রিপন মিয়া এখন দ্বিতীয় হিরো আলম

Ripon Mia

অসচ্ছল পরিবারের সন্তান রিপন মিয়া। তৃতীয় শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। ২০১৬ সালে তার মনে বয়ে যায় ঝড়। কিশোর বয়সের প্রেমের সস্পর্ক ভেঙে যায়। আড়ালে চোখের পানি মুছেছে, কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারেন নি। তিনি বুঝলেন কাঠ মিস্ত্রির জীবনে প্রেম ‘অনেক দূরে’ । খুব বেদনায় কাটছিল সেসময়ের দিনগুলো।

মনের কষ্ট দূর করতে মানুষ কতো কি না করে। কিন্তু রিপন কিছুই ভেবে পায়না। যতোক্ষণ কাঠ মিস্ত্রির কাজ করতেন, ততক্ষণ সেসব ভুলে থাকতেন। কিন্তু এরপর কষ্টের অন্ধকার যেন তার মনজুড়ে জেঁকে বসতো।

কষ্ট ভুলতে ক্যামেরা সামনে এসে কথা বলতে শুরু করেন রিপন। সেই ভিডিও দেখে কিছুটা হলেও মনটা ভালো হয় রিপন। এরপর রিপন বেছে নেন ভিডিও বানানো।

রিপন মিয়ার ভিডিওগুলো মূলত ছন্দে ছন্দে বলা এক-দুই লাইনের কবিতা, যদিও এর আগে কখনও কবিতা চর্চা করেননি তিনি।

প্রথম ভিডিওটিতে তিনি তার প্রিয়জনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বন্ধু তিনি একা হলে আমায় দিও ডাক, তোমার সঙ্গে গল্প করব আমি সারারাত।”

ভিডিওটি শেষ হয়- তার স্বভাবসুলভ হাসি এবং বিখ্যাত ক্যাচ ফ্রেজ ‘আই লাভ ইউ’ বলে।

রিপনের এই ছোট্ট ছন্দময় বাক্যটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, উৎসাহ পেয়ে আরও এমন ভিডিও বানাতে শুরু করেন তিনি।

সেসময়ের ভিডিওতে রিপন বলতেন, “হাই ফ্রেন্ডস, আমি রিপন ভিডিও”, “বন্ধু তুমি পাখি হলে, আমি হব নীড়”, “তোমার আমার প্রেম দেখতে লেগে যাবে ভিড়” ইত্যাদি।

নেত্রকোনার রিপন মিয়া, পেশায় কাঠমিস্ত্রি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এভাবে ভিডিও বানিয়ে সোশাল মিডিয়ায় প্রচার করতে থাকেন। কিন্তু একদিন একটি ভিডিও জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় রিপনের।

গত বছরে অটোপাশের দাবি নিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করছিলেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও। তাদের উদ্দেশ্যে ফেসবুকে একটি ভিডিও ছাড়েন রিপন মিয়া।

ভিডিওতে বলেন, “যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিতে চাইতাছো না, তারা আমার কাছে চলে আসো কাঠমিস্ত্রির কাম হিকাইদিতাম, দৈনিক ৫০০ টাকা রোজ পাইবা, নেট এন্ড ক্লিয়ার, হাহাহা…. এটাই বাস্তব।”

শিক্ষার্থীদের সেই সময়ের অযৌক্তিক এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রিপন মিয়ার কথা যথেষ্ট যুক্তিসংগত মনে হয়েছিল দর্শকদের। হু হু করে ডিডিওর দর্শক বাড়ে। সেই সঙ্গে রিপন মিয়ার ফলোয়ার বেড়ে যায়।

গত কয়েক মাসে রিপন মিয়া তার বাস্তবধর্মী ও জীবনমুখী কথাবার্তার কারণে নেটিজেনদের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছেন।

কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে করতে গ্রীষ্মের তপ্ত রোদে ঘাম ঝরানো, উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি, সাইকেল চালিয়ে কাজে যাওয়া, নিজের রান্না করা খাবার পরিবেশন কিংবা মজার ছলে ইংরেজি সংবাদপত্র পড়ার ভান করার মতো সাধারণ দৃশ্যগুলোই তার ভিডিওর মূল বিষয়বস্তু।

কোনো জাঁকজমক কিংবা ‘স্পেশাল অ্যাফেক্ট’ নেই তার ভিডিও ও রিলসে। কিন্তু তারপরও এ সরল জীবনচিত্র দর্শকদের মন জয় করেছে। গত দুই মাসে তার ভিডিওগুলো ২ কোটি বারেরও বেশি দেখা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে তার এক মিলিয়নেরও বেশি অনুসারী।

কোটি কোটি ভিউ, মিলিয়ন ফলোয়ার থাকার পরও সোশাল মিডিয়া থেকে সেভাবে অর্থ উপার্জন করতে পারেন নি রিমন মিয়া। একের পর এক হ্যাক হয়েছে তার অনেকগুলো চ্যানেলে।

রিমন মিয়া বলেন, “লোকেরা আমার কনটেন্ট দিয়ে প্রচুর টাকা বানিয়েছে, কিন্তু আমি এক টাকাও উপার্জন করতে পারলাম না। আমি এখনও একটি জরাজীর্ণ বাড়িতেই থাকি, বাড়ির ভেতর দিয়ে কুকুর হাঁটাচলা করে।”

অনেকবার ঠকে যাওয়া পর একজন মিডিয়া ম্যানেজারের সাথে পরিচয় হয় রিপন মিয়ার, যিনি তাকে আবার নতুন করে ঘুরে দাড়াতে সাহায্য করছেন।

দুজন মিলে এখন পঞ্চাশ-পঞ্চাশ ভাগে লাভ ভাগাভাগি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো পরিচালনা করছেন।

নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া ওই ম্যানেজার বলেন, “রিপন ভাই খুবই সহজ সরল মানুষ। মানুষ তার কাছে এসেছিল, কথা বলেছিল, আর কোনোভাবে তার পেজগুলো হ্যাক করে ফেলেছিল, যেগুলোতে ছিল মিলিয়নেরও বেশি অনুসারী।”

রিপন মিয়া এখন বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন। ফেসবুকে তার বর্তমানে পেজ দুটি—’খাদক রিপন’ এবং ‘রিপন মিয়া’। ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামে তার এক মিলিয়নেরও বেশি অনুসারী হয়েছে।

কিছুদিন হলো, রিপন ও তার ম্যানেজার চ্যানেলগুলো থেকে আয় করা শুরু করতে পেরেছেন।

খ্যাতি এবং কিছু টাকা আসলেও, রিপন এখনও তার গ্রামীণ কাঠমিস্ত্রির জীবনকেই বেশি উপভোগ করেন। তার ভাষ্যে, আমরা গ্রামের মানুষ, কাজ ছাড়া থাকতে পারি না।

রিপন মিয়া এখন পুরোদমে কাঠমিস্ত্রি এবং সেই কাজের ভিডিওই তৈরি করেন। তিনি এখন যেমন আছেন, যেভাবে কাজ করেন, খাওয়া-দাওয়া করেন, ঘুরেন- এসব নিয়ে ভিডিও বানান।

এক ফেসবুক রিল ভিডিওতে রিপন বলেন, “আমি গরমে কাজ করছি। যারা পড়াশোনা করেছে কিন্তু চাকরি পায় না, তারা আমার সাথে যোগাযোগ করুক। আমি তাদের ব্যবসা শিখিয়ে দেব, আর তারা দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা উপার্জন করতে পারবে।”

ভিডিও শেষ করেন তার পরিচিত হাসি আর ‘এটাই বাস্তব’ বলে।

আরেকটি ভিডিওতে তাকে গরমে রান্না করতে দেখা যায়। আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, “আমাদের মা-বোনেরা এমন কষ্টে রান্না করেন, কিন্তু আমরা তাদের কষ্ট বুঝতে চাই না। একটি ভিডিওতে তাকে চশমা পরে সাইকেল চালিয়ে যৌতুক বিরোধী ক্যাম্পেইন চালাতেও দেখা যায়।”

গত বছরের জুন মাসে পিএসসি ড্রাইভার আবেদ আলীর অবৈধ সম্পদের খবর দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি করে। রিপন এনিয়ে একটি ভিডিওতে বলেন, “আবেদ আলীর মতো আমিও ড্রাইভার হতে চাই, কিন্তু তোমার মনের, আই লাভ ইউ।”

যখন এক ইসলামি বক্তা ‘মেসেজ ড্রপ’ শব্দটি অদ্ভুতভাবে ব্যবহার করে ভাইরাল হন, রিপন তাকে অনুসরণ করে তার চিরচেনা হাসি দিয়ে বলেন, “সকাল সকাল তোমাকে একটা মেসেজ ড্রপ করতে চাই— আই লাভ ইউ।”

পুরোনো কিছু ভিডিওতে কিছু আপত্তিকর বা অশালীন শব্দ চোখে পড়তে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে রিপন মিয়া নিজেকে পরিবর্তন করেছেন এবং আরও পরিণত হয়েছেন, যা তাকে আরও বেশি দর্শকের মনোযোগ এনে দিয়েছে।

আরও পড়ুন