‘ইউরোপের সঙ্গে সংযোগ নেই এমন লোকেরা পাসপোর্ট পাওয়ার চেষ্টা করছে’- এমন সমালোচনার মুখে নাগরিকত্ব আইন কঠোর করেছে ইতালি।
যাদের বাবা-মা অথবা দাদা-দাদির ইতালির নাগরিকত্ব রয়েছে এখন থেকে এমন লোকদেরই কেবল নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শতাব্দী আগে অভিবাসী ইতালীয়দের সন্তান-সন্ততি থেকে আবেদনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণেই নাগরিকত্ব আইনে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কী ছিল ইতালির নাগরিকত্ব আইনে?
ইতালির পুরনো নাগরিকত্ব আইন অনুসারে ১৮৬১ সালের ১৭ই মার্চ ইতালি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কোরো কোনো পূর্ব পুরুষ জীবিত ছিল এমনটা প্রমাণ করতে পারলেই যে কেউ নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারতেন।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যান্তোনিও তাজানি বলেন, ওই পদ্ধতিটি পুরনো। এছাড়া অনেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইতালির নাগরিকত্ব নিয়ে থাকে। এই ‘অপব্যবহার’ বন্ধের জন্যই আইনটি পরিবর্তন করা হয়েছে।
হেনলি পাসপোর্ট সূচক অনুসারে ভিসা ফ্রি বা অন-অ্যারাইভ্যাল ভিসা সুবিধার ক্ষেত্রে তিন নম্বর অবস্থানে রয়েছে ইতালির পাসপোর্ট। আকর্ষণীয় এ পাসপোর্টপ্রাপ্তিও তুলনামূলক সহজ ছিল।
গত ২৮ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে তাজানি বলেন,“ইতালির নাগরিক হওয়া একটি ভাবগম্ভীর বিষয়। পাসপোর্ট কোনো খেলা নয় যে, ধরো নাও আর মিয়ামিতে গিয়ে কেনাকাটা করো।”
কী সেই নতুন আইন?
শুক্রবার নতুন এ আইন জারি এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর করা হয়েছে। এতে নাগরিকত্ব পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা বংশোদ্ভূত বা রক্তের সম্পর্ক রাখা হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুসারে, কারো বাবা-মায়ের যেকোনো একজন বা দাদা-দাদি ইতালিতে জন্ম নিলে সে ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে বিবেচনার জন্য জমা পড়া পূর্বের ৬০ হাজার আবেদন নতুন এই আইনের আওতায় পড়বে না বলেও জানানো হয়েছে।
সেইসঙ্গে কর, ভোট না দেওয়া এবং পাসপোর্ট নবায়ন এবং ‘সংযোগ নেই’ এমন দ্বৈত নাগরিকদের ইতালির নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া অন্য দেশে অবস্থিত ইতালীয় কনস্যুলেটগুলো আর নাগরিকত্বের আবেদনের প্রক্রিয়া করবে না বলেও নতুন আইনে বলা হয়েছে।
কাদের ওপর প্রভাব ফেলবে?
ইতালির পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, বিশ্ব জুড়ে পুরনো নিয়মে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য ৬ থেকে ৮ কোটি লোক রয়েছে যা ইতালির জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
বিশাল একটা সংখ্যা নিজেদের ইতালীয় বংশোদ্ভূত দাবি করে ইতালির নাগরিকত্ব দাবি করছেন এবং বিদেশে সেটা নিশ্চিতও করছেন; যার অধিকাংশই দক্ষিণ আমেরিকায়। ১৯ ও ২০ শতকে দারিদ্রতা থেকে বাঁচতে লাখ লাখ ইতালীয় সেখানে অভিবাসিত হয়।
২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদেশে বসবাসকারী ইতালীয়র সংখ্যা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৬ মিলিয়ন থেকে ৬.৪ মিলিয়ন হয়েছে। নতুন করে নাগরিকত্ব নেওয়াদের মাধ্যমে এ সংখ্যা বাড়ছে বলে সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা যায়।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনাতেই ইতালীয় নাগরিকের সংখ্যা ২০ হাজার থেকে বেড়ে ৩০ হাজারে এবং ব্রাজিলে ১৪ হাজার থেকে ২০ হাজার হয়েছে।
কেন এই পরিবর্তন?
বংশপরম্পরা ভিত্তিক নাগরিকত্ব বিষয়ক সমালোচকরা বলেন, এ আইনে এমন লোকদের নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছিল যাদের সঙ্গে ইতালির কোনো সংযোগই নেই।
তাজানি বলেন, এই সংস্কারগুলো প্রয়োজন ছিল। কেননা এর মাধ্যমে কয়েক শতাব্দী আগে অভিবাসী ইতালীয় পূর্বপুরুষ থাকার কারণে এমন লোকদের নাগরিকত্ব দেয়া হয় যাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বা ভাষাগত কোনো বন্ধন নেই।”
লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের জননীতি বিষয়ক অধ্যাপক ভ্যালেন্তিনো লারচিনিস বলেন, পুরনো নিয়মে অনেককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শ্রম বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিত…এবং পদ্ধতিটির অপব্যবহার হচ্ছিল।
আবেদনের সীমা নির্ধারণ যুক্তিসংগত বলেও মনে করেন তিনি।
পুরনো আইনের আরেকটি সমালোচনায় এ আইন অন্যায্য ছিল বলে অভিযোগ ছিল। কেননা এতে বহু বছর আগে বসবাসকারী পূর্ব পুরুষদের উত্তরসূরীদের নাগরিকত্ব দেয়া হলেও অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্বও অস্বীকার করা হয়ে আসছিল।
নতুন এ নিয়ম অনুযায়ী, স্থানীয় নয়, শুধু কেন্দ্রীয় সরকারই নাগরিকত্বের আবদেন প্রক্রিয়া করবে। এমনকি দেশের বাইরের কোনো কনস্যুলেটও তা করতে পারবে না।
তবে নতুন আইন অনুযায়ী অভিবাসীদের সন্তানদের ১৮ বছর বয়স হলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে এবং তা তখনই হবে যখন সে জন্ম থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ইতালিতে বসবাস করবে।
লারচিনেসের মতে, এটা বিদেশে বসবাসকারীদের চেয়ে বড় সমস্যা।
তার হিসাবে ইতালিতে এমন অভিবাসীদের ১৮ বছরের কম বয়সী এক থেকে দুই মিলিয়ন সন্তান রয়েছে, যা বিদেশ থেকে পাসপোর্ট আবেদনকারীর চেয়ে অনেক বেশি।
যদিও তিনি আগামী ৮-৯ জুন অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেখানে নাগরিকত্ব নির্ধারণের অন্যান্য বিষয়গুলো সহজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।
ভোটে সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি নির্ধারিত হবে তা হলো একজন লোক ঠিক কতদিন ইতালিতে বসবাস করলে তিনি নাগরিকত্ব পাবেন। সে সময়টা ১০ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছর এবং একবার নাগরিক হলে তার সন্তানরাও ইতালির নাগরিকত্ব পাবে সে বিষয়টিও নির্ধারিত হবে।
ইতালি ছাড়াও ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বংশপরম্পরা বা রক্তসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও পর্তুগাল। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু বংশপরম্পরার সঙ্গে আরও কিছু যোগ্যতার প্রয়োজন হয়।
আল-জাজিরা অবলম্বনে