শুরুটা হয়েছিল সেনাবাহিনী দিয়ে, এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, শেষে জনপ্রশাসনেও বদলি-বরখাস্তের ঝড় বইয়ে দিয়েছে তারেক রহমানের নতুন সরকার। বাদ দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটার তাজুল ইসলামকেও। এই ফাঁকে সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের বিচারকও দুজন কমে গেছে। কারণ তাদের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর একসঙ্গে এত পরিবর্বতন ঘটেছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
গত রোববার সন্ধ্যায় সামরিক বাহিনীতে বদলির প্রজ্ঞাপন আসে। এরপর সোমবার সকাল থেকে বিকালের মধ্যে অন্য পরিবর্তনগুলো আসে।
এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন নিজের পছন্দমতো সাজানো শুরু করেছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যিনি ১৭ বছর পর দেশে ফিরেই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সরকার গঠন করেছেন।
অবশ্য প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে তার মোকাবেলা করতে হয়নি। কারণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ করে রেখেছিল মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
গত ২৪ ঘণ্টায় যত পরিবর্তন হয়েছে, তাদের সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এই পদগুলোতে এসেছিলেন। তাদের সরিয়ে বেছে বেছে বিএনপি সমর্থকদেরই আনার প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
এই পরিবর্তন দেখে ফেসবুকে একজন লিখেছেন, এরা তাহলে কারা ছিল যে এদের বদলাতে হলো বিএনপিকে। অন্তর্বর্তী সরকার তো আওয়ামী লীগের সবাইকে বাদ দিয়ে এদের এনেছিল। তাহলে কি এরা জামায়াতের ছিল?
৩ সচিব বদলি, ৯ জন বরখাস্ত
তারেক রহমান সরকার গঠনের পরপরই জনপ্রশাসনের শীর্ষ দুই পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব পরিবর্তন করা হয়। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাইফুল্লাহ পান্না, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত এই কর্মকর্তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই অবসরে যাওয়া অনেক সচিবকে চাকরিতে ফিরিয়ে এনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিল। নতুন সরকার সেই চুক্তি বাতিল করে তাদের কর্মচ্যুত করেছে।
এই সচিবরা হলেন- স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান, তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মো. মোখলেসুর রহমান, এম এ আকমল হোসেন আজাদ ও কাইয়ুম আরা বেগম, বিশ্ব ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক বেগম শরিফা খান, ভূমি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মমতাজ আহমেদ এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক সিদ্দিক জোবায়ের।
নতুন পিএসও, ডিজিএফআইয়ে নতুন প্রধান
সেনাবাহিনীতে রদবদলে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ ছিল সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর মহাপরিচালকের (ডিজি)।
পিএসও ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছিলেন তিনি। জেনারেল ওয়াকারকে সরিয়ে তাকে সেনাপ্রধান করা হবে বলেও গুঞ্জন ছিল। তিনি তখনকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

কামরুলকে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন (এএফডি) থেকে পাঠানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিল বিএনপির নতুন সরকারে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন টেকনোক্রেট হিসেবে। ফলে কামরুল তার দপ্তরে গেলেন, তবে ক্ষমতাহীন হয়ে।
কামরুলকে বিদায় করে পিএসও করা হয়েছে মীর মুশফিকুর রহমানকে। তাকে পদোন্নতি দিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেলও করা হয়েছে। তিনি একদিন সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং) পদে ছিলেন।
ডিজিএফআইর ডিজি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলমকেও পাঠানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তার পদে আনা হয়েছে মেজর জেনারেল কায়সার রশিদকে।
এছাড়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমানকে আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড (আর্টডক) থেকে সদর দপ্তরের চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) করা হয়েছে। ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের মেজর জেনারেল জে এম ইমদাদুল ইসলামকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারের (ইবিআরসি) কমান্ডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইবিআরসির মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসান সেলিমকে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং) করা হয়েছে। ভারতে বাংলাদেশ দূতাবাসের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাফিজুর রহমানকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল করে খুলনা অঞ্চলের ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়েছে।
আইনাঙ্গনে তাজুল বাদ
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার এসে সেই আদালতে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ নিয়ে প্রধান প্রসিকিউটর করে তাজুল ইসলামকে। জামায়াতে ইসলামী ঘেঁষা এই আইনজীবী এই ট্রাইব্যুনালেই এক সময় যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন।
প্রধান প্রসিকিউর হয়ে বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচিত হচ্ছিলেন তাজুল। বিএনপি সরকার তাকে সরিয়ে দিয়ে প্রধান প্রসিকিউর করেছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলামকে। তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এবং কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
তাজুল এই বিদায়কে স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, রাজনৈতিক সরকার রাজনৈতিক নিয়োগ দেবে, তা অনুমেয়ই ছিল।
এদিকে হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি নাইমা হায়দারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আন্দোলকারীদের চাপের মুখে এর আগে আরো কয়েকজন বিচারপতি পদত্যাগ করেন।
সিটি কর্পোরেশনগুলোতে বিএনপির প্রশাসক
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করেছিল, যাদের অধিকাংশই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররাও বাদ পড়েন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন দেওয়ার কথা বললেও তাতে কিছুটা দেরি হবে। তার মধ্যেই ছয়টি সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর ্ও দক্ষিণ, খুলনা, গাজীপুর, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ এই ছয়টি সিটিতে মেয়রের অবর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়া সবাই বিএনপির নেতা। এদের দুজন এবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু হেরে যান।
ঢাকা দক্ষিণে প্রশাসক করা হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মো. আব্দুস সালাম। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতির পদেও রয়েছেন। এবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী কাজের সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। সংসদ নির্বাচনে তাকে ঢাকা-১৫ আসনে প্রার্থী করেছিল বিএনপি। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান তিনি। প্রায় অচেনা মিল্টনকে এরপরও মেয়র করার মধ্যদিয়ে তার খুঁটির জোর বোঝা যাচ্ছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়েছে। সাবেক এই সংসদ সদস্য খুলনা-২ আসনে এবারও প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। তিনি দীর্ঘদিন খুলনা মহানগর বিএনপিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এবারের নির্বাচনে তিনি সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন । তবে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপির নির্বাচন সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মো. সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন এক সময়। ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। তবে হেরে যান সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে। এবারের সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েও পাননি সাখাওয়াত।
গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকারকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে বসানো হয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি গাজীপুর-২ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তিনি ১০ বছর কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:



