গত বছরের মাঝামাঝিতে যে সাক্ষাৎ হয়েছিল, এ বছরের শেষে এসে সেই খবর জানানো হল। ভারতের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের এই খবর জামায়াতে ইসলামীর আমির দেয়ার পর তা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো জামায়াত আমির শফিকুর রহমান কেন এখন এসে এই খবর জানালেন?
বিশেষ করে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তারেক রহমানের প্রতি এক ধরনের সমর্থনসূচক বার্তা দেয়ার পরদিনই শফিকুর রহমানের খবরটি প্রকাশ ইঙ্গিতপূর্ণ বলে ভাবার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বরাবরই আলোচিত। বিএনপি তো এই অভিযোগ করেই থাকে, শেখ হাসিনা ভারতের সমর্থন পেয়েই দেড় দশক ক্ষমতায় টিকে ছিল। গত বছর জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার ভারতে আশ্রয় পাওয়া সেই অভিযোগের প্রতি অনেকটাই সমর্থনসূচক। এরপর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে টানাপড়েন শুরু হয়, তা ক্রমেই বাড়ছে।
তারমধ্যেই খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠক। শ্রদ্ধা জানাতে পাকিস্তানের স্পিকারসহ প্রতিবেশী আরো কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন, তারা সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে গেলেও জয়শঙ্কর ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি তারেকের সঙ্গে দেখা করেই ফিরে যান দিল্লিতে।
এর মধ্যদিয়ে দৃশ্যত ভারত বুঝিয়ে দিল, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা অতীতের খাতায় ফেলে দিয়েছে, তারা এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার একটা বড় কারণ, তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ এখন ভোটের মাঠে নেই। শুধু তাই নয়, নিষেধাজ্ঞার খড়গে দলটির তৎপরতাও নেই।
এই অবস্থায় বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে চাইছে জামায়াত। এক সময় জোটবদ্ধ থাকলেও এখন রীতিমতো শত্রুতে পরিণত হয়েছে দল দুটি। বিশেষ করে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বিএনপি আগে কখনও এতটা উচ্চ কণ্ঠ হয়নি।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের পরিকল্পনাও বদলাতে হচ্ছে। যুক্তরাজ্য থেকে তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রেও ভারতের সঙ্গে বিএনপির এক ধরনের সমঝোতার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এমনও শোনা যাচ্ছে, লন্ডনে তারেকের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে যুক্তরাজ্যে ভারতের বর্তমান হাই কমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামীর, যিনি এক সময় বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি বরাবরই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইছিল। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে বিএনপি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল ভারতে। উদ্দেশ্য ছিল নয়া দিল্লির মনোভাব পরিবর্তন করা।
কিন্তু দিল্লির মন ফেরাতে পারেনি বিএনপি। এক্ষেত্রে বিএনপির ওপর জামায়াতের প্রভাব নিয়ে নয়া দিল্লি নিসংশয় হতে পারছিল না বলেই কূটনৈতিক মহলের খবর। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠনের সময় জোটসঙ্গী জামাতের দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মো. মুজাহিদকে তার মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন।
তার সেই সরকারের ওপর পাকিস্তানের প্রভাব নিয়ে নয়া দিল্লি উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে জানাচ্ছেন বাংলাদেশে তখন ভারতের হাই কমিশনারের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া বিনা সিক্রি।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “মনে রাখতে হবে, তার এই আমলেই বাংলাদেশে জেএমবির উত্থান শুরু হয় কিংবা বাংলাভাইয়ের মতো চরম মৌলবাদী লোকজন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার সরকার কিন্তু সব দেখেশুনেও চোখ বন্ধ করে ছিল। তারপর আমি ঢাকায় দায়িত্ব নিয়ে যাওয়ার পরের বছরই এমন দুটো ঘটনা ঘটলো, যা ভারতের সেই সন্দেহ ও অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর একটা হল চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি থেকে দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা, আর দ্বিতীয়টা শেখ হাসিনার ওপরে গ্রেনেড হামলা।”
