এক বক্তব্যে তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা নেতা থেকে নতুন দলের মুখ্য সংগঠকের দায়িত্ব নেওয়া হাসনাত আব্দুল্লাহ। তার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, সেই সেনাবাহিনী নিশ্চুপ হলেও রাজনৈতিক নেতারা জানিয়ে যাচ্ছেন প্রতিক্রিয়া।
তবে সেই প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হাসনাতের বক্তব্য প্রকাশের ধরন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন তারই দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী।
সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে হাসনাত যে ফেইসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তা শিষ্টাচার বর্জিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। শনিবার সিলেটে এক ইফতার অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি এই মন্তব্য করেন বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।
আওয়ামী লীগ পতনের আন্দোলন যাদের নেতৃত্বে হয়েছে, সেই বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের শীর্ষ সারির সমন্বয়ক ছিলেন হাসনাত। অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পর গত সেপ্টেম্বরে আন্দোলনকারীরা যে জাতীয় নাগরিক কমিটি গড়ে তোলে তার আহ্বায়ক ছিলেন নাসীরুদ্দীন।
গত মাসে অভ্যুত্থানকারীরা নতুন দল এনসিপি গঠন করলে সেখানে মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পান নাসীরুদ্দীন। হাসনাত হন মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল)।
হাসনাত বৃহস্পতিবার রাতে এক ফেইসবুক পোস্টে দাবি করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে চাইছে সেনাবাহিনী। গত ১১ মার্চ সেনানিবাসে এক বৈঠকে তাদের এজন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।
সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেই বৈঠকে ছিলেন বললেও কারও নাম তিনি প্রকাশ করেননি। তবে পরে জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধা ও বর্তমানে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার একটি ভিডিও-ও শেয়ার দেন তিনি, যেখানে আসিফ বলছিলেন, ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে মুহাম্মদ ইউনূসকে মেনে নিতে চাননি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ জামান। তিনি তখন আওয়ামী লীগের পক্ষে ওকালতিও করেছিলেন।

দলের সহকর্মী হাসনাতের ওই বক্তব্য নিয়ে নাসীরুদ্দীন সিলেটে বলেন, “তার (হাসনাত) এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা উচিৎ হয়নি। আমরা মনে করি, এটা শিষ্টাচারবর্জিত একটি স্ট্যাটাস হয়েছে।”
তবে তিনি বলেন, ““রাষ্ট্রের ফাংশনাল জায়গায় আমরা দেখি যে ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ রাজনৈতিক জায়গায় হস্তক্ষেপ করছেন। আমাদের কাছে এই ধরনের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। এই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নেবে এবং সরকারি যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, সেগুলোর এতে জড়িত না হওয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।”
আওয়ামী লীগ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের বক্তব্যের সঙ্গেও দ্বিমতের কথা জানান নাসীরুদ্দীন। তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা হোক বা যে কেউ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধকরণ, মার্কা, আদর্শ— এগুলো বন্ধকরণ প্রক্রিয়ায় বাধা দেবে, তাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধটা হবে। সেখান থেকে আমরা একটুও পিছপা হব না।”
বৃহস্পতিবার রাতে সেনাবাহিনী নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে আরেক পোস্টে হাসনাতও লিখেছিলেন, “ড. ইউনুস, আওয়ামী লীগ ৫ই আগস্টেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। উত্তর পাড়া ও ভারতের প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগের চ্যাপ্টার ওপেন করার চেষ্টা করে লাভ নেই।”
ফ্যাসিবাদী ও গণহত্যাকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে চিহ্নিত করে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা দলটি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে এলেও বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের তাতে সমর্ষন নেই। প্রধান উপদেষ্টা সম্প্রতি বলেছিলেন যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কোনো প্রক্রিয়া তাদের নেই।
তার ওই বক্তব্যের পরপরই হাসনাতের স্ট্যাটাস আসে, যদিও যে বৈঠকের কথা তিনি বলেন, তা হয়েছিল এখন থেকে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে।
হাসনাতের সেই স্ট্যাটাস ব্যক্তিগত না এনসিপির বক্তব্য, তা আগেই উঠেছিল।
এনিয়ে প্রশ্ন করা হলে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সরাসরি উত্তর এড়িয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “হাসনাত আব্দুল্লাহর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত, দাবি দলগত পর্যায়ের। আমরা শুরু থেকেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে আসছি।”
তবে এনসিপির প্রথম সারির একাধিক নেতা ওই স্ট্যাটাসের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে জানতেন বলে বিবিসি বাংলা জেনেছে।
আখতার বলেন, “হঠাৎ করে আবার নতুন করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে না বা আওয়ামী লীগ চাইলে নির্বাচন করতে পারে, এই ধরনের আলাপগুলো জোরালো হতে শুরু করলো।
“তখন হাসনাত আব্দুল্লাহ তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। স্ট্যাটাস দিবেন, তা আলাপ হয়নি। তবে দলের অবস্থানের বিষয়ে তার বক্তব্য ঠিক আছে।”
হাসনাতের স্ট্যাটাস নিয়ে আলোচনার মধ্যে শুক্রবার রাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে এনসিপি। সেখানে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কি পারবে না, এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা বা প্রস্তাব দেওয়ার এখতিয়ার সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো সংস্থার নেই।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদের এক পাশে ছিলেন হাসনাত, অন্য পাশে ছিলেন আখতার।
হাসনাতের বক্তব্য দলের বক্তব্য কি না, তা সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়নি। তবে তার এক দিন বাদেই নাসীরুদ্দীনের ভিন্ন বক্তব্য এল।