বাংলাদেশে ‘মব’ সংস্কৃতি, কী এদের পরিচয়

প্রতীকী ছবি। এআই জেনারেটেড।
প্রতীকী ছবি। এআই জেনারেটেড।

আমাদের দেশে ‘মব’ শব্দটা গত এক বছর ধরে গণপরিচিতি পেলেও শিক্ষিত মহলে এর অর্থ জানে না এমন লোক তেমন নেই। গল্প উপন্যাস তথা সাহিত্যে যারা নিয়মিত পদচারণা করেন তারা এই শব্দের সঙ্গে অতি পরিচিত।

মূল ল্যাটিন শব্দবন্ধ ‘মোবাইল ভালগাস’ থেকে আসা এই শব্দকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হলেও মূল অর্থ এক – তা হলো ‘উশৃঙ্খল জনতা’। ইলাস্ট্রেটেড অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ব্রিটেনে এর অর্থ লেখা হয়েছে (এ)- ‘অ্যা গ্যাঙ্গ; অ্যান অ্যাসোসিয়েটেড গ্রুপ অব পারসনস; (বি)- দি মাফিয়া অর অ্যা সিমিলার অর্গানাইজেশন।’ অস্ট্রেলিয়ায় এর অর্থ বলা হয় ‘অ্যা ফ্লক অর হার্ড’। এখানে তাদের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, ‘ক্রাউড রাউন্ড ইন অর্ডার টু অ্যাটাক অর অ্যডমায়ার।

এসব শব্দবন্ধ ও ব্যাখা বিশ্লেষণ করলে এটা পরিষ্কার যে সংঘবদ্ধ উশৃঙ্খল জনতাকে মব বলা হয়েছে যাদের কোনো সামজিক পরিচয় নেই – তাৎক্ষণিকভাবে গড়ে ওঠা একদল লোকের সংঘ, যেটা স্থায়ী নয়; যাদের কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা নেই।  

কিন্তু আমাদের দেশে – বাংলাদেশ – এই শব্দ ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছে, সমাজে ব্যাপক ভীতির সৃষ্টি করেছে। এর পেছনে বিশেষ একটি কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন তখন যাকে তাকে একদল লোক আক্রমণ করে তুলে দিচ্ছে পুলিশের হাতে, এই পরিচয়ে যে তারা ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের দোসর। এখানে মব শব্দের একটি বিশেষত্ব আছে – সেটি হচ্ছে এরা একটি পরিচয় ব্যবহার করছে। জুলাই যোদ্ধা। যারা ২০২৪ সালে জুলাই-অগাস্টে কোটাবিরোধী আন্দোলন করেছেন – এবং যে আন্দোলনের পরিণতি হয়েছিল সরকার পতন – তারা জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিচ্ছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে এই আন্দোলনে নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের বলা হয়েছে সমন্বয়ক। প্রত্যেক জায়গায় তারা কয়েকজন করে থাকতেন। এমনকি একই শহরে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক আন্দোলনকারীদের অনেক সমন্বয়ক থাকতেন। তবে তাদের কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যারা ছিলেন পরবর্তীতে তাদের কয়েকজন অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেন কয়েকজন নতুন দল গঠন করেছেন, যার নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি বা ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি – এনসিপি। এনসিপি একটি সাংগঠনিক কাঠামোবদ্ধ দল হলেও যেখানে ‘মব হামলা’ হচ্ছে সেখানে তারা এনসিপির পরিচয় ব্যবহার করছে না; বলছে জুলাই যোদ্ধা। আবার এসব মবের দায়িত্বও এনসিপি নিচ্ছে না। সরকার এসব মবের বিরুদ্ধে কখনও কখনও কথা বললেও নির্লজ্জভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছে। কোনো মব ঘটনার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। 

এসবের স্পষ্ট উদাহরণ হলো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে ঘেরাও করে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের সব বিচারপতিদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করা। এই ‘মবে’ সরকারের প্রশ্রয় না থাকলে কখনও বিচারপতিদের এভাবে পদত্যাগ করতে হতো না। ওইদিন সুপ্রিম কোর্ট হাজারখানেক যুবকের সমাবেশ হয়েছিল। সেখানে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতিও ছিল। একইভাবে হাই কোর্টের ১২ বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাদের কয়েকজনকে অপসারণ, কয়েকজনকে বেঞ্চ না দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়; এবং তাদের কয়েকজন পদত্যাগ করেন। আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে অসদাচরণের অভিযোগের শুনানি চলছে।

মব সৃষ্টি করে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদাকে মারধর করে জুতার মালা পরানো হয়। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

এভাবে মব হামলার শত শত ঘটনা দেশব্যাপী ঘটেছে। কোথাও শিক্ষক, কোথাও চাকরিজীবী – কেউ বাদ নেই। কোথাও হিন্দু পরিবারের সম্পদ লুট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়।

সর্বশেষ যে হামলাটা হলো ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সেখানে অনুষ্ঠান চলছিল ‘মঞ্চ ৭১’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের। বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫, তারা ডিআরইউর শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেন।

এ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয় করছেন গণফোরাম নেতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (বীর প্রতীক) ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল গণফোরামের সাবেক সভাপতি ড. কামাল হোসেনের। তবে তিনি আসার আগেই সেখানে একদল ব্যক্তি – মব – হট্টগোল শুরু করে। হামলায় আহতও হন অনুষ্ঠানে আসা কয়েকজন।

‘মব হামলার’ শিকার হওয়ার পর পুলিশ হেফাজতে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেওয়া এই ১৪ জনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে শাহবাগ থানায় মামলা করার তথ্য দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।

রাতে তিনি অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা করছি। এদের মধ্যে নয়জন শাহবাগ থানায় রয়েছেন। তাদের মিন্টো রোডে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে।”

এদিন দুপুরে ডিআরইউর শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ‘মঞ্চ ৭১’।

দুপুরের ওই ঘটনার পর ডিআরইউ থেকে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মনজুরুল ইসলাম পান্নাসহ বেশ কয়েকজনকে পুলিশের গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

অনুষ্ঠানে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা বলেন, “আমি এখানে প্রোগ্রামে এসেছি। দল মতের হিসাবে নয়, এখানে সব মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকা হয়েছে; তাই এসেছি। আমরা প্রোগ্রাম শুরু করেছিলাম। লতিফ সিদ্দিকী সাহেব এসেছেন। কামাল হোসেন সাহেব আসেননি। ২০/২৫ জন ছেলে এসে হট্টগোল করে। আমাদের ঘিরে ফেলে।”

হামলার মুখে অতিথিসহ অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ জানিয়েছিল, মব হামলার মুখে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

রাতে ওই আলোচনা সভা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে প্রতিবাদলিপি দিয়েছে ঢাকার প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিআরইউ।

এতে বলা হয়েছে, “ডিআরইউ’র একটি গোলটেবিল বৈঠকে বৃহস্পতিবার কতিপয় বহিরাগতদের হামলাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একদল ব্যক্তি নিজেদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন), সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানসহ কয়েকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে।

“এসময় তাদেরকে নিবৃত্ত করতে গেলে ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মান্নান মারুফ, সদস্য আসিফ শওকত কল্লোল, সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদসহ কয়েকজনকে নাজেহাল করা হয়।”

সংগঠনের সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

এদিকে ডিআরইউ এর ঘটনার পর সাবেক মন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক লতিফ সিদ্দিকীর টাঙ্গাইলের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের একটি ভিডিও বিকালের পর থেকে ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

এদিন সন্ধ্যার পর থেকে ভিডিওটি ভাইরাল হলে দেশ জুড়ে আলোচনা সৃষ্টি হলে পুলিশ ও স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, আগুন দেওয়ার ঘটনাটি গুজব।

ট্রাইলের কালিহাতী থানা সংলগ্ন লতিফ সিদ্দিকীর গ্রামের বাড়ির নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করার তথ্য দিয়ে কালিহাতী থানার ওসি জাকির হোসেন বলেন, আগুনের ঘটনাটি গুজব।

এই হামলার যারা শিকার তাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা হামলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি, তাদের কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। সচেতন যে-কোনো ব্যক্তি জানে, দেশের কোনো আইনেই কেউ কাউকে হামলা করতে পারে না। এখানে দেশের বিশিষ্টজনেরা একটি গোলটেবিলে অংশ নিয়েছিলেন। তারা মক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কথা বলার পর এ হামলার ঘটনা ঘটে।

আমরা দেশের মানুষ কি ধরে নেব যে জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে একদল লোক জড়ো হয়ে যে কাউকে ধরে পুলিশে দেবে, আর পুলিশ তাদের সন্ত্রাসবিরোধী মামলা দিয়ে জেলে পুরবে? মানে সরকার কি মব চালাচ্ছে? তাই যদি না হয় তবে মব হামলার পর কেন বিচারপতি অপসারণ হয়, শিক্ষকের চাকরি যায়, লতিফ সিদ্দিকীরা গ্রেপ্তার হন? এরপরই লতিফ সিদ্দিকীর বাড়িতে নিরাপত্তা দেওয়া কি সরকারের স্ববিরোধী আচরণ নয়?

দেশের মানুষ কি জানতে পারবে না এই জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে মব হামলা চালানো যুবকরা কারা? কী তাদের দলীয় বা সামাজিক পরিচয়? কী তাদের উদ্দেশ্য? মব তো কোনো স্বীকৃত গোষ্ঠী নয়। তাহলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এর জন্য পুলিশকে কি কোনো জবাবদিহি করতে হবে না? আমরা কি একটি উশৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর হাতের ক্রীড়নক হয়ে গেলাম? জবাব চাওয়ার জায়গাও যে আজ নেই বলে মনে হচ্ছে।

দেবাশীষ দেব: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাংবাদিক       

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads