ওসমান গনির জানাজা যার কথা স্মরণ করাল

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শনিবার ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শনিবার ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুরে বাসার সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার রাজীব হায়দারকে, যিনি পরিচিত ছিলেন ‘থাবা বাবা’ নামে। সেই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। সেসময় এই চিন্তকের জানাজায় ঢল নেমেছিল মানুষের। একযুগ পর আততায়ীর গুলিতে মাথায় বিদ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা ওসমান গনির মৃত্যও যেন সেই রাজীবের কথা স্মরণ করিয়ে দিল মানুষকে।

‘শরীফ ওসমান বিন হাদি’ বা ‘হাদি’ নামে পরিচিতি পাওয়া ইনকিলাব মঞ্চের এই সমন্বয়কের জানাজায় শনিবার অংশ নিয়েছিলেন অগণিত মানুষ।

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জড়ো হতে থাকেন মানুষ। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সংসদ ভবনের দুটি প্রবেশপথ খুলে দেওয়া হলে ভেতরে ঢুকতে শুরু করেন তারা। ফলে জানাজা শুরুর দেড় ঘণ্টা আগেই সংসদ ভবনের সামনের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ভিড়। জানাজায় শরিক হন অগণিত মানুষ। পরে বেলা ৪টার দিকে কবি নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলের পাশে সমাহিত করা হয় তাকে।

শরীফ ওসমান বিন হাদি নামে তিনি পরিচিতি পেলেও একাডেমিক নথি অনুযায়ী তার নাম ওসমান গনি, বাবার নাম আ. হাদি। সিঙ্গাপুর থেকে যে কফিনে করে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় সেখানেও ওসমান গনি নামটি-ই লেখা ছিল।

ওসমান গনির জানাজায় এই বিপুল মানুষের অংশগ্রহণের পর অনেকেই তা নিয়ে তুলনায় বসেছেন, সোশাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন- এমন জমায়েত নিকট অতীতে দেখা গিয়েছে কিনা?

কেউ আবার পাল্টা চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন, স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ব্লগার রাজীব হায়দারের কথা।

রাজীব হায়দারের ঘটনা নিয়ে ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনেও সেই জমায়েতের তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়।

‘শাহবাগে রাজীবের জন্য মানুষের ঢল’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়, “বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় শুক্রবার রাতে একজন ব্লগারকে হত্যার পর আজ শনিবার শাহবাগে হাজার হাজার আন্দোলনকারী তার নামাজে জানাজায় অংশ নিয়েছে।”

সেসময় রাজীবের গায়েবানা জানাজা হয়েছিল দেশের বিভিন্ন জেলায়। হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। মূলত ওই হত্যাকাণ্ড যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগের আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে।

একযুগ পর তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই ওসমান গনির ঘটনা ফিরিয়ে এনেছে রাজীব হায়দারের নাম।

এদিকে ওসমান গনির জানাজা শেষে একদল মানুষ সংসদে ঢোকার জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এ সময় নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনা সদস্যরা মাইকে সবাইকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাতে থাকেন।

বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

জানাজার আগে উপস্থিত মানুসের উদ্দেশে বক্তব্য দেন মুহাম্মদ ইউনূস ও ওসমান গনির ভাই আবু বকর সিদ্দিক। আবু বকর সিদ্দিক তার বক্তব্যে হাদির স্মৃতিচারণ করেন এবং তার জন্য দোয়া কামনা করেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ওসমান গনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।

সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তিনি মারা যান। তার মরদেহ শুক্রবার সিঙ্গাপুর থেকে দেশে এনে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছিল।

ওসমান গনির মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads