়েছি,” যোগ করেন তিনি।
ভোটে কারসাজির উদ্দেশ্যে এমনটি করেননি বলে তার দাবি।
ওই জামায়াত নেতা অভিযোগ করেন, পোস্টাল ব্যালটকে বিতর্কিত করতে বিএনপির কিছু সমর্থক উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভিডিও করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অবশ্য জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করেছে।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, “বাহরাইনে জামায়াতের কোনো কমিটিই নেই। পোস্টাল ব্যালটের ওই ভিডিওর সাথে জামায়াতের কোনো সংযোগ নেই, এটি অপপ্রচার।”
ভিডিওটি জামায়াত নেতার বাড়িতে ধারণ করা হয়েছে- এমন দাবিও অস্বীকার করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন কী বলছে
এদিকে এই ঘটনার ব্যাখ্যায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, বাহরাইনের ওই ভিডিওতে মোট ১৬০টি পোস্টাল ব্যালট দেখা গেছে এবং কোনো খাম খোলা হয়েছে—এমন কিছু ফুটেজে দেখা যায়নি।
তিনি জানান, বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বিষয়টি দেখছেন এবং পোস্টাল ব্যালট বিতরণে অনুসরণীয় পদ্ধতির কোনো ব্যতিক্রম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে জানাবে বাহরাইনের ডাক বিভাগ।
আখতার আহমেদের ভাষায়, “প্রবাসী ভোটাররা একটা ব্যালট পেয়েছেন এই আনন্দটুকু ধরে রাখার জন্য কেউ ভিডিওটা করে এটাকে পোস্ট করেছেন। তবে এটি করা উচিত হয়নি।”
পরে তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ হয়ে এসব ব্যালট পাঠানো হয় এবং একেক দেশে পোস্টাল ব্যবস্থাও একেক রকম। বাহরাইনের ক্ষেত্রে ১৬০টি ব্যালট এক জায়গায় বক্সে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “ছাত্রজীবনে হোস্টেলে যেমন একটা জায়গায় চিঠিপত্র রেখে যেত, একটা টেবিলের ওপরে, আমরা সেখান থেকে নিজেরা নিজেরা নিয়ে নিতাম। সে রকম একটা বক্সে ১৬০টি ব্যালট দিয়ে গেছে। ওই বক্সটা যখন বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইয়েরা এসে খুলেছেন, চার–পাঁচজন, তখন তারা ওটা ভাগ করে যে আমার পাশের ঘরে থাকে ও, আমি এটা নিচ্ছি। আমি ওটা পৌঁছে দেব। ব্যাপারটা এই রকম।”
ইসি সচিব জানান, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বাহরাইন পোস্টকে জানানো হয়েছে এবং তারা সরেজমিন তদন্ত করে জানাবে, নির্ধারিত পদ্ধতির কোনো ব্যতিক্রম হয়েছে কি না।
বিএনপির উদ্বেগ
বিতর্কের মধ্যেই পোস্টাল ব্যালট নিয়ে আপত্তি তুলেছে বিএনপি। ইতোমধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে দলটি তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, “আমরা মনে করি যারাই এই নির্বাচনকে বিঘ্নিত করার জন্য কারচুপি করার চেষ্টা করছে। আমরা বলেছি, যারা ব্যালট নিয়ে কারচুপির চেষ্টা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ইসি আগেই বলেছিল, এ ধরনের কাজে জড়িত ব্যক্তিদের এনআইডি পর্যন্ত ব্লক করে দেবে।”
এছাড়া পোস্টাল ব্যালটে কিছু রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক প্রথম লাইনে রাখা হলেও বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ মাঝামাঝি রাখা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি।
তার অভিযোগ, “কাগজ ভাঁজ করলে মাঝখানের প্রতীকে চোখ নাও পড়তে পারে। এটা ঘটনাক্রম নয়, উদ্দেশ্যমূলক বলেই মনে হয়েছে।”
এখনো যেসব দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়নি, সেখানে সংশোধন করে পাঠানোর দাবিও জানিয়েছে দলটি।
তদন্ত করছে সরকার
এ ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিককদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি এটা দেখেছি এবং আমি এটাও দেখেছি যে, এ ব্যাপারে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। দেখা যাক আসলে ফলাফল কী দাঁড়ায়।”
তিনি বলেন, “প্রথমবারের মত নেওয়া পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ইচ্ছুক ১৫ লাখ, সংখ্যাটা একেবারে কমও না। এই চেষ্টাতে কিছু সমস্যা হবেই।
“আমাদের যারা এই রাজনীতির ক্ষেত্রে বিচরণ করেন, তারা সবাই যে পারফেক্ট মানুষ তা তো না। কোনোখানেই পারফেক্ট মানুষ নেই। তো, কেউ এটাকে মিসইউজ করার চেষ্টা করবে, এটা তো অবাক হওয়ার কিন্তু কিছু নেই। আমাদের চেষ্টা করতে হবে যেন ‘মিসইউজ’ না হয়। এবং যখনই কিছু জানা যাবে, সেটা ‘ইনকোয়ারি’ করা হোক। ‘ইনকোয়ারির’ নির্দেশ হয়েছে বলে আমি জানি। এখন কতটুকু এগিয়েছে, আমি ঠিক বলতে পারছি না।”
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন নিবন্ধন করেছেন।
মালয়েশিয়ায় ৮৪ হাজার ২৯২ জন, কাতারে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন, ওমানে ৫৬ হাজার ২০৭ জন এবং বাহরাইনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১৯ হাজার ৭১৯ জন।



