অভ্যুত্থানে জয়ী হওয়ার পর এখন দল গঠন করে রাজনীতির মাঠেও ‘খেলতে’ নেমেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তবে বাংলাদেশে সেই মাঠটি যে বড় বন্ধুর, তাও টের পেতে হচ্ছে তাদের।
নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির দুই নেতা সারজিস আলম ও আবদুল হান্নান মাসউদ সোমবার মহড়া দিতে গিয়েছিলেন নিজ নিজ জেলায়।
সেখানে নোয়াখালীর হাতিয়ায় হান্নান মাসউদকে হামলায় আহত হতে হয়েছে। সারজিস মহড়া দিয়ে এলেও বিমানে যাওয়া আর বিশাল গাড়িবহরের জন্য পড়েছেন সমালোচনায়।
গত বছরের আগস্টে যাদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে, সেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তখনকার দুই শীর্ষ সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই ছাত্র এখন নতুন দলের শীর্ষ সারির নেতা।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিসের বাড়ি পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে। সেখান থেকে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান তিনি।
অন্যদিকে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদ নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে প্রার্থী হতে তৎপর। প্রায়ই এলাকায় যাচ্ছেন তিনি, জনসংযোগ চালাচ্ছেন।
জাহাজমারায় আক্রান্ত হান্নান
সোমবার সন্ধ্যায় হাতিয়ার জাহাজমারা বাজারে পথসভার সময় হান্নান মাসউদের ওপর হামলা হয় বলে বাংলাদেশের জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুেলোতে খবর এসেছে।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাজারে পথসভার সময় এক দফা হামলা হয়। তার প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় দ্বিতীয় দফায় হামলার শিকার হন হান্নানের সমর্থকরা।
স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এই হামলার অভিযোগ উঠেছে। তবে বিএনপি নেতারা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
হান্নানের সহযোগী মোহাম্মদ ইউছুফ প্রথম আলোকে বলেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ইফতার শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাজারে একটি পথসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তখন বিএনপি নামধারী একদল লোক মিছিল নিয়ে এসে অতর্কিত হামলা চালায়। তাতে পাঁচজন আহত হয়।
প্রথম দফা হামলার পর হান্নান মাসউদ প্রথম আলোকে বলেন, “আমরা মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলাম। এমন সময় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কয়েকজন মিছিল নিয়ে আমাদের মিটিংয়ে ঢুকে যান। তারা আমাদের লোকজনের ওপর হামলা চালান। এতে আমাদের কয়েকজন আহত হয়েছেন।”
এরপর হান্নান মাসউদ তার সমর্থকদের নিয়ে জাহাজমারা বাজারে অবস্থান কর্মসূচিতে বসে পড়েন। তখন আবার হামলা হলে তাতে হান্নান মাসউদসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। মাথায় আঘাত পেয়ে হান্নানের কপাল ফুলে যাওয়ার ছবি ফেইসবুকে এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে হান্নানের ফেইসবুক পেইজে এক পোস্টে বলা হয়, “জাহাজমারাতে বিএনপির সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক আব্দুল হান্নান মাসউদ ভাইকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্য অতর্কিত হামলা। হান্নান মাসউদ ভাইসহ ৫০+ নেতাকর্মী গুরুতর আহত।”
এই ঘটনার পর নোয়াখালীর হাতিয়া থানার ওসি এ কে এম আজমল হুদা টিবিএসকে বলেন, “হান্নান মাসউদের পথসভায় হামলার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
হান্নানের পথসভায় হামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হাতিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, “জাহাজমারায় কারা কী করেছে, এর কিছুই জানি না।”
এদিকে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এই হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তিনি ফেইসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, “জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদের উপর হাতিয়ার বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। অসহিষ্ণু রাজনৈতিক চর্চা আমরা পুনরায় দেখতে চাই না বাংলাদেশে।”
বিমান থেকে নেমে গাড়িবহর নিয়ে সারজিস
এদিকে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক হওয়ার পর সোমবার প্রথমে নিজের জেলা পঞ্চগড়ে যান সারজিস। এর মধ্যে ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুর নামেন তিনি। এরপর পঞ্চগড় যেতে ১০০ কিলোমিটার পথের অর্ধেকটাই পাড়ি দিয়েছেন শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে, ঘুরেছেন কয়েকটি উপজেলায়।

সকাল সাড়ে ১১টায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নামেন সারজিস। সেখানে কয়েকটি গাড়ি নিয়ে তার সমর্থকরা অপেক্ষা করছিলেন। বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে রওনা হয়ে দুপুরে তিনি দেবীগঞ্জ সদর পৌঁছান। সেখানে শতাধিক গাড়ি ছিল তার অপেক্ষায়। সঙ্গে ছিল ব্যান্ড দল।
এরপর সারজিস ছাদখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা শহরের বিজয় চত্বরে যান। সেখানে একটি পথসভায় বক্তব্য দেন সারজিস। এরপর গাড়িবহর নিয়ে বোদা, পঞ্চগড় সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলা ঘুরে আটোয়ারীতে এসে ইফতার মাহফিলে অংশ নেন তিনি।
সারজিসের বহরে গাড়ির সংখ্যা নিশ্চিত হতে দেবীগঞ্জ উপজেলা শহর সংলগ্ন করতোয়া নদীর ওপর চতুর্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর টোল প্লাজায় কর্মীর সঙ্গে প্রথম আলো।
সেখানে টোল আদায়কারী বাবু বলেন, “আমাদের বলা হয়েছে ১৩৫টি গাড়ি আছে। সব মিলিয়ে আমাদের পাঁচ হাজার টাকা টোল দিয়েছে।”
ওই বহরে যাওয়ার আটোয়ারী উপজেলার মাইক্রোবাস চালক মো. আসিফ প্রথম আলোকে বলেন, বহরে দেড়শ গাড়ির বেশি থাকতে পারে। প্রতিটি গাড়ির জন্য ৭ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়া হয়।
সারজিসের আগমন উপলক্ষে গত দুদিন ধরে পঞ্চগড় জেলা শহরসহ অন্য উপজেলাগুলোতে পোস্টার-ব্যানারে সাজসাজ রব চলছিল।
সারজিসের জেলা সফরের আয়োজনের ঘটা দেখে ফেইসবুকে নানা সমালোচনা চলছে।
শেখ হাসিনার শাসনকালের কড়া সমালোচক, প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের ফেইসবুকে লিখেছেন, “তাহারা কহেন দেশে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান, দেশে পুলিশ একেবারেই নিষ্ক্রিয়, এতটাই খারাপ অবস্থা যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কোনো পরিস্থিতি নেই। কিন্তু তাহাদের পরামর্শ মাইন্যে নিলে এক মাসেই নির্বাচন সম্ভব।
“তা যুদ্ধাবস্থার দেশে এত ঘটা কইরা একটার পর একটা বিয়া, বিজনেস ক্লাসে বিদেশ ভ্রমণ, ফাইভ স্টারে পার্টি। নিষ্ক্রিয় পুলিশ দিয়া এসকর্টেড হইয়া প্রাডো চইরা দেশ চষা— তখন জানি কেমনে সব ঠিক থাকে।”
বিএনপিঘেঁষা প্রবাসী কলামিস্ট মারুফ মল্লিক ফেইসবুকে লিখেছেন, “এনসিপির কাছ থেকে আরো কঠিন, স্বচ্ছ ও জোরালো রাজনীতি আশা করেছিলাম। আমার ধারণা ছিল, তাদের আগমনে বিএনপিসহ অন্যদের জন্য রাজনীতি কঠিন হবে। কিন্তু তাদের কাজকর্মে আমি হতাশ। তারা বিএনপিসহ অন্যদের জন্য রাজনীতি সহজ করে দিচ্ছে।”