যে গান যুদ্ধদিনে জুগিয়েছিল প্রেরণা

একাত্তরে গান তখন হয়ে উঠেছিল সাহসের ভাষা, প্রতিবাদের শপথ, আর স্বাধীনতার স্বপ্নে পৌঁছানোর এক অনিবার্য সঙ্গী। ছবিতে রেডিও হাতে হেঁটে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারা।
একাত্তরে গান তখন হয়ে উঠেছিল সাহসের ভাষা, প্রতিবাদের শপথ, আর স্বাধীনতার স্বপ্নে পৌঁছানোর এক অনিবার্য সঙ্গী। ছবিতে রেডিও হাতে হেঁটে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

মুক্তিযুদ্ধ শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়, ছিল মননের, বিশ্বাসের ও চেতনার সংগ্রাম। রণাঙ্গনের সম্মুখভাগে যেমন গর্জে উঠেছিল রাইফেল আর মর্টারের শব্দ, তেমনি শরণার্থীশিবিরে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরের অলিগলিতে মানুষের বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল অজস্র গান। গান তখন হয়ে উঠেছিল সাহসের ভাষা, প্রতিবাদের শপথ, আর স্বাধীনতার স্বপ্নে পৌঁছানোর এক অনিবার্য সঙ্গী।

পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নির্মমতা, গণহত্যা, মা-বোনের সম্ভ্রমহানী আর লাখো মানুষের আত্মত্যাগের মাঝেই জন্ম নিয়েছিল সেই সব কালজয়ী গান, যা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল করেছিল দৃঢ় এবং পুরো জাতিকে বেঁধেছিল এক সুতোয়।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল সেই সময়ের প্রধান ‘সাংস্কৃতিক অস্ত্রভাণ্ডার’। যুদ্ধের উত্তাল দিনে এই বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত গানগুলোই হয়ে উঠেছিল গণজাগরণের মূল হাতিয়ার। রেডিওর ছোট্ট স্পিকার ঘিরে মানুষ শুনেছে মুক্তির বার্তা, আর সেই বার্তার সঙ্গে মিশে ছিল গানের শক্তি। যুদ্ধদিনে রচিত ও প্রচারিত অনেক গান সরাসরি রণক্ষেত্রে যোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছে, আবার অনেক গান দেশের ভেতরে ও বাইরে গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত।

বিজয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জন্ম নেওয়া গান ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। ১৬ ডিসেম্বরের সকালে যখন পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিল, চলছে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি, চারদিকে তখন বিজয়ের আনন্দে উত্তাল। সেই মুহূর্তে শহীদুল ইসলাম লিখে ফেলেন গানটির প্রথম চার লাইন। হারমোনিয়ামের সংকট থাকা সত্ত্বেও মুখে মুখে সুর করার চেষ্টা চলতে থাকে, শেষে একটি হারমোনিয়াম জুটে যায়। সুজেয় শ্যামের সুরে শেষ পর্যন্ত গানটি পূর্ণতা পায়। অজিত রায়ের কণ্ঠে লিড দিয়ে রেকর্ড শেষ হয় মাত্র ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে। বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘোষণা হওয়ার পরপরই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গানটি প্রচারিত হয়। এটি ছিল সেই বেতার কেন্দ্রের শেষ গান, যা স্বাধীনতার চূড়ান্ত মুহূর্তকে সঙ্গীতের ভাষায় ধারণ করে রেখেছে।

এর অনেক আগেই মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণামন্ত্রে পরিণত হয়েছিল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। গাজী মাজহারুল ইসলামের লেখা এই গানটির সুর করেছিলেন আনোয়ার পারভেজ। এই গান তৈরির পেছনের গল্পও যুদ্ধদিনের তাড়না আর সময়ের চাপকে স্পষ্ট করে। বসার জায়গা না পেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মাত্র কুড়ি মিনিটে সুর করা হয়েছিল গানটির। পরে ঢাকা রেকর্ডিং স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ শুধু একটি গান নয়, এটি ছিল একটি শ্লোগান, একটি অঙ্গীকার, যা মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়েছিল।

শহীদদের স্মরণে লেখা ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের আবেগী স্মারক। ফজল-এ-খোদা ১৯৬৯ সালে গানটি লিখলেও ১৯৭১ সালে এসে এটি নতুন তাৎপর্য পায়। প্রথমে বশীর আহমেদের সুর করার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও পরে আবদুল জব্বার গানটিতে সুর করেন এবং নিজেই কণ্ঠ দেন। যুদ্ধদিনে এই গান মানুষের হৃদয়ে গভীর আবেদন তৈরি করেছিল। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ত্যাগের গৌরবময় স্মৃতি এই গানের মাধ্যমে জাতির মনে স্থায়ী হয়ে যায়।

গোবিন্দ হালদারের লেখা গানগুলো মুক্তিযুদ্ধের সংগীতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে আজও। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যাঁরা’ গানটি ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত হয়। আপেল মাহমুদের সুরে এবং স্বপ্না রায়ের কণ্ঠে গানটি রেকর্ড করা হয়েছিল বিজয়ের খবর পাওয়ার পরপরই। জ্বরাক্রান্ত অবস্থাতেও শিল্পী কণ্ঠ দিতে পিছিয়ে যাননি, যা বিজয়ের মুহূর্তে ত্যাগের মূল্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

একই গীতিকারের লেখা ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানটি যেন সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ের কথা বলে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শিল্পীদের আনাগোনার মধ্যেই গোবিন্দ হালদার তাঁর পাণ্ডুলিপি তুলে দেন আপেল মাহমুদের হাতে। কথা পড়ে মুগ্ধ হয়ে তিনি দ্রুত সুর করেন। জুন মাসে রেকর্ড হওয়া এই গান শুধু বেতারে নয়, পথে-ঘাটে মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি হয়ে ওঠে একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল’ গানটি ছিল উদ্দীপনার বিস্ফোরণ। গোবিন্দ হালদারের কথায় সমর দাসের সুরে সমবেত কণ্ঠে গাওয়া এই গান মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বসেই গানটি রচিত ও প্রচারিত হয়, যেখানে স্বাধীনতার স্বপ্ন আর রক্তের দামের কথা একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে।

মায়ের কাছে সন্তানের প্রতিজ্ঞার মতো আবেগী গান ‘মা গো ভাবনা কেন’ লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুর করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুরোধে অল্প সময়ের মধ্যেই লেখা এই গান মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছিল। শান্তিপ্রিয় বাঙালির অস্ত্র ধরার নৈতিক যুক্তি এই গানের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার তালিকায় আরও অনেক গান রয়েছে যেগুলো আজও প্রাসঙ্গিকভাবে ঘুরেফিরে আসে।

‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’ মানুষের ত্যাগের শপথকে ভাষা দিয়েছে। ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’ গানটি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানকে গণকণ্ঠে রূপ দেয়। ‘জনতার সংগ্রাম চলবে চলবে’ বা ‘নোঙর তোল তোল’ গানগুলো সংগ্রামের ধারাবাহিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’ গানটি মুক্তির পথে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস জুগিয়েছে। এমনকি ‘ছোটদের বড়দের সকলের’ গানটিও যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মনে আশার সঞ্চরণ করেছিল সেসময়।

এ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ ও রজনীকান্তের দেশাত্মবোধক গানগুলোও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ যেন বন্দিত্ব ভাঙার আহ্বান হয়ে উঠেছিল। এসব গান যুগে যুগে রচিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এগুলো নতুন অর্থ ও শক্তি নিয়ে মানুষের কণ্ঠে ফিরে আসে।

মুক্তিযুদ্ধের গান শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। মার্কিন সংগীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ গানটি বিশ্বজনমতকে নাড়া দিয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশা আর সংগ্রামের কথা আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছে দিয়েছিল।

যুদ্ধ শেষ হয়েছে বহু আগেই, কিন্তু সেই সময়ের গানগুলো আজও আমাদের মনে গেঁথে আছে। যখনই ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ বা ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ বাজে, তখন শুধু অতীত নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের গল্প সামনে এসে দাঁড়ায়। এই গানগুলো আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা কেবল অর্জনের বিষয় নয়, এটি ধরে রাখারও দায়।

মুক্তিযুদ্ধের গান তাই ইতিহাসের দলিল, প্রেরণার উৎস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অবিনাশী চেতনা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads