জামায়াতের কাছেই ভিড়ছে নাহিদরা, এনসিপিতে ‘গৃহদাহ’

জামায়াত ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান (ডানে) ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
জামায়াত ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান (ডানে) ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

চব্বিশের কোটাবিরোধী আন্দোলনের ‘আঁতুড়ঘর’ যে জামায়াতে ইসলামী তা আঁচ করা গিয়েছিল শুরুতেই। তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও এমন অভিযোগ তুলে সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক করেছিল। অবশ্য সেই ‘ক্রেডিট’ দিতে রাজি হচ্ছিল না সরকার ফেলে দিয়ে নতুন দল নিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামা জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।

বছর ঘুরতেই খোদ জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের যখন বললেন, নাহিদ ইসলামরা তাদেরই তৈরি, তখন উল্টো প্রতিবাদ এসেছিল নাহিদদের তরফে। ভোটের সমীকরণ শুরু হওয়ার পর এমনও বলতে শোনা গেছে- যদি এক ভোটও না মেলে তাও জামায়াতের মতো দলের সঙ্গে ভিড়বেন না তারা।

সেই নাহিদরাই শেষমেশ তাদের ‘পরিচিত ঘরে’ ফিরে যাচ্ছে বলে খবর চাওর হয়েছে। আন্দোলনে তাদেরই এক সময়ের সহযোদ্ধা আবদুল কাদের এক ফেইসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে জোট করতে যাচ্ছে এনসিপি।

এর আগে বিএনপির সঙ্গে দলটির আসন সমঝোতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের বোঝাপড়া হয়নি। 

চলতি মাসের শুরুতে এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনকে নিয়ে তিন দলের ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ করার ঘোষণা এসেছিল। তবে এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন জোটে ভেড়ার আভাস মিলেছে দলটির একাধিক সূত্র থেকে।

ওই জোট গঠনের প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন বলা হয়েছিল যে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে তৃতীয় একটি শক্তিশালী জোট হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট। এখন এনসিপি ও এবি পার্টি বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার যে চেষ্টা করছে, তাতে সংক্ষুব্ধ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতারা।

এ বিষয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া এনসিপির বিরুদ্ধে বোঝাপড়া লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন।

তিনি বলেছেন, বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে তৃতীয় একটি শক্তিশালী জোট করার বাসনা নিয়ে তারা ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু এনসিপি দুই দিকেই আলোচনা করে সেই বোঝাপড়া ইতিমধ্যে লঙ্ঘন করেছে।

আবদুল কাদের বৃহস্পতিবার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “তারুণ্যের রাজনীতির কবর রচিত হতে যাচ্ছে। এনসিপি অবশেষে জামায়াতের সঙ্গেই সরাসরি জোট বাঁধতেছে। সারা দেশে মানুষের, নেতাকর্মীদের আশাআকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে গুটিকয়েক নেতার স্বার্থ হাসিল করতেই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।”

“সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল এই জোটের ঘোষণা আসতে পারে। আর এর মধ্য দিয়ে কার্যত এনসিপি জামায়াতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।”

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির লোগো।

এদিকে, জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের খবর প্রকাশ্যে এলে দলটির ভেতরে প্রকাশ্য মতভেদ ও পদত্যাগের ঘটনা সামনে এসেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনার বিরোধিতা করে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক ইতোমধ্যে দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

আবদুল কাদেরের দাবি অনুযায়ী, এনসিপি জামায়াতের কাছে ৫০টি আসন চেয়েছিল, পরে দর–কষাকষির মাধ্যমে ৩০টি আসনে সমঝোতা হয়েছে।

তার ভাষ্য, এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এনসিপি বাকি আসনগুলোতে প্রার্থী দেবে না। এ ছাড়া নির্বাচনে জয়ী হলে নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রী এবং পরাজিত হলে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন—এমন আলোচনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

আবদুল কাদের লিখেছেন, এনসিপির এই সিদ্ধান্ত তরুণ রাজনীতির আশা–আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। তিনি একে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এ বিষয়ে এনসিপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে এনসিপির ভেতরে মতভেদ দেখা গিয়েছে। ইতোমধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।

পদত্যাগপত্রে মীর আরশাদুল হক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এনসিপি যাত্রা শুরু করেছিল, তা পূরণে দলটি ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, দল ভুল পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং সেই পথে তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

পদত্যাগের আগে তিনি এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ছাড়াও নির্বাহী কাউন্সিল, মিডিয়া সেল, শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বে ছিলেন।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মীর আরশাদুল হক বলেন, গণতন্ত্রে উত্তরণ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বকে তিনি কার্যকর মনে করেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads