খালেদা জিয়া মারা গেছেন

খালেদা জিয়া
খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা গেছেন; তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তিনি ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

মঙ্গলবার ভোর ৬টার দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন।

বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে নিয়ে গিয়ে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে স্বাস্থ্যের অনেকটা উন্নতি হলে দেশে ফিরে আসেনি তিনি।

তবে নানা রোগে জটিলতা ও শরীর–মনে ধকল সহ্য করে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বয়সও ছিল প্রতিকূল।

গত ২৩ নভেম্বর ফের অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় খালেদা জিয়াকে। এক মাসের কিছু বেশি সময় তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

ভোরে যখন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর জানানো হয় তখন হাসপাতালে ছিলেন তার ছেলে তারেক রহমান, তারেকের স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান, দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান, জাফিয়া রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, প্রয়াত সাইদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দার, খালেদা জিয়ার মেজ বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্ম অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে, ১৯৪৬ সালে। জন্ম তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও ১৫ অগাস্টে তিনি তার জন্মদিন পালন করতেন।

তবে ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বাসসের সূত্রে বলা উল্লেখ করা হয়েছিল জন্মদিন ১৯৪৫ সালের ১৯শে আগষ্ট।

বিয়ের কাবিননামা ও পরীক্ষার সনদে আরও দুটি পৃথক জন্মদিনের হদিস পাওয়া যায়।

পারিবারিক নাম খালেদা খানম, ডাক নাম পুতুল। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনীতে হলেও তিনি জলপাইগুড়িতে বোনের বাসা থেকে পড়ালেখা করেন। পরে সেখানে চা ব্যবসায় জড়ান ইস্কান্দার; বিয়েও করেন তিস্তা পাড়ের শহরটিতে।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর খালেদা জিয়ার পরিবার বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানে মিশনারি স্কুলে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরানোর পর দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন খালেদা।

১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদার বিয়ে হয়। পরে স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান তিনি।

১৯৮১ সালে সেনা অভ্যুত্থানে তার স্বামী জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। শুরুতে ভাইস চেয়ারম্যান হিসিবে দলীয় কর্মকাণ্ড শুরু করলেও পরে দলের কর্ণধার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

দীর্ঘ সামরিক শাসন শেষে দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বেগম খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। 

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বহু প্রতীক্ষিত সংসদ নির্বাচনে জীবনে প্রথমবার ভোট করেন খালেদা জিয়া। ওই নির্বাচনে বিএনপি সংসদের বৃহত্তম দল হিসেবে সরকার গঠনের সুযোগ পায়; খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে অধিকাংশ দলের বর্জনের মধ্যে এক তরফা নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে সেখানেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে এক মাসের মধ্যেই ওই সরকারের পতন হয়।

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সঙ্গে চারদলীয় ঐক্যজোট করে সরকার গঠন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া ফের প্রধানমন্ত্রী হন।

তিন বারের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দুইবার তিনি পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, একবার একমাসেরও কম।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান। পরের বছর তারেক রহমান পরিবার নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমালেও খালেদা জিয়া দেশেই ছিলেন।

২০১৮ সালে এতিমদের অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রায় দুই বছর সাজা ভোগ করতে হয় তাকে। পরে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি মিললেও একপ্রকার বন্দি জীবন কাটতে থাকে বিএনপি চেয়ারপারসনকে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ৭ অগাস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। পরে উচ্চ আদালত তাকে দুই মামলা থেকেও খালাস দেয়।

মুক্তি মিললেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সশরীরে অংশ নিতে পারছিলেন না তিনি।

চলতি বছর জানুয়ারিতে লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসাও করিয়ে আসেন খালেদা জিয়া। সবশেষ গত ২১ নভেম্বর ঢাকায় সেনা সদরের সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল খালেদা জিয়াকে।

এর দু’দিন পরই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল; আর ৩৯ দিনের মাথায় সব হিসাবকিতাবের ঊর্ধ্বে চলে গেলেন গৃহিনী থেকে রাজনীতির নানা বাঁকের এই সাক্ষী।  

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads