এখন কি তারেক রহমানের ওপর বাজি ধরছে ভারত

তারেক রহমানের প্রত্যার্তনকে স্বাগত জানিয়ে এমন বিলবোর্ডে সয়লাব এখন ঢাকা।
তারেক রহমানের প্রত্যার্তনকে স্বাগত জানিয়ে এমন বিলবোর্ডে সয়লাব এখন ঢাকা।

১৭ বছর পর খালেদা জিয়ার ছেলের বাংলাদেশে ফেরার গুরুত্ব কী, তা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এনডিটিভি। শুধু প্রকাশই নয়, মঙ্গলবার দুপুরে এটি ছিল তাদের ওয়েবসাইটের প্রধান সংবাদ।

এদিনই ভারতের আরেকটি সংবাদপত্র বিজনেস টুডে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম হল- ‘তারেক রহমানকে জানুন, বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ যিনি বদলে দিতে পারেন’।

গত কিছুদিন ধরেই ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোতে আলোচিত একটি নাম তারেক রহমান। আগামী ২৫ ডিসেম্বর তারেক লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফেরার আগে এখন তাকে নিয়ে চলছে এমন বন্দনা। খালেদা জিয়ার ছেলে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে নিয়ে আগে এমনটা দেখা যায়নি কখনও।

বরং তারেক রহমানকে নিয়ে ভারতের সরকারি মহলে অস্বস্তিই ছিল কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত বিষয়। তার শুরুটা হয়েছিল ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারেক যখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে উঠেছিলেন। তখন আসামের বিদ্রোহী সংগঠন উলফাকে মদদ, নয়া দিল্লির চক্ষুশূল দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন তারেক রহমানকে নিয়ে ভারতের মধ্যে নানা সন্দেহ তৈরি করেছিল, যা কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়। উইকিলিকসের ফাঁস হওয়ার তারবার্তায় তারেককে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বস্তির খবরও প্রকাশ পেয়েছিল।

এরপর বিভিন্ন সময় বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে গেলেও তারেক রহমানের নামের কারণেই তা বারবার আটকে গিয়েছিল বলে খবর পাওয়া যায়। আর এই সুবিধার পুরোটাই আওয়ামী লীগ নিয়েছে। তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে ভারতের নিরঙ্কুশ সমর্থনের বিষয়টি রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ পেয়েছে।

তবে গত বছর জুলাই অভ্যুত্থান সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। সেই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারা হওয়ার পর শেখ হাসিনাকেও দেশ ছাড়তে হয়েছে। ভারত তাকে আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ফিরে আসা এখনও অনিশ্চিত। নির্বাচনের তফসিল হলেও মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখায় আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগও নেই।

এরই মধ্যে ইউনূস সরকারের সঙ্গে নয়া দিল্লির সম্পর্ক নাজুক হয়ে তলানিতে ঠেকেছে। গত কয়েকদিনে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতকে পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা-দিল্লি এতটা শীতল সম্পর্ক নিকট অতীতে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়াটা নিশ্চিত অর্থেই ভারতের মাথাব্যথার কারণ। কেননা তাহলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহের ইন্ধন বেড়ে যেতে পারে বলেই মনে করে নয়া দিল্লি।

এতদিন আওয়ামী লীগ ছিল বলে ভারতের চিন্তা ছিল না। কিন্তু এখন প্রতিবেশী দেশটিতে জামায়াতে ইসলামীর মতো ‘পাকিস্তানপ্রেমী’ দল এবং তাদের সঙ্গে উগ্র ইসলামী দলগুলোর উত্থানের মধ্যে মধ্য ডানপন্থি বিএনপিকে কি নয়া দিল্লি কাছে টানবে?

এর উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে ভারতের সংবাদ মাধ্যমে তারেক বন্দনার একটা উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়।

এনডিটিভির প্রতিবেদনের শুরুতেই লেখা হয়েছে- “বাংলাদেশ যখন সহিংসতার এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে এবং উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দাপট বাড়ছে, তখন আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন।”

তারেক রহমানের ফেরাতে ভারতের সংবাদ মাধ্যমটি দেখছে এভাবে- “এমন এক সময়ে তার ফেরা ঘটছে, যখন দেশ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি এখনো এগিয়ে থাকা দল হিসেবে বিবেচিত হওয়ায়, দেশকে নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার অবস্থানে থাকতে পারেন তারেক রহমান। বড় কোনো অঘটন না ঘটলে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।”

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ফলে এখন থেকেই তারেকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইবে ভারত।

নয়া দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ এখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “অনেকে দাবি করছেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বেপরোয়া আচরণ করছে। সে তুলনায় তারেক রহমান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে দেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে এগোবে।”

দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ইউনূস সরকারের কোনো ম্যান্ডেট যে নেই, তা তারেক রহমানের সম্প্রতি তুলে ধরার কথাও বলা হয় প্রতিবেদনে।

নয়া দিল্লির ভয়ের কারণ হতে পারে, যদি নির্বাচনে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো, যারা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের সেরা সময় এখন কাটাচ্ছে, তারা যদি বিএনপিকে টেক্কা দিয়ে যায়। তাহলে বাংলাদেশ ‘আরেকটি পাকিস্তান’ হয়ে উঠবে।

তাই তারেক রহমান নয়া দিল্লির কাছে শ্রেয়তর হতে পারেন, কারণ তিনি দিল্লি, পিন্ডি উভয়ের কাছ থেকে সমান দূরত্ব রাখার কথা বলছেন।

দুর্নীতি, শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় সাজা হয়েছিল তারেক রহমানের। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল অবধি নানা দুর্নীতিতে তার নাম এসেছিল। এরপর ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০০৮ সালে জামিন মুক্তির পর সপরিবারে চলে যান লন্ডনে। তারপর আর ফেরেননি দেশে। 

গত বছর দেশে পটপরিবর্তনের পর তারেকের সব সাজার রায় বাতিল হলেও জনগণের মধ্যে তার ভাবমূর্তি বদলে গেছে, তা বলা যায় না।

তবে অভ্যুত্থানের পর নেতৃত্বশূন্য বাংলাদেশে উগ্র ইসলামি দলগুলোর উত্থানের এই পর্বেতারেক রহমানের ওপর ভরসা করতে চাইছে দেশের অনেকেই। এখন ভারতের সংবাদ মাধ্যমের আচরণে নয়া দিল্লির ক্ষেত্র্ওে একই ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads