দক্ষিণ কোরিয়ার অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের অভিশংসন বহাল রাখার পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে রায় দিয়েছে দেশটির সাংবিধানিক আদালত। শুক্রবার আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউন প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারিত হলেন।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অযাচিতভাবে সামরিক আইন জারির অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ইউনকে পার্লামেন্টে অভিশংসন ও বরখাস্ত করা হয়েছিল।
যদিও সে সময় এটি সাময়িক সিদ্ধান্ত ছিল, তবে শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবিধানিক আদালতের চূড়ান্ত রায়ে ইউনে অপসারণ নিশ্চিত হলো।
৬০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, আগামী দুই মাস বা ৬০ দিনের মধ্যে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। এ সময় পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী হ্যান ডাক-স্যু।
তিনি বলেছেন, “কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না।”
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী হ্যান ডাক-স্যু ইতোমধ্যে জরুরি আদেশ জারি করেছেন এবং দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি মুন হিয়ং-বে রায়ে বলেন, “জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির কোনো বাস্তবিক প্রয়োজন ছিল না, তাই সামরিক আইন জারি করা অন্যায্য ছিল।”
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, “ইউন সুক ইওল তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন করেছেন।”
সিউলে উত্তেজনা
রায় ঘোষণার পর থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের রাস্তায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইউন সুক ইওলের সমর্থক ও বিরোধীরা রাস্তায় নেমে আসেন।

ইউন বিরোধীরা রায় ঘোষণার পর আনন্দ উদযাপন করলেও, ইউনপন্থীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে।
ইউন বিরোধীরা সাংবিধানিক আদালতের রায়কে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে উদযাপন করছেন। অন্যদিকে ইউনের সমর্থকরা আদালতের রায়কে ‘অন্যায়’ ও ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা ও অভিশংসনের পক্ষে থাকা প্রসিকিউটর জাং চুং-রে আদালতের রায়ের পর বলেন, “এটি সংবিধান, গণতন্ত্র ও জনগণের জন্য এক বিজয়।”
অন্যদিকে, ইউন সুক ইওলের দল ‘পিপল পাওয়ার পার্টি’ আদালতের রায় মেনে নিয়ে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তবে ইউনপন্থী আইনজীবী ইউন গ্যাপ-গেউন এই বিচারপ্রক্রিয়াকে “রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত” বলে মন্তব্য করেছেন।
ইউন সুক ইওলের উত্থান-পতন
রাজনীতিতে নতুন মুখ হিসেবে আবির্ভূত ইউন সুক ইওল ২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে ক্ষমতায় আসার পরপরই তিনি বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। তার স্ত্রী কিম কিওন হি-র বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আসে।
২০২৩ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দল বড় জয় পাওয়ার পর ইউন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।
এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি সামরিক আইন জারি করেন, যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পার্লামেন্ট তার সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। এর ধারাবাহিকতায় তিনি অভিশংসনের শিকার হন।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড়
প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলকে অপসারণের এই ঘটনাকে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সামরিক আইন জারির মতো বিতর্কিত পদক্ষেপের চেষ্টো ঘিরে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেশটিকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারবে কিনা সেটাই এখন দেখার।