নয়া দিল্লি সব সময়ই তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহ নিয়ে উদ্বেগে থাকে। ১০ ট্রাক অস্ত্র যে উলফাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কাছে যাচ্ছিল, তা পরে বাংলাদেশের তদন্তেই উঠে আসে। যেখানে অস্ত্র খালাস হচ্ছিল, বন্দরের সেই জেটি ছিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন, তখন শিল্পমন্ত্রী ছিলেন জামায়াত নেতা নিজামী।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছিল বলেই নয়া দিল্লি মনে করে। বিনা সিক্রির ভাষায়, ওই কয়েক বছরে বাংলাদেশে ভারতের জন্য একটা সমস্যার পাহাড় তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
বিপরীতে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই অনুপ চেটিয়া, অরবিন্দ রাজখোয়ার মতো উলফা নেতাদের ধরে ভারতের হাতে তুলে দেন। তিনি এমনটা প্রায় বলতেন, ভারতের জন্য যা করেছি, তা ভারতকে চিরদিন মনে রাখতে হবে।
কিন্তু এখন শেখ হাসিনাও বাংলাদেশে নেই, আওয়ামী লীগও রাজনীতির মাঠে নেই। এই পরিস্থিতিতে ভারত ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবে, তা ধরে নেয়াই যায়। আর সেক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হওয়ার দিকেও নয়া দিল্লি নজর রাখছিল।
বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ বিবিসি বাংলাকে বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর যেভাবে জামায়াত ও বিএনপির দূরত্ব বেড়েছে, তাতে ভারতের বিএনপির কাছাকাছি আসার এই প্রক্রিয়া অনেকটা সহজ হয়েছে। বিএনপি যদি ভারত সম্বন্ধে তাদের নীতিটা স্পষ্ট করে বলে, তাহলে এতদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনও অনায়াসেই দূর হতে পারে।
গত কয়েক মাসে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবেও একাধিকবার বলেছে, বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনে যারাই জিতে ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে নয়া দিল্লি প্রস্তুত।
ভারতের ক্যাবিনেট সচিবালয়ের সাবেক কর্মকর্তা শান্তনু মুখার্জি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “নির্বাচিত একটি বিএনপি সরকার যদি শুধু ভারতের সিকিওরিটি কনসার্নগুলো অ্যাড্রেস করে, তাহলে তাদের সঙ্গে দিল্লির স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি না হওয়ার কোনো কারণই নেই।”
নয়া দিল্লির পদক্ষেপে এই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বিএনপি আগামীতে বাংলাদেশে সরকার গঠন করবে ধরে নিয়ে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া সেরে ফেলেছে ভারত।
ঠিক এই সময়েই জামায়াত আমির রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারতের কূটনীতিকরা তার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন।
বুধবার রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা উঠলে তার ব্যাখ্যায় শফিকুর রহমান ফেসবুকে লেখেন, রয়টার্সের সাংবাদিক ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে যখন বাসায় ফেরেন, তখন দেশ-বিদেশের অনেকেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তখন ভারতের দুজন কূটনীতিকও তাকে দেখতে তার বাসায় এসেছিলেন।
তখন অন্য দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের খবর সংবাদমাধ্যমে জানানো হলেও ভারতের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিল জামায়াত। তার কারণ তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময় বলেছিলাম, যত কূটনীতিক এখানে এসেছেন, তাদের সকলের বিষয়েই আমরা পাবলিসিটিতে দিয়েছি। আপনাদের এই সাক্ষাৎও আমরা পাবলিসিটিতে দিতে চাই। তখন তারা আমাকে এটি না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।”
‘সেই অনুরোধ’ এতদিন রক্ষা করলেও এখন কেন তা প্রকাশ করে দিলেন, তা জামায়াত আমিরের কথায় স্পষ্ট হয়নি।
এর কারণ হতে পারে, ভারতের সঙ্গে বিএনপির এখন গড়ে ওঠা সুসম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের চাপে রাখতে এটা জামায়াতের কৌশল।
বিএনপি এখন আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। জামায়াত সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইছে। এক্ষেত্রে ইসলামী দলগুলোকে বিএনপির বলয় থেকে বের করে নিতে সক্ষম হয়েছে তারা, অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টিকেও পাশে এনেছে।
এখন জামায়াত বোঝাতে চাইছে যে শুধু বিএনপির সঙ্গে নয়, তাদের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখছে নয়া দিল্লি। ফলে বিএনপির পথ অতটা সহজ নয়।



