ঈদের মাঝে রাষ্ট্রপতি কোথায়?

২০২৪ সালে রোজার ঈদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নামাজ পড়েছিলেন জাতীয় ঈদগায়।
২০২৪ সালে রোজার ঈদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নামাজ পড়েছিলেন জাতীয় ঈদগায়।

দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কি জানাননি? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর চাঁদরাতেও জানা যাচ্ছে না।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর চাপে থাকা রাষ্ট্রপ্রধান সাহাবুদ্দিনের ঈদে জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কোনো বার্তার খবর বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে নেই। ঈদের দিন তার কর্মসূচি কী, তাও জানা যাচ্ছে না।

সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসে রাষ্ট্রপতির কোনো খবর নেই। তার বাণী কিংবা কর্মসূচির কোনো খবর দেওয়া হয়নি তথ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া তথ্য বিবরণীতেও।

শুধু এটুকু জানা যাচ্ছে যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় ঈদগায় ঈদের নামাজ পড়তে যাচ্ছেন না। একথাও জানা গেছে ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হাসানের কল্যাণে।

অথচ সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি বরাবরই জাতীয় ঈদগায় ঈদের নামাজ পড়েন। বঙ্গভবনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের কর্মসূচিও থাকে। দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঈদের বাণীও দেন তিনি।

কোভিড মহামারির সময় শুধু তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে ঈদের নামাজ পড়েছিলেন। কারণ তখন দুই বছর জাতীয় ঈদগায় জামাত হয়নি।

২০২৩ সালে ঈদ জামাত জাতীয় ঈদগায় ফিরলে আবদুল হামিদ তাতে অংশ নেন। মো. শাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পরের ঈদগুলোতে জাতীয় ঈদগায়ই ঈদের নামাজ পড়ে আসছিলেন।

ঈদুল ফিতরের দিন নির্ধারণে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভার পর ধর্ম উপদেষ্টা খালিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সোমবার ঈদের নামাজ পড়বেন বঙ্গভবনের মসজিদে।

কী কারণে তিনি জাতীয় ঈদগায় যাচ্ছেন না, সে বিষয়ে কিছু বলেননি ধর্ম উপদেষ্টা। এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস জাতীয় ঈদগায় নামাজ পড়বেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর দিয়ে গত বছর ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। 

ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ভিডিও বার্তা তার প্রেস উইং প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে বাসস সংবাদ প্রতিবেদনও করেছে।

তথ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিবরণীতে প্রধান উপদেষ্টার বাণী এসেছে। সেই সঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা, সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা, পরিবেশ উপদেষ্টার ঈদের শুভেচ্ছা বার্তার খবরও এসেছে।

কিন্তু রাষ্ট্রপতির কোনো ঈদের বাণী আসেনি। অথচ আগের সপ্তাহে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষেও রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বাণী সরবরাহ করা হয়েছিল তথ্য অধিদপ্তর থেকে।

এবার কেন রাষ্ট্রপতির বাণী আসেনি, সে বিষয়ে তথ্য অধিদপ্তরের কোনো বক্তব্য দ্য সান ২৪ জানতে পারেনি।

আবার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস গত বছরও ঈদুল ফিতরের আগের দিন রাষ্ট্রপতির বাণী প্রকাশ করেছিল, রাষ্ট্রপতির ঈদের দিনের কর্মসূচি নিয়েও প্রতিবেদন করেছিল। তার ঈদগাহে জামাতে অংশ নেওয়ার খবরও প্রকাশ করেছিল।

এবার রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে তাদের কাছ থেকে কোনো খবরই পাওয়া যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না, সেই বিষয়েও কোনো তথ্য জানা যায়নি।

রাষ্ট্রপতির কর্মসূচির বিষয়ে তার প্রেস সচিব সরওয়ার আলমের কোনো বক্তব্যও কোথাও পাওয়া যায়নি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরওয়ার আলম রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবের দায়িত্ব পান।

খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার উপ প্রেস সচিব ছিলেন সরওয়ার। পরে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ফখরুদ্দীন আহমদেরও উপ প্রেস সচিব ছিলেন।

সাবেক বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

তার এক বছর পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে সাহাবুদ্দিনও পড়েন চাপে।

গত বছরের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন।

এরপর সংসদ ভেঙে দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন একটি সরকারকে শপথ পড়ান তিনি। কারাবন্দি বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার দণ্ড মওকুফ করে তাকে মুক্তিও দেন তিনি।

৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন রাষ্ট্রপতির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-েউজ-জামানসহ তিন বাহিনী প্রধান। ভাষণ পড়ার সময় মো. সাহাবুদ্দিনের শরীরী ভাষায় বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি স্বস্তিতে নেই।

শেখ হাসিনাকে উৎখাতের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণের দাবি ওঠে। কয়েকটি সংগঠন সেই দাবিতে কয়েকদিন বঙ্গভবনের সামনে কর্মসূচিও পালন করেছিল।

তবে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতি অপসারণের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এই যাত্রায় বঙ্গভবনে টিকে যান মো. সাহাবুদ্দিন।

টিকে গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তার গুরুত্ব যে কম, তা স্পষ্ট। প্রধান উপদেষ্টা বিভিন্ন দেশ সফর থেকে ফিরলেও রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন না।

এই সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসাবে সাহাবুদ্দির কর্মসূচিও অনেক সীমিত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ জাতীয় দিবসে স্মৃতিসৌধে গত ২৬ মার্চ গিয়েছিলেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি পদে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। সেই হিসাবে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তার এই দায়িত্ব পালনের কথা। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে তিনি ততদিন পর্যন্ত টিকবেন কি না, তা এখন অনিশ্চিত।

আরও পড়ুন