বড়দিনের ঠিক আগে, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই অংশীদারত্বের গোপন কেন্দ্রে তার প্রথম সফরে ভিজবাডেন গেট দিয়ে