খাল কাটছেন তারেক রহমান, কিন্তু পানি আসবে কোত্থেকে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার দিনাজপুরের কাহারোলে সাহাপাড়া খাল খননের মধ্যদিয়ে দেশব্যাপী খাল খনন কাজ উদ্বোধন করেন। ছবি: পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার দিনাজপুরের কাহারোলে সাহাপাড়া খাল খননের মধ্যদিয়ে দেশব্যাপী খাল খনন কাজ উদ্বোধন করেন। ছবি: পিআইডি

চোখে সানগ্লাস, মাথায় ক্যাপ, হাতে কোদাল- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর ১৯৭৭ সালে এভাবেই খাল খননে নেমেছিলেন জিয়াউর রহমান। নেপথ্যে কারণ যাই থাক, তার সেই খাল খননের উদ্যোগ কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছে দেশের অধিকাংশ মানুষ।

পাঁচ দশক পরে সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনলেন জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার এক মাস না গড়াতেই তিনিও কোদাল হাতে নামলেন খাল খননে। এবার নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারেই তা ছিল।

সোমবার দিনাজপুরে তারেক রহমান ঘটা করে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন। সারাদেশে বিএনপির সংসদ সদস্যরাও সদলবলে নামেন খাল খননে।

তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন করছেন, খাল খননের আগে ভাবতে হবে, এই খালে পানি আসবে কোত্থেকে? নদী মাতৃক বাংলাদেশে খালগুলোর পানির বড় উৎস হলো নদী। দখল, ভরাট আর অপরিকল্পিত উন্নয়নে নদীগুলো যাচ্ছে মরে। তাই সেদিকে আগে দৃষ্টি না দিয়ে খাল খনন করলে সমস্যার সমাধান হবে না।

২০২৪ সালে জাতীয় নদী সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের ২২৯টি নদী সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এসব নদী এখন চাইলেও দখল ও দূষণমুক্ত করা কঠিন।

সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নদী সংকটাপন্ন নদী রংপুর বিভাগে, ৪৩টি। এছাড়া সিলেটের ৪২টি, খুলনায় ৩৭টি, বরিশালে ৩০টি, ঢাকায় ২৮টি, রাজশাহীতে ১৯টি, চট্টগ্রামে ১৭টি ও ময়মনসিংহে ১৩টি নদী সংকটাপন্ন।

তারেক রহমান তার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছেন দিনাজপুর থেকে, যেখানে তার মায়ের বেড়ে ওঠা।

রংপুর অঞ্চলের নদী নিয়ে নদী আন্দোলনের কর্মী তুহিন ওয়াদুদ সম্প্রতি এক কলামে লিখেছেন, রংপুরে চার-পাঁচ বছর আগে ঘাঘট নদ খনন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তারপরও নদীটি খননে নতুন করে প্রায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয় বিআইডব্লিউটিএ।

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নদী খননে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু অনেকে ক্ষেত্রেই খনন অপরিকল্পিতভাবে হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। খনন এলোপাতাড়ি হওয়ার কারণে খননের বছর নদীর পাড়ে ভাঙন হয়েছে বেশি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার দিনাজপুরের কাহারোলে সাহাপাড়া খাল খননের মধ্যদিয়ে দেশব্যাপী খাল খনন কাজ উদ্বোধন করেন। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল

তুহিন ওয়াদুদ লিখেছেন, খননের পরও ময়মনসিংহে পুরোনো ব্রহ্মপুত্রে পানির সংকট থেকে গেছে। গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত নৌ যোগাযোগের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবসম্মত না হওয়ায় সেই টাকাও পানিতে ভেসে গেছে। পাউবো এ দেশে অসংখ্য নদীকে গলাটিপে হত্যা করেছে। পাবনা-নাটোরের বড়াল নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে চরম সর্বনাশ করেছে এই প্রতিষ্ঠান। বগুড়া দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর করুণ দশার জন্য পাউবো দায়ী। প্রায় তিন শ ফুট প্রস্থের করতোয়া নদীর প্রবাহপথে ১০-১২ ফুট স্লুইসগেট দিয়ে এ নদীটি মেরে ফেলা হয়েছে।

তুহিন ওয়াদুদের ভাষ্যে, তীর রক্ষার নামে বাঁধ দিয়ে তিস্তা নদীর অন্তত ১০টি উপনদী এবং শাখা নদীকে মেরেছে পাউবো।
জিয়াউর রহমানের সময় আর তারেক রহমানের সময় যে এক নয়, তা এক কলামে তুলে ধরেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন রুনু।

তিনি লিখেছেন, খাল কাটলেই যে তাতে পানি থাকবে, বিষয়টি এখন আর এত সহজ নয়। গত ৪০ বছরে আমাদের ৫৪টি অভিন্ন নদীর উজানে প্রতিবেশী দেশ ভারত অসংখ্য ছোট-বড় বাঁধ নির্মাণ করেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের বড় নদীগুলোতেই এখন পানি থাকে না। বড় নদীতে পানি না থাকলে খালের মধ্যে পানি আসবে কোত্থেকে?

নদী খননের ওপর জোর দিয়ে এই অধ্যাপক লিখেছেন, খাল খননের আগে নদীর খনন বা ড্রেজিং জরুরি। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে আগে জীবন্ত করতে হবে। নদীতে পানি আসার ক্ষেত্রে উজানের দেশের সাথে সমঝোতা এবং স্থানীয়ভাবে পানি আটকে রাখার জন্য রাবার ড্যাম বা নদীশাসনের যথাযথ ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে। খালের সঠিক ঢাল বা ইলিভেশন নির্ধারণ না করলে এই কর্মসূচি অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

যে কোনো কর্মসূচির আগে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। খাল খননের ক্ষেত্রেও তা করা উচিৎ ছিল বলে মনে করেন জামাল উদ্দিন।

তিনি লিখেছেন, তারেক রহমান ২০ হাজার কিলোমিটারের যে কথা বলেছেন, তা নতুন করে খোঁড়ার প্রয়োজন নেই। দেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা যে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক বা পুরোনো খালগুলো রয়েছে, সেগুলোকেই সংস্কার ও চ্যানেলাইজেশন করলে ১০-১৫ হাজার কিলোমিটারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব।

জিয়াউর রহমান যখন খাল কেটেছিলেন, তখন নদীগুলো এমন বেহাল ছিল না। ফলে তারেক রহমানকে নতুন হিসেবে করেই নামতে হতো। নইলে এই খাল কাটা নিছক রাজনৈতিক চমক হিসেবেই থেকে যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads