একটানা ছাব্বিশ মিনিট ধরে কথা বললেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, যাকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি হিসেবেই দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
জুলাই আন্দোলন থেকে শুরু করে আসন্ন নির্বাচনের প্রসঙ্গ যেমন টেনেছেন, তুলে ধরেছেন ব্যাখ্যা; তেমনি দেশের মানুষকে ইসলামী উগ্রপন্থা ও জামায়াত নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি।
ইংরেজিতে দেওয়া বক্তৃতার শেষে এসে ধরা গলায় তিনি বলেন, “এটাই শেষ সুযোগ কিছু করার, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে একটি প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে বাধা দেওয়ার। ইসলামবাদ, উগ্র ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদকে আগামী অন্তত পাঁচ থেকে দশ বছর, সম্ভব হলে তারও বেশি সময়ের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিধর হয়ে ওঠা থেকে রুখে দেওয়ার এটাই শেষ সুযোগ। সত্যিকার অর্থেই, এটাই শেষ সুযোগ।”
বিজেপি প্রভাবিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ ‘খোলা হাওয়া’ একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে সত্যজিৎ রায় মিলনায়তনে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলাদেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর লেখা ওই বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন সজীব ওয়াজেদ জয়।
ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে বক্তব্যের শুরুতেই জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন হাসিনাপুত্র।
সজীব ওয়াজেদ জয় জানান, ওই আন্দোলন সামাল দিতে না পারার ক্ষেত্রে তাদের সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যার সুযোগ নিয়েছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিশে থাকা ইসলামপন্থী ও বিরোধীরা।
“বাংলাদেশে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তা মূলত ছাত্র আন্দোলন ছিল, কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। এই দাবিগুলো অযৌক্তিক ছিল না, বরং সেগুলো ছিল বৈধ দাবি। পুরোনো কোটা ব্যবস্থা সত্যিই অনেকটাই সেকেলে ছিল এবং যুক্তিসংগত ছিল না।
“তবে একটি বিষয় বেশিরভাগ মানুষ জানে না, আমাদের সরকার এই কোটাগুলো বহু বছর আগেই বাতিল করেছিল। পরে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের করা একটি মামলার পর আদালত সেই কোটা পুনর্বহাল করে। সরকারের ব্যর্থতা ছিল যোগাযোগ ও বার্তা দেওয়ার জায়গায়। আমরা এ বিষয়ে কিছুই স্পষ্ট করে বলিনি, পুরো বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। এর ফলে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়। এটি ছিল আমাদের প্রথম বড় ব্যর্থতা।”
এই সুযোগে বিরোধী দল ও ইসলামপন্থীরা সহিংসতা চালায় বলে অভিযোগ করেন জয়।
তিনি বলেন, “সশস্ত্র জঙ্গিরা পুলিশ স্টেশনে হামলা শুরু করে। আদালতে উপস্থাপিত আমার মায়ের অডিও রেকর্ডিং শুনলে দেখা যায়, সেখানে সশস্ত্র জঙ্গিদের পুলিশ স্টেশনে হামলার বিষয়ে আলোচনা আছে। সেসময় পরিস্থিতি পুরোপুরি সহিংস হয়ে ওঠে। নিরীহ আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষ আহত হন। সব ধরনের মৃত্যু দুঃখজনক। আমাদের সরকার কোনো মৃত্যুই চায়নি, কিন্তু তা ঘটেছে। সহিংসতার সূচনা করেছে জঙ্গিরা, সরকার নয়।”
‘চরমপন্থীরা দেশ চালাচ্ছে’
মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “গত দেড় বছরে আমরা দেখেছি, কোনো গণম্যান্ডেট ছাড়াই একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা ধরে রেখেছে। শুধু তাই নয়, এই সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রথম যে কাজগুলো করেছে, তার একটি হলো, সব দণ্ডপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীকে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে। এরা ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলা, ব্লগার হত্যা এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক কর্মীকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল।
“আওয়ামী লীগ সরকার তাদের গ্রেপ্তার করেছিল, বিচার করে সাজা দিয়েছিল। কিন্তু এই সরকার তাদের ছেড়ে দিয়েছে। কেন? কারণ এই সরকার ইসলামপন্থী ও চরমপন্থীদের সমর্থনে দাঁড়িয়ে আছে,” যোগ করেন তিনি।
সাধারণ আন্দোলনকারীরা ইসলামপন্থী বা জঙ্গি ছিল না বলেও নিজের অভিমত জানান সজীব ওয়াজেদ জয়।
তিনি বলেন, ”সাধারণ প্রতিবাদকারীরা ইসলামপন্থী বা জঙ্গি ছিল না। কিন্তু ইসলামপন্থী ও জঙ্গিরা আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা বাংলাদেশে টেলিভিশন ও ফেসবুকে প্রকাশ্যে বলেছে—যদি তারা সহিংসতা না করত, পুলিশ হত্যা না করত, ভবন জ্বালিয়ে না দিত, তাহলে তথাকথিত বিপ্লব সফল হতো না। তারা নিজেরাই এসবের কৃতিত্ব নিয়েছে। ফলে ইউনুস ও বর্তমান সরকার ইসলামপন্থীদের কাছে ঋণী হয়ে পড়েছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বর্তমান সরকার কার্যত একটি ইসলামপন্থী সরকার।”
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সহিংসতার চিত্র বর্ণনা করে জয় বলেন, “সহিংসতার দায় তারা ‘মব জাস্টিস’-এর ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। ইউনূসের মুখপাত্র পর্যন্ত এসব গোষ্ঠীকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সরকার নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মানুষকে মারধর ও হত্যা করতে এসব গোষ্ঠী ব্যবহার করছে। বিচারকদের বলা হচ্ছে- আমাদের মতো রায় না দিলে তোমাদের বাড়ি ঘেরাও করা হবে। মিডিয়ার কেউ সমালোচনা করলে তাদের মারধর করা হবে, অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হবে। ২০২৪ সালের আগস্টে একাধিক প্রগতিশীল টিভি চ্যানেল ও সংবাদমাধ্যমে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশের দুটি বৃহত্তম দৈনিক- প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসেও আগুন দেওয়া হয়েছে।”
‘দায় শুধু আমাদের নয়’
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, এখন বলা হচ্ছে নির্বাচন হচ্ছে, আর অনেক মানুষ মনে করছে, নির্বাচন হলে হয়তো এই সরকার থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু বাস্তবতা কী? বাস্তবতা হলো- তারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এই অজুহাতে যে আওয়ামী লীগ ছাত্র হত্যার জন্য দায়ী। আমি এ বিষয়ে দায়িত্ব স্বীকার করছি। প্রতিবাদের সময় অনেক নিরীহ ছাত্র ও মানুষ মারা গেছে।
পাশাপাশি বহু পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর প্রাণহানির বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ১,৪০০ জন নিহতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে এমন অনেক মৃত্যুও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সরকার পতনের পর ঘটেছে, যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। তবু সব কিছুর দায় একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো হয়েছে।”
অপরাধীদের দায়মুক্তির সমালোচনা করে জয় বলেন, “আমাদের সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- সব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। পুলিশ, বেসামরিক নাগরিক, সব দলের কর্মী, সবার জন্যই। কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই একটি অধ্যাদেশ জারি করে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়েছে। এসব হত্যাকে ‘মব জাস্টিস’ বলে বৈধতা দিয়েছে। যারা এসব করেছে, তারা আইনের ঊর্ধ্বে?”
‘দুই দলের সাজানো নির্বাচন’
নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নেওয়ার সুযোগ না রাখার সমালোচনা করেন সজীব ওয়াজেদ।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ কার্যত নিষিদ্ধ, এবং বাস্তবে সব প্রগতিশীল দলই নিষিদ্ধ। এটি কেবল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে একপেশে প্রতিযোগিতা।
“জাতীয় পার্টির অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নেতারা জেলে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা কোনো নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে না। ছোট সব প্রগতিশীল দল দমন-পীড়নের শিকার। এটি কোনো প্রকৃত নির্বাচন নয়—এটি একটি সাজানো প্রদর্শনী।”
গণভোট এবং তারেক রহমানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ সমর্থনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলেরও ব্যাখ্যা তুলে ধরেন তিনি।
জয় বলেন, “বিএনপি একটি বড় দল, তারা একসময় ক্ষমতায় আসতেই পারত। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্র কেন বিএনপি ও তারেক রহমানকে এতো সমর্থন করছে? কারণ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এফবিআইয়ের দেওয়া দুর্নীতির প্রমাণ আছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো ব্যবহার করছে না। কেননা তারা চাইলে যেকোনো সময় তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে পারবে। ফলে বিএনপি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে থাকবে।
এ কারণে বিএনপি আকস্মিক তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে গণভোটে ‘না’-এর পক্ষ ত্যাগ করে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে চলে গিয়েছে বলে জানান তিনি।
“অন্যদিকে জামায়াতের কথা বলতে গেলে- ঐতিহাসিকভাবে তাদের ভোটব্যাংক কখনোই বড় ছিল না। সাধারণত তারা ৫–১০ শতাংশ ভোট পায়। আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ভয় ও সহিংসতার পরিবেশে মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে। এজন্যই এই সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে।”
তিনি বলেন, “জামায়াতের লক্ষ্য স্পষ্ট—শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ইসলামী দল মানেই শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই সরকার ইতোমধ্যে সব জঙ্গিকে মুক্তি দিয়েছে। আল-কায়েদা ও তালেবান সংশ্লিষ্টদের প্রকাশ্যে সভা করতে দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, ভারতের নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি।”
এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানান শেখ হাসিনার ছেলে।
তিনি বলেন, “তাদের উচিত এই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নয় বলে ঘোষণা করা। এটি কোনো নির্বাচন নয়, এটি একটি নাটক। যদি এখনই এর বিরোধিতা না করা হয়, তাহলে একটি নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়বে।”
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ যদি আওয়ামী লীগকে না চায়, তাহলে তারা ভোটের মাধ্যমেই তা দেখাবে। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে ভয় পাওয়ার কী আছে? আমি এতে ভীত নই।”
বক্তব্যের শেষে এসে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামবাদ, ও সন্ত্রাসবাদকে রুখে দিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি, যাকে তিনি দেশবাসীর সামনে ‘শেষ সুযোগ’ বলে অভিহিত করেছেন।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:



