এখন তারা সাংসদ হওয়ার দৌড়ে; হলফনামায় চমকে দেওয়া তথ্য

ছবিতে থাকা তরুণ নেতাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এনসিপিতে যোগ দিলেও প্রার্থী হননি; মাহফুজ আলম দলটির সঙ্গে না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। ছবি কোলাজ: দ্য সান ২৪।
ছবিতে থাকা তরুণ নেতাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এনসিপিতে যোগ দিলেও প্রার্থী হননি; মাহফুজ আলম দলটির সঙ্গে না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। ছবি কোলাজ: দ্য সান ২৪।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আগে তাদের কারোরই তেমন কোনো পরিচয় ছিল না। সরকারি চাকরিতে কোটার বিলুপ্তি চেয়ে ৩৬ দিনের আন্দোলনে তৎকালীন সরকার ফেলে দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রায় দেড় বছর ধরে। চাকরিতে ন্যায্য অধিকারের জন্য আন্দোলন করলেও এখন আর তারা চাকরি চাইছেন না; সবারই লক্ষ্য জনপ্রতিনিধি হওয়ার। খুলেছেন নতুন দল; প্রার্থী হয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে।

অভ্যুত্থানের তরুণ তুর্কিরা শুরুতে যে আশার আলো দেখিয়েছিলেন, নানা বিতর্কে জড়িয়ে সে আশা ক্রমশই ম্রিয়মান হতে বসেছে।

নির্বাচনী হলফনামায় এক সময়ের ‘বেকার যুবকদের’ আয়-ব্যয়ের চিত্র সামনে আসার পর তা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতুহল। দেখে নেওয়া যাক এনসিপির আলোচিত প্রার্থীদের কার কত সম্পদ, কিইবা তাদের আয়ের উৎস।

নাহিদ ইসলাম

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক তিনি। হলফনামা অনুযায়ী, নাহিদ ইসলামের নেই কোনো স্থাবর সম্পদ, তবে আছে ৩২ লাখ টাকার সম্পদ আর সাড়ে ৩ লাখ টাকার ব্যাংক ঋণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা ২৭ বছর বয়সী এই নেতা নিজেকে ‘পরামর্শক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বছরে আয় দেখিয়েছেন ১৬ লাখ টাকা।

২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে নাহিদ ১৩ লাখ টাকার বেশি আয়ের বিপরীতে আয়কর দিয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্নে দেখানো সম্পদের পরিমাণ ৩২ লাখ টাকার বেশি।

ঢাকা-১১ আসন থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে লড়ছেন জামায়াত নেতৃত্বধীন জোট থেকে।

হলফনামায় নাহিদের স্থায়ী ঠিকানা ঢাকা উত্তর সিটির বাড্ডার বড় বেরাইদ। থাকছেন দক্ষিণ সিটির গোড়ান এলাকার দক্ষিণ বনশ্রীতে।

নিজের ২৬ লাখ টাকা ও স্ত্রীর ১২ লাখ টাকার অর্জনকালীন ‘অস্থাবর সম্পদের’ কথা তুলে ধরলেও স্থাবর সম্পদের ঘরে লিখেছেন ‘প্রযোজ্য নয়’। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে, নিজের নগদ ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, স্ত্রীর আছে ২ লাখ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৩ টাকা।

নাহিদ এবং তার স্ত্রীর অলঙ্কার রয়েছে পৌনে ১৮ লাখ টাকার, যার মধ্যে স্ত্রীর রয়েছে ১০ লাখ টাকা সমমূল্যের গহনা। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ১ লাখ টাকার ও আসবাব রয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার।

ডাচ বাংলা ব্যাংকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে হলফনামায়।

আখতার হোসেন

সদস্যসচিব আখতার হোসেনের গাড়ি ও বাড়ি নেই। তবে কৃষি, ব্যবসা ও চাকরি থেকে বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা। হলফনামায় পেশা হিসেবে নিজেকে শিক্ষানবিশ আইনজীবী এবং স্ত্রীকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তার নগদ আছে ১৩ লাখ টাকা, আর স্ত্রী সানজিদা আক্তারের আছে ৪ লাখ। এ ছাড়া ব্যাংকে জমা আছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৬ টাকা আছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া নিজের ৭ লাখ ও স্ত্রীর আছে ১০ লাখ টাকার গহনা। নিজের অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ২৭ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর ১৬ লাখ টাকা।

স্থাবর সম্পদ বলতে রয়েছে ১৮ শতাংশ কৃষিজমি। যার বর্তমান মূল্য ২৩ হাজার টাকা।

রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আখতার হোসেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ

একই দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর ব্যাংকের নগদ জমাসহ ৫০ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

তবে তার কোনো জমিজমা ও গাড়ি নেই। সোনা রয়েছে ২৬ লাখ টাকার। তবে আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখিয়েছেন ৩১ লাখ ৬৭ হাজার ৬১৯ টাকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করা ২৭ বছর বয়সি হাসনাত নিজের পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘ব্যবসা’।

২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকা। আয়কর দিয়েছেন এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা।

এক সন্তানের জনক হাসনাতের বাবা-মা ও স্ত্রী তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ রয়েছে।

নিজ নামে বা বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানের নামে কোনো ব্যাংক ঋণ নেই। এক লাখ টাকার আসবাবপত্র ও ৬৫ হাজার টাকার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য রয়েছে তার।

কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) নির্বাচনি আসনে তিনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হয়েছেন।

সারজিস আলম

উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন; বার্ষিক আয় ৯ লাখ টাকা।

হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার মোট সম্পদ মূল্য পাঁচ লাখ টাকা; বাড়ি-গাড়ি কিছুই নেই। হাতে নগদ অর্থ রয়েছে তিন লাখ ১১ হাজার ১২৮ টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ এক লাখ টাকা। তার নামে দান করা কৃষি জমির পরিমাণ ১৬ দশমিক ৫০ শতক।

এ ছাড়া ব্যবসা থেকে বছরে তার আয় ৯ লাখ টাকা বলে উল্লেখ রয়েছে।

স্নাতকোত্তর পাস সারজিস আলমের নামে একটি মামলা রয়েছে, যা তদন্তাধীন। এ ছাড়া তার নামে কোন বন্ড, ঋণপত্র বা স্টক এক্সচেঞ্জভুক্ত শেয়ার নেই।

তার ব্যবহার্য আসবাবপত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর মূল্য দেখানো হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা।

২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে সারজিস আলম তার মোট আয় দেখিয়েছেন ২৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬২৮ টাকা। তিনি আয়কর পরিশোধ করেছেন ৫২ হাজার ৫০০ টাকা।

পঞ্চগড়-১ আসন থেকে ভোটে অংশ নিতে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন এনসিপির এই নেতা।

আব্দুল হান্নান মাসউদ

ব্যবসা করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ লাখ টাকা আয় করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ।

সবশেষ জমা দেওয়া আয়কর রিটার্নে ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৬ টাকার মোট সম্পদের হিসাব দাখিল করেছেন।

নোয়াখালী-৬ আসন থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি।

হলফনামায় ২৬ বছর বয়সী আবদুল হান্নান মাসউদ নিজেকে ডিজিল্যান্ড গ্লোবালের স্বত্বাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তার কাছে নগদ ৩৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭৫ টাকা, ব্যাংকে ২ হাজার ৫৫ টাকা, ১ লাখ টাকার ঋণপত্র, ৮ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার, ১ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী এবং ১ লাখ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। যেগুলোর অর্জনকালীন মূল্য ৪৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩০ টাকা হলেও বর্তমান মূল্য ৭৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩০ টাকা বলে উল্লেখ করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল হান্নান মাসউদ হলফনামায় নিজের সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি সমমান আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

মনোনয়নপত্র জমার সময় হলফনামায় প্রার্থীর ১০ ধরনের তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতোমধ্যে হলফনামা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রমাণিত হলে ভোটের পরেও সদস্য পদ বাতিলের বিধান রয়েছে আইনে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads