ঋণখেলাপি গভর্নর পেল বাংলাদেশ

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

ধরুন বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ঋণ খেলাপিদের কোনো সুবিধা দিল, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে গভর্নর তার সুবিধার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিলেন। কেউ বলতে পারেন, এমন সুবিধা দিতে তো আগে বরাবরই দেখা গেছে। হ্যাঁ, দেখা গেছে; রাজনৈতিক প্রভাবে অতীতের গভর্নররা তা করেছেন ঠিকই। তবে তাদের কেউ নিজে ঋণ খেলাপি ছিলেন না। এবার যিনি গভর্নর হলেন, তিনি নিজেই ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত।

জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের সময় বড় চমক দেখিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে। বিদেশি নাগরিকত্বের জন্য যাকে বাদ দেওয়ার দাবি এক সময় এই দলটিই তুলেছিল।

এরপর প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রদবদল অনুমেয় ছিল, তা হয়েছেও। কিন্তু তার মধ্যে যে আরো বড় চমক রয়েছে, তা দেখা গেল গভর্নর নিয়োগের মধ্যদিয়ে। আর্থিক বিভাগে প্রায় অচেনা মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দিয়ে যথন প্রজ্ঞাপন্ হলো, তখন ঢাকার অনেক পত্রিকার সাংবাদিকরা খুঁজছিলেন, ইনি কে? কারণ এই নামে কোনো অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার কিংবা আমলা তাদের চেনা নেই।

শেষে বের হলো তিনি ওই তিন ক্ষেত্রের কেউ নন, তার পরিচয় তিনি একজন ব্যবসায়ী। তার তৈরি পোশাকের কারখানা রয়েছে, সেই কারখানার আবার খেলাপি ঋণও ছিল। যদিও গভর্নর হওয়ার আগে সেই ঋণ পুনঃতফসিল করে ঋণ খেলাপির তালিকা থেকে নাম কাটান তিনি।

এই নিয়োগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে ইউনূসের নিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শপথ নেয়ার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের পরপরেই ত্বরিত গতিতে ইউনূসের সাজার রায় বাতিল করে আদালত, তারপরই তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। আবার তারেক রহমানও প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার আগে দুর্নীতির এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলার দণ্ড থেকে মুক্ত হন।

সেই পথ ধরেই গভর্নর হলেন মোস্তাকুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের পঞ্চদশ গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি। বাংলাদেশে গভর্নরের যাত্রাটি শুরু হয়েছিল এ এন এম হামিদুল্লাহকে দিয়ে। তিনি ছিলেন একজন ব্যাংকার। এরপর যে ১৩ জন আসেন তাদের কেউ অর্থনীতিবিদ, কেউ আমলা।

অন্তর্বর্তী সরকার আমলে নিয়োগ পাওয়া সর্বশেষ গভর্নর ছিলেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। তাকে বেশ হেনস্তার মধ্যে বিদায় নিতে হলো। তার নিয়োগের মেয়াদ আরো ছিল। বুধবার তিনি অফিসও করছিলেন। তারমধ্যে ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা বিক্ষোভ করতে থাকেন।

গভর্নর পদ থেকে আহসান এইচ মনসুরের বিদায় হয়েছে বেদনাদায়ক।

এদিকে সচিবালয়ে চলে নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া। তা সংবাদমাধ্যমে দেখে নিজেই অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যান আহসান মনসুর। তবে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ পড়েন চরম হেনস্তার মুখে। একদল কর্মকর্তা তাকে আক্ষরিক অর্থে ঘাড় ধরে ব্যাংক থেকে বের করে দেন। এভাবে মব তৈরি করে গভর্নর পরিবর্তনকে অর্থনীতিবিদরা ভালো চোখে দেখছেন না।

দেশে গভর্নর নিয়োগের কোনো আইন নেই। ১৯৭২ সালের ব্যাংক আদেশ দিয়ে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে এই নিয়োগ হয়ে আসছে। এই আইনে গভর্নর পদের অযোগ্যতার বিষয়গুলোই শুধু বলা আছে।

তা অনুসারে, পাগল কিংবা মস্তিষ্কৃবিকৃত কোনো ব্যক্তি, এমপি কিংবা স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত কেউ, ঋণ খেলাপি কিংবা দেউলিয়া কোনো ব্যক্তি, কোনো ব্যাংকের কর্মচারী, আদালত কর্তৃক এক বছরের বেশি মেয়াদে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি গভর্নর হতে পারবেন না।

অর্থাৎ দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নিয়ন্ত্রকের পদটিতে নিয়োগের যোগ্যতার ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বালাই নেই। সেই নিরিখে মোস্তাকুরের নিয়োগে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।

কে এই মোস্তাকুর

চার বছর মেয়াদে গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়া মোস্তাকুর রহমানকে নিয়ে খোঁজ করে জানা যায়, তিনি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। এক সময় পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউজ এবং আবাসন ব্যবসায়ও যুক্ত ছিলেন।

তার জন্ম ১৯৬৬ সালে ঢাকায়। তবে তার পৈত্রিক বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নে। তার পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে। পরে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ করেন তিনি।

এরপর তার আর পড়াশোনার কোনো খবর পাওয়া যায় না। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ব্যবসা করাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে গেছেন।

মোস্তাকুর হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।

তিনি আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব ও ঢাকার ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-ডিসিসিআই এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সদস্য। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে তিনি ছিলেন বিভিন্ন সময়ে।

এমআরএম সিকিউরিটিজ নামের একটি ব্রোকারেজ হাউজের প্রতিনিধি হিসেবে মোস্তাকুর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন। মালিকানা বদলে সেই প্রতিষ্ঠানের নাম এখন ইউসিবি ব্রোকারেজ হাউজ।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৯৯৮-২০০০ সালে যখন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি ছিলেন, তখন পর্ষদ সদস্য ছিলেন মোস্তাকুর। এথেকে তাকে গভর্নর নিয়োগের কারণ হিসেবে একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আরো খোঁজ নিলে জানা যায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন মোস্তাকুর। তার বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মামুন সোনারগাঁও থানা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ছিলেন।

ঋণ খেলাপির কলঙ্ক তিলক

মোস্তাকুরকে গভর্নর নিয়োগ দেয়ার পর ফেইসবুকে নানাজন ঋণ খেলাপি হিসেবে তাকে চিহ্নিত করেন। পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন, “দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে এনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বানিয়ে দেওয়া হলো। আরও চমক হচ্ছে, এই ব্যক্তি কিছুদিন আগেও ঋণখেলাপি ছিলেন। খেলাপি থেকে মুক্ত হয়েই সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বে!”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) থেকে নেওয়া ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ না করায় খেলাপি হয় মোস্তাকুরের কোম্পানি হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও এমটিবির কর্মকর্তারা বলেন, গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের তফসিলের সময় ৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণটি এককালীন ২ শতাংশ অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে পুনঃতফসিল করা হয়।

নির্বাচনের আগে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের হিড়িক পড়ে বরাবরই। এবার ঋণ খেলাপি হয়েও শিথিলতার সুযোগে অনেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছে। তাদের কেউ কেউ মন্ত্রীও হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে নীতি সহায়তা দিয়ে নতুন সার্কুলার দেয়া হয়েছিল। সেই আলোকে এমটিবির ঋণটি মোস্তাকুর নবায়ন করে নেন। অর্থাৎ খেলাপির খাতা থেকে নামটি কাটান িতনি।

এমটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, “নিয়মিত ক্রয়াদেশ না পাওয়ায় রপ্তানি খাতের হেরা সোয়েটার্স ব্যাংকের টাকা দিতে পারছে না। তাদের সক্ষমতা আছে রপ্তানি বাড়ানোর। বাংলাদেশ ব্যাংক যে পলিসি সাপোর্ট দিয়েছে, সেই সার্কুলারের আলোকে তিনি পুনঃতফসিল করার আবেদন করেন। ২ শতাংশ এককালীন পরিশোধ করতে চান, তাতে পর্ষদ সম্মতি দেয়।”

আর সেই সুযোগটিই নিয়েছেন মোস্তাকুর। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন, এমনটা শোনা যায়নি। তাহলে তিনি কি রাষ্ট্রীয় কোনো পদে আসছেন বলে জানতেন? তা জানা যায়নি।

তবে কঠিন সময়ে যে গভর্নরের দায়িত্ব নিচ্ছেন, তা বুঝতে পারছেন মোস্তাকুর। তিনি প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “আসলে জানেনই তো অর্থনীতির অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা। তাই এই সময়টায় এই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করায় তো একটা চ্যালেঞ্জ আছে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads