আওয়ামী লীগের ঘোষিত লকডাউন কর্মসূচিকে ঘিরে ১৩ নভেম্বর সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। মাঠে ছিলেন পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা। উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ বা বিশৃঙ্খলা এড়ানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সহিংসতা অনেকাংশে এড়ানো গেলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই প্রয়াস অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমারেখা অতিক্রম করেছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল সাধারণ নাগরিকদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা। বহু স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মানুষজনের ফোন খুলে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও এসএমএস পর্যালোচনা করেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। এটি কেবল একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিনষ্ট করে না, বরং সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেরও পরিপন্থী। নিরাপত্তার অজুহাতে এমন পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থাকে দুর্বল করে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও একই ধরণের অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার প্রবণতা দেখা গেছে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং বিএনপি কর্মীদের সাধারণ মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখে হয়রানি করতে দেখা গেছে। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নিরীহ নাগরিক, এমনকি নারী ও শিশুরাও রেহাই পাননি। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বলি হচ্ছে সাধারণ জনগণ।

দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের দায়িত্বও সীমাবদ্ধ আইনের মধ্যে থাকা উচিত। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটে, তবে সেই নিরাপত্তা টেকসই হতে পারে না। গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে নয় বরং নাগরিকের মর্যাদা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নিশ্চয়তার মাধ্যমেই সুসংহত হয়।
১৩ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার একে অপরের পরিপূরক, পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তাই ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যেন মানবাধিকার ও গোপনীয়তা রক্ষা লঙ্ঘন বা সীমা অতিক্রম না করে, সে বিষয়ে প্রশাসন ও সরকারকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করতে হবে।



