এনসিপিতে গৃহদাহ নাকি অ্যান্টি আওয়ামী লীগ স্ট্যাবলিশমেন্টের দ্বন্দ্ব

একের পর এক বিতর্কের মুখে এনসিপি। ছবি কোলাজ: দ্য সান ২৪।
একের পর এক বিতর্কের মুখে এনসিপি। ছবি কোলাজ: দ্য সান ২৪।

বাংলাদেশে বর্তমানে ‘সরকার-অনুমোদিত’ দল ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যেসব টানাপড়েন বা মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে তার সবই প্রত্যাশিত। এটা মোটাদাগে অ্যান্টি আওয়ামী লীগ স্ট্যাবলিশমেন্টের ভেতরকার দ্বন্দ্ব। যে অংশটি মুখে জামায়াতবিরোধী কথাবার্তা বলছে তারাও এই স্ট্যাবলিশমেন্টের অংশ। মৌখিক বিরোধিতা যতই দেখা যাক, আদর্শিক বড় পেরিফেরিতে তারা অভিন্ন।

এ কারণে দ্বন্দ্বটি ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’, আরেকভাবে বলা যায় ‘পাতানো খেলা’। একতরফা একটি নির্বাচনের আগে মাঠে উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা। অ্যান্টি আওয়ামী লীগ স্ট্যাবলিশমেন্টের নির্ধারিত বাউন্ডারির মধ্যেই এরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে জড়াবে, কিন্তু বল সীমানার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলেই রেফারির বাঁশির শব্দে ঐক্যে সামিল হবে।

অ্যান্টি আওয়ামী লীগ স্ট্যাবলিশমেন্টে রাজনৈতিক দল যেমন আছে; তেমনি আছে সুশীল সমাজ, প্রভাবশালী মিডিয়া, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বহু সংগঠন, স্যোশাল ইনফ্লুয়েন্সার, এমনকি বিভিন্ন পরিচয় ধারণ করা সমাজের অনেক সুপরিচিত মুখ। তারা দৃশ্যত ‘নানা মত এবং পথ’-এর পরিচয়ের আড়ালে থাকলেও মৌলিক আদর্শে এককাট্টা। আর সেই চূড়ান্ত আদর্শ হলো ‘আওয়ামী লীগবিরোধিতা’। এই একটি ‘আদর্শ’ই সবাইকে পরস্পরের দৃঢ় সহযোগীতে পরিণত করেছে।

এখানে আলাদা করে জামায়াতকে নিশানা করার কিছু নেই, কারণ অ্যান্টি আওয়ামী লীগ অবস্থান সবাইকে শেষ পর্যন্ত যে মেরুতে পৌঁছে দেয় সেখানে নীতিগত প্রশ্নে বিশেষ কোনো প্রভেদ নেই। ফলে জামায়াত-এনসিপির প্রকাশ্য ঐক্যে যেসব তথাকথিত ‘সুশীল’ বা ‘প্রগতিশীল’ হৈ হৈ করে ওঠেন, তারা লোকদেখানো দায়িত্বপালন করেন।

এই দায়িত্বপালনও অ্যান্টি আওয়ামী লীগ স্ট্যাবলিশমেন্টকে মজবুত রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই। জামায়াত-ভীতির কারণে কেউ যাতে সামগ্রিক স্ট্যাবলিশমেন্টের প্রতি আগ্রহ না হারিয়ে ফেলে সেটি নিশ্চিত করা ‘হৈ হৈ’কারীদের একমাত্র লক্ষ্য।

বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের রাজনীতি বহুকাল আগে থেকেই ‘আওয়ামী লীগ’ এবং ‘অ্যান্টি আওয়ামী লীগ’-এ ভাগ হয়ে আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর বাইরে আর কোনো রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে পারেনি। বিভিন্ন নামে যেসব দল দেখা যায় তারা হয় ‘আওয়ামী লীগ’, নয়ত ‘অ্যান্টি আওয়ামী লীগ’। ভিন্ন ভিন্ন নামে চললেও মাদার অরগানাইজেশন দুটির বেশি নয়।

৫ আগস্টের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ‘অ্যান্টি আওয়ামী লীগ’ দলটির একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই পরিবর্তন ঘটানোর মূল নেতৃত্বে ছিল ‘জামায়াত’ নামের ব্যানারটি। রাজনীতির অ, আ, ক, খ যারা বোঝেন, যারা বাস্তবতার ছিঁটেফোঁটাও অনুধাবন করার সামর্থ্য রাখেন তাদের এই সত্যিটি সহজভাবে গ্রহণ করা উচিত।

অ্যান্টি আওয়ামী লীগার হিসেবে আপনার জামায়াতের বাইরে অন্য কোনো ব্যানারের প্রতি অনুরাগ থাকতে পারে; হতে পারে সেটি বিএনপি, হতে পারে সিপিবি, হতে পারে রূপান্তরিত উদীচী- কিন্তু জুলাইয়ের প্রকৃত ইতিহাস অস্বীকারের তো সুযোগ নেই।

ফেব্রুয়ারিতে পরিকল্পিত ‘অ্যান্টি আওয়ামী লীগ নির্বাচন’-এ জামায়াত জয় পাক বা না পাক- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস একদিন জুলাইয়ের ‘মূল নায়ক হিসেবে সাদিক কায়েমদেরই স্বীকার করে নেবে।

ফেব্রুয়ারিতে পরিকল্পিত ‘অ্যান্টি আওয়ামী লীগ নির্বাচন’-এ জামায়াত জয় পাক বা না পাক- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস একদিন জুলাইয়ের ‘মূল নায়ক হিসেবে সাদিক কায়েমদেরই স্বীকার করে নেবে।

ফলে তাসনীম জারা বা তাজনুভা জাবীনের মতো গুটিকয়েক ব্যক্তি, যারা জুলাইয়ের সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করার পর এখন এসে প্রকৃত সত্য মানতে অস্বীকার করছেন তাদের সামনে ঝরে পড়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অ্যান্টি আওয়ামী লীগ পার্টির অন্য কোনো শাখায় তাদের ঠাঁই পাওয়া অথবা রাজনীতিতে টিকে থাকার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

অনেকেই জারার মধ্যে ভবিষ্যতের ‘মালালা’ দেখছেন। সম্ভবত সেটাও ঘটবে না। একমাত্র আমজনতা পার্টির ইনভাইটেশন কাউকে ‘মালালা’ প্রজেক্টের সফল ক্যারেক্টারে পরিণত করতে সক্ষম হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া জারার নির্মাতারা আবারও একই মুখ সামনে রেখে বাজি ধরতে চাইবে না। আমাদের মতো দেশে যেখানে হাত বাড়ালেই নতুন নতুন মুখ হাজির করা সম্ভব, সেখানে পুরোনো মুখের নতুন করে হাজির হওয়ার সুযোগ শূন্য।

যাহোক উমামা ফাতেমা নামের ঝলকে ওঠা নেতা কি এখনও রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন? থাকলেও পাদপ্রদীপের আড়ালে হারিয়ে গেছেন। উমামাকে নিয়ে ২৮ জুলাই একটি পোস্টে লিখেছিলাম-

‘সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতির ইতিহাস প্রমাণ দেয় না, বিপুল মানুষের ভরসা হয়ে উমামা আর কখনো মূল ধারার নেতৃত্বে ফিরতে পারবেন। এক বছরে লাখ লাখ মানুষকে যারা কর্মহীন করেছেন, কোটি কোটি মানুষকে অনিরাপদ করেছেন- সামান্য চোখের পানি তাদের দায়হীন কর্মকাণ্ডের ন্যায্যতা তৈরি করতে অক্ষম।’

উমামা এরপর ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু ভরাডুবি হয়েছে। এরপর থেকে তাকে আর কোথাও দেখতে পাইনি। জারা-তাজনুভাদেরও সামনেও সম্ভবত একই ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

তা যেটাই হোক, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্ময় বা ক্ষোভের কিছু নেই। মূল নদীর দুটি শাখা নদ কিছুটা প্রবাহিত হয়ে আবারও একই ধারায় মিলিত হচ্ছে। এনসিপির বাইরে আরও কিছু শাখাও মিলিত হয়েছে। আর বাকিগুলো মিশছে বিএনপির ধারায়। আগে যখন আওয়ামী লীগ স্ট্যাবলিশমেন্ট ছিল তখন এর বিরোধী সব ধারার সমাবেশ ঘটেছিল বিএনপির ব্যানারে।

পরিবর্তিত দৃশ্যপটে ‘সরকার-অনুমোদিত বামপন্থি’দের মিলন আপাতত দৃশ্যমান না হলেও ‘অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ পার্টি’র বামন সদস্য হিসেবে তারা আছে দুর্গ-দ্বারের সদা জাগ্রত কনস্টেবলের দায়িত্বে।

সঞ্জয় দে: সাংবাদিক ও গবেষক

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads