মবের হানা এবার সাংবাদিকদের ডেরায়; লাঞ্ছিত লতিফ সিদ্দিকীকেই গ্রেপ্তার করল পুলিশ

মব সন্ত্রাসের পর পুলিশ ডিআরইউতে গিয়ে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।
মব সন্ত্রাসের পর পুলিশ ডিআরইউতে গিয়ে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।

এক পরিবারে সব ভাই মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশে এমন একটি পরিবার টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী পরিবার। এই পরিবারের আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত; তার বড় ভাই আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীও মুক্তিযোদ্ধা।

আওয়ামী লীগ থেকে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন লতিফ সিদ্দিকী; স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালের পর ২০০৯ সালে পুনরায় এমপি হওয়ার পর মন্ত্রীও হন।

২০১৪ সালে মন্ত্রী থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হজ নিয়ে এক মন্তব্যের জেরে ইসলামী মৌলবাদীদের সমালোচনায় পড়েছিলেন তিনি। তখন আওয়ামী লীগ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে, মন্ত্রিত্বও হারান।

এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও জিততে পারেননি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং জিতেও যান। তবে তার সাত মাস পর অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংসদ িবলুপ্ত হলে লতিফ সিদ্দিকীর সদস্যপদও লুপ্ত হয়।

এরপর নিভৃতেই ছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ অফিস থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি, দলটির নেতাদের বাড়িতে টানা হামলা চললেও লতিফ সিদ্দিকী অক্ষতই ছিলেন।

তবে বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে মব সন্ত্রাসের শিকার হলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক; তাকে লাঞ্ছিত করে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা।

গত বছর অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর মব তৈরি করে এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার মাঝে-মধ্যে হুঁশিয়ারি দিলেও মব সৃষ্টিকারীরা যে প্রশ্রয়ই পাচ্ছে, তা লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনায় আবার দেখা গেল।

মবের হাত থেকে লতিফ সিদ্দিকীকে উদ্ধারে গিয়ে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের দপ্তরে। পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে।

ডিআরইউতে ‘জুলাই যোদ্ধা’দের বিক্ষোভের মাঝে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী।

তবে ঢাকায় কর্মরত রিপোর্টারদের সংগঠন ডিআরইউতে ঢুকে লতিফ সিদ্দিকীসহ অন্যদের লাঞ্ছিত করল যারা, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।

লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে পুলিশ ওই অনুষ্ঠান থেকে তুলে নেওয়ার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।

লতিফ সিদ্দিকী বৃহস্পতিবার সকালে রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গিয়েছিলেন ‘আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথি হয়ে। সভাটি আয়োজন করেছিল ‘মঞ্চ ৭১’। মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা গণফোরামের নেতা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বীর প্রতীক এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষার দাবি তুলে এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে। তাদের বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান কামাল হোসেন।

রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে সকাল ১১টায় আলোচনার শুরুতেই বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন। তিনি বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে জামায়াত–শিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরাচ্ছে।”

তার বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই মিছিল নিয়ে একদল ব্যক্তি মিলনায়তনে ঢুকে পড়েন। তারা ‘জুলাইয়ের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’, ‘জুলাইয়ে যোদ্ধারা, এক হও লড়াই করো’ স্লোগান দিতে থাকে।

লতিফ সিদ্দিকী তখন একটি চেয়ারে চুপ করে বসে ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা প্রথমে অনুষ্ঠানের ব্যানার টেনে ছিঁড়ে ফেলে। পরে লতিফ সিদ্দিকীকে ঘিরে ধরে স্লোগান ও গালাগালি দিতে থাকে। একজন পেছন থেকে লতিফ সিদ্দিকীর মাথায় হাত দিয়ে আঘাতও করেন।

অধ্যাপক কার্জন বেরিয়ে যেতে চাইলে তাকে বাধা দেয় ওই ব্যক্তিরা। তাকে জোর করে ধরে বসিয়ে দেওয়া হয়। মাইক্রোফোন দিয়ে আঘাতও করা হয় উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের।

এই অবস্থা চলার মধ্যে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পুলিশের একটি দল গেলে লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জনসহ ১৫ জনকে তাদের হাতে তুলে দেন বিক্ষোভকারীরা।

লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে যাওয়ার সময় শাহবাগ থানার এসআই রাশেদ সাংবাদিকদের বলছিলেন, “এখন তো এখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা নিয়ে যাচ্ছি। পরে সিনিয়ররা সিদ্ধান্ত নেবেন।”

লতিফ সিদ্দিকী তখন সাংবাদিকদের বলছিলেন, “আমি জানতাম না এখানে সমস্যা হবে। এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েই এসেছিলাম। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”

পরে শাহবাগ থানার ওসি মনসুর খালিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, লতিফ সিদ্দিকীসহ পাঁচ-ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।

লতিফ সিদ্দিকীকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তর সন্ধ্যা অবধি এড়িয়ে যাচ্ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। পরে রাতে জানানো হয়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এই তথ্য জানিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “লতিফ সাহেবের বক্তৃতা দেখলাম, যেই ব্যানারে আসছে, সেই ব্যানারটা দেখলাম। এছাড়া তাদের কলাম-বই এসব অ্যানালাইসিস করে দেখলাম, একটা নির্দিষ্ট দিকে যাচ্ছে। তারা যে সমস্ত বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছে, তা রাষ্ট্রের অবস্থানের সাথে কন্ট্রাডিক্টরি।”

মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই

অনুষ্ঠানে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি এখানে প্রোগ্রামে এসেছি দল মতের হিসাবে নয়, এখানে সব মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকা হয়েছে; তাই এসেছি।

“আমরা প্রোগ্রাম শুরু করেছিলাম। লতিফ সিদ্দিকী সাহেব এসেছেন। কামাল হোসেন সাহেব আসেননি। ২০/২৫ জন ছেলে এসে হট্টগোল করে। আমাদের ঘিরে ফেলে।”

বিক্ষোভকারীরা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দেন সাংবাদিকদের কাছে।

আল আমিন রাসেল নামের একজন প্রথম আলোকে বলেন, “আমরা জুলাই যোদ্ধা। এখানে পতিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে ষড়যন্ত্র করছে। জুলাই যোদ্ধারা বেঁচে থাকতে এমন কিছু আমরা মেনে নেব না।”

ডিআরইউতে লতিফ সিদ্দিকীর ওপর চড়াও হওয়াদের নেতৃত্বে ছিলেন পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর নেতা শামীম হোসাইন।

সেখানে পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর নেতা শামীম হোসাইনকে দেখা গিয়েছিল নেতৃত্বের কাতারে।

তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “একটি গোষ্ঠী একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি করে চব্বিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, একাত্তর আমাদের ভিত্তি এবং চব্বিশ আমাদের মুক্তি।

“এখানে যারা জড়ো হয়েছেন, তারা সবাই চব্বিশের খুনের সঙ্গে জড়িত। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও আছে। আমরা আইন হাতে তুলে না নিয়ে তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করেছি।”

যারা অনুষ্ঠানে মব সৃষ্টি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নে পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল বলেন, “মামলা হলে তদন্ত করে যার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা তদন্তের ব্যাপার।”

নিন্দা-প্রতিবাদ

মঞ্চ ৭১ প্ল্যাটফর্মের অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে লতিফ সিদ্দিকীসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি চিহ্নিত শক্তি একাত্তর আর চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইছে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নানাভাবে আক্রমণ হচ্ছে। স্বঘোষিত ‘জুলাইযোদ্ধা’রা আজ মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় যেভাবে মব-সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে, তা ন্যক্কারজনক।

“যারা এ ধরনের হামলা চালাচ্ছে, তারা প্রকৃতপক্ষে চব্বিশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষায় দেশ পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করছে এবং পরাজিত ফ্যাসিস্ট বাহিনীর পুনর্বাসনে কাজ করছে।”

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউ তাদের মিলনায়তনে মঞ্চ ৭১ আয়োজিত অনুষ্ঠানে হামলা এবং তা ঠেকাতে যাওয়া সাংবাদিক নেতাদের নাজেহাল করার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ।

এক বিবৃতিতে ডিআরইউ বলেছে, “প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিআরইউতে দল-মত-পথ নির্বিশেষে সবার কথা বলার সুযোগ ছিল। কখনো ডিআরইউতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কারো হস্তক্ষেপ ছিল না। আগামী দিনে কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে ডিআরইউ তা প্রতিহত করবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

লতিফ সিদ্দিকীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ফেইসবুক পেইজে এক পোস্টে বলা হয়েছে, “মনে রেখো বাংলাদেশ, জুলাই যোদ্ধা নামে শিবিরের #সন্ত্রাসীরা এই দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের গায়ে হাত তুলেছে, #আহত করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে আর ইউনুসের নিয়োগ করা পুলিশের শিবিরকর্মীরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে জেলে নিয়েছে।

“৭১ কে স্মরণ করতে কাউকে আওয়ামী লীগ করতে হবে না, ৭১ এদেশের ১৮ কোটি মানুষের, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের। ৭১ এর হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads