‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর যে ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন লাখো বাঙালি, যে মাহেন্দ্রক্ষণের সঙ্গে জড়িয়ে বাংলাদেশের রক্তঝরা ইতিহাস, আজ সেই ঐতিহাসিক দিন।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যদিও অনেক কিছুর মতোই অনুচ্চারিত সেই গৌরবময় অধ্যায়; অলক্ষে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অবদান।
আর সেকারণে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এমন অনন্য দিনে এবারও নেই কোনো আয়োজন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেও দিনটি ঘিরে থাকতো জমজমাট আয়োজন, সভা-সেমিনার, স্মৃতিচারণের নীরব প্রতিযোগিতা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসতেন বুদ্ধিজীবী কিংবা লেখকেরা।
তবে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে কার্যত ছুড়ে ফেলা হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে। ৭ মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিল করা হয় সেসময়।
পরিবর্তনের অঙ্গীকার দিয়ে ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলেও ইউনূসের বিছিয়ে যাওয়া নীতিতে হাত দেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি দিবসটি ঘিরে কোনো ক্রোড়পত্র, চোখে পড়েনি বিগত সময়ের বুদ্ধিজীবীদের কলমের আঁচড়।
দমন পীড়ন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধের খর্গে পড়া আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক এই দিবসটি ঘিরে কর্মসূচি দিলেও তা সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের বাইরে থেকে পরিচালিত দলটির এক ফেইসবুক পোস্টে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কারা ও কীভাবে ওই কর্মসূচি পালন করবে সে ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন, টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, ঐতিহাসিক ভাষণ পাঠ ও আলোচনা সভা, এবং তরুণ, যুব, ছাত্রসমাজসহ নতুন প্রজন্মের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরতে বিভিন্ন পর্যায়ে সংলাপের আয়োজন।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় নিজেও ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির তথা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা এখনও শেষ হয়নি।
“আমরা আমাদের মানচিত্র পেয়েছি, এখনও পায়নি অর্থনৈতিক মুক্তি। সেই মুক্তির পথে দেশ গঠন শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তার পথ অনুসরণ করেই দেশকে মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন তারই কন্যা।
“কিন্তু আজ বাংলাদেশে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের মহামারি, নেই কোন বাকস্বাধীনতা, নেই রাজনৈতিক অধিকার।
“আসুন ৭ই মার্চের সেই অগ্নিঝরা দিনের শপথ নেই, বাংলাদেশ গড়ার। বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার, বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার।”
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান নামে নতুন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করলেও বাঙালির শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটেনি। পাকিস্তানি শাসকদের প্রধম আঘাত আসে বাংলা ভাষার ওপর; ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়ে সেই ভাষার অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছিল।
তারপর দীর্ঘ অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বাঙালির মুখপাত্র হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান; পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে ৫৬ বছরের জীবনের ১৪ বছরই কারাগারে কাটাতে হয়েছিল তাকে। পরম ভালোবাসায় তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয় বাঙালি।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের মহাকাব্যিক এক ভাষণে বাঙালিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন বঙ্গবন্ধু; এরপর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে দিয়ে যান স্বাধীনতার ঘোষণা।
বঙ্গবন্ধুর ডাকেই মুক্তিযুদ্ধে নেমেছিল জনতা; নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণের এবং দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আসে বিজয়। পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয় লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ।
এরপর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু; তার শাসনকাল নিয়ে নানা সমালোচনাও ওঠে।
তারমধ্যেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের অভ্যুত্থানে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
তখন থেকেই মূলত স্বাধীনতার বিপরীত স্রোতে বাংলাদেশের চলার শুরুটা হয়েছিল। পরবর্তীকালে বাবার গড়া দল আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা বঙ্গবন্ধুর নাম নিষিদ্ধই করে রেখেছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি পর্যন্ত মানুষকে শুনতে দেওয়া হয়নি।
১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছর সরকার পরিচালনার পর ২০০৯ সালে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট তার টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে।
প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এখনও সেখানেই রয়েছেন তিনি। তার দলের নেতারা কেউ কারাগারে, কেউ পালিয়ে। ৫ আগস্টের পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন শাখা অফিসগুলো জ্বালিয়ে দেওয়ায় আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য কোনও কার্যক্রমও নেই।
অভ্যুত্থানের পর গঠিত নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনার ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের’ অবশেষ উপড়ে ফেলতে তৎপর হয়ে ওঠেন। তারই ধারাবাহিকতায় বিগত দেড় বছরে রাষ্ট্রীয় যেকোনো দিবসের উদযাপনে কোথাও বঙ্গবন্ধুর স্থান হয়নি।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে দমন পীড়ন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে দেশ মুক্তি পাবে- এমন আশা নিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের অনুসারীরা ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ঘিরে সরকারের নীরবতায় ‘হতাশ না হলেও’ আশাবাদী যে নন তা তাদের সামাজিক মাধ্যম কেন্দ্রিক কর্মসূচি থেকে অনুমেয়।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের ফেইসবুক পেজে দেওয়া সাদামাটা বাণীতে ৭ মার্চের পটভূমি বর্ণনা করে বলেন, “আজ বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এক বিশেষ সময় পার করছে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে যখনই অন্ধকার নেমে এসেছে, যখনই গণতন্ত্র ও মেহনতি মানুষের অধিকার লুণ্ঠিত হয়েছে, তখনই সাতই মার্চের সেই কালজয়ী ভাষণ আমাদের সাহস জুগিয়েছে। প্রতিটি চড়াই-উতরাই ও দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুর সেই অদম্য প্রত্যয় আমাদের নতুন করে উজ্জীবিত করে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে কোনো অপশক্তিই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। প্রত্যাশিত মুক্তি আমাদের আসবেই।
“আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদান করেছেন, সম্ভ্রম হারিয়েছেন; সেইসব মহান ও মহিয়সীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সাতই মার্চের উদ্দীপনা বুকে নিয়ে আসুন আমরা সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের দখলমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার শপথ নিই।”
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঐতিহাসিক ৭ মার্চে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে পৃথক বাণী দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। তবে গতবছরের পর এবারও আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথকভাবে কোনো বাণী দেননি।
রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি উদযাপনের কোনো কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়নি। সরকারি ছুটি তো আগেই বাতিল করেছে মুহাম্মদ ইউনূসের বিগত অন্তর্বর্তী সরকার।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:



