এবারের ঈদে ঢাকায় সুলতানি মোঘল আমলের কায়দায় ঈদ আনন্দ মিছিল হয়েছে। ব্যান্ড পার্টির বাজনা, ঘোড়ার গাড়ি যেমন ছিল, তেমনি ছিল মোগল ও সুলতানি আমলের ইতিহাস সংবলিত পাপেট। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটি পাপেট বা প্রতিকৃতি নিয়ে।
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফেসবুকে সেটি শেয়ার করে অনেককে নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন। কেউ করেছে হাস্যরসও।
কেউ কেউ আবার গাধার পিঠে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বসে থাকার সাথে ঈদের সংস্কৃতির মিল কোথায় তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন নাসিরুদ্দিন হোজ্জা গাধার পিঠে কেন উল্টো দিকে মুখ করে বসে আছেন?
ফেসবুক পোস্টে অনেকে মন্তব্য করেছেন, নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট দেখতে অনেকটা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের মতো। তবে পাপেটের শিল্পী জানিয়েছেন, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান একই ব্যক্তিত্বের লোক না।

ঈদ আনন্দ মিছিলে ঠাঁই পেয়েছিল গরুর গাড়ি
বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ মিছিল
ঢাকার শেরে বাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে ঈদুল ফিতরের জামাত শেষে সেখান থেকেই শুরু হয় বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ মিছিল। আগারগাঁওয়ের প্রধান সড়ক দিয়ে খামারবাড়ি মোড় হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়।
মিছিলে অংশ নিতে এসে অনেকেই বলেন, এই ধরনের আয়োজন তাদের অনেকেই এর আগে দেখেননি। যে কারণে এই আয়োজনে শামিল হয়ে অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেও দেখা যায়। ব্যান্ডদলের বাদ্যযন্ত্রের সাথে সাথে অনেকে নেচে-গেয়ে আনন্দ মিছিলে অংশ নেন।

ঈদ আনন্দ মিছিলে ব্যান্ডদল
এই মিছিলে ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’সহ বিভিন্ন ধরনের ইসলামি সঙ্গীতও বাজানো হয়।
মিছিলে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মিছিলকারীদের হাতে ছিল নানা ধরনের সামাজিক ও ঐক্যের বার্তা তুলে ধরা প্ল্যাকার্ড। এ সময় তাদের ‘ঈদ মোবারক’সহ জুলাই আন্দোলনে মুখে মুখে ফেরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।

ঈদ আনন্দ মিছিলে আরব্য রজনীর পরিচিত আর বিখ্যাত চরিত্রের পাপেট
আনন্দ মিছিলে বড় বড় পাপেট
আনন্দ মিছিলের সামনের অংশে দুই সারিতে ছিল আটটি সুসজ্জিত ঘোড়া। আরও ছিল ১৫টি ঘোড়ার গাড়ি,আর ছিল মোগল ও সুলতানি আমলের ইতিহাস সংবলিত ১০টি পাপেট শো।
আর এই পাপেট শো আনন্দ মিছিলে আসা মানুষের মধ্যে বাড়তি আনন্দ যোগ করে, বিশেষ করে এ নিয়ে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল ছিলো সবচেয়ে বেশি।
পাপেট হিসেবে আরব্য রজনীর পরিচিত আর বিখ্যাত চরিত্র কিংবা শিশুদের কাছে জনপ্রিয় এমনসব চরিত্র ঠাঁই পেয়েছে।
বড় বড় পাপেট হিসেবে দেখা গেছে আলাদীন, আলী বাবা-চল্লিশ চোর,আর নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মতো চরিত্র।
ঈদ আনন্দ মিছিলে হোজ্জার পাপেট দেখে শিশুরা আনন্দিত হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদেরও সেটি কম বিনোদন দেয়নি। ফলে ফেসবুকে এটি নিয়ে নানা রকম আলোচনা এখনও চলছে।

ঈদ আনন্দ মিছিলে বিভিন্ন পাপেট
গাধার পিঠে উল্টো দিকে মুখ করে কেন বসে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা জনপ্রিয় দার্শনিক এবং বিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কেউ কেউ তাকে মোল্লা নাসিরুদ্দিন নামেও চিনতেন। তার হাস্যরসাত্মক গল্প এবং উক্তিগুলোই তাকে বইয়ের পাতা থেকে মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক করে স্মরণীয় চরিত্র করে রেখেছে। শত শত বছর ধরে মানুষ গল্পে বা উপদেশ দিতে মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার উদাহরণ দেয়।
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু অংশে তিনি একজন বিখ্যাত লোকচরিত্র। হাঙ্গেরি থেকে ভারত, চীন এবং দক্ষিণ সাইবেরিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলজুড়ে তার গল্প প্রচলিত।
অ্যামিউজিং প্ল্যানেট-এর এক প্রতিবেদনে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন একইসাথে একজন জ্ঞানী ও সরল মানুষ। নিজের বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও সাধারণ জ্ঞান দিয়ে যেকোনো নাজুক পরিস্থিতি খুব সহজেই সামাল দেওয়ায় তার বেশ নাম ছিল। তার উপস্থিত বুদ্ধি ও বিজ্ঞতার খ্যাতি ছড়িয়ে গেছে দেশ-দেশান্তরে।
তুরস্ক ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগেই দেখা যায়, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসে আছেন।
গাধার পিঠে তার এভাবে বসা নিয়েও একাধিক গল্প প্রচলিত আছে। আর তা হলো- একদিন নাসিরুদ্দিন হোজ্জা তার গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসেছিলেন। লোকেরা যখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসিনি, বরং গাধাটিই ভুল দিকে মুখ করে আছে।’

ঈদ আনন্দ মিছিলে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট নিয়ে যত আলোচনা
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেটের সঙ্গে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাদৃশ্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন।
কেউ কেউ গোফ-বিহীন নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এবং জামায়াত আমিরের চেহারার মিলের কথাও তুলে ধরেছেন। কিন্তু পাপেটের মূল শিল্পী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল হক সে দাবি নাকজ করে দিয়েছেন।

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট (বামে), জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান (ডানে)
অধ্যাপক জাহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট ক্যারেক্টরটি বানানোর জন্য ছবিটি নেয়া হয়েছিল একটি আরবি বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে। প্রচ্ছদের সাথেই নির্মিত ওই পাপেটটির চেহারার অনেক মিল রয়েছে।”
সহকারী অধ্যাপক হক বলেন, “নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও জামায়াত আমির একই ধরনের ব্যক্তিত্বের লোক না। হয়তো এখানে পোশাকের কারণে এক ধরনের মিল পাওয়া গেছে। এটা এক ধরনের কাকতাল।”
“গায়ের কালো কোট, লাল জুতা, সাদা পাগড়ি সব ওটার সাথেই যায়। তবে, জামায়াত আমিরের সাথে কিছু মিল পাওয়া গেলেও, সেটি যে ইচ্ছাকৃতভাবে ওনাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, বিষয়টি একদমই এমন না।” যোগ করেন তিনি।

যে ছবি অনুকরণে বানানো হয় নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেটটি
জাহিদুল হক বলেন, “আমাদের পরিকল্পনার সময় হাতি ঘোড়াসহ বিভিন্ন কিছু ছিল। কিন্তু আমরা পরে চিন্তা করলাম, শিশুদের জন্য কোন কিছু করা যায় কী না। সেই জায়গা থেকে আরব্য রজনী কিংবা বাচ্চাদের প্রিয় কিছু চরিত্র আমরা যুক্ত করতে চেয়েছিলাম।”
সেই চিন্তার জায়গা থেকে আলাদীন, আলী বাবার চল্লিশ চোর, নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মতো শিশুদের প্রিয় চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পাপেটের মূল শিল্পী সাথে গলা মিলেয়েছেন উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলা সাহিত্যেও নাসিরুদ্দিন হোজ্জা চরিত্র এসেছে। এটা একটি মেটাফোরিক কারেক্টর। বাচ্চারা এসব পছন্দ করে। যে কারণে এটাকে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করছি”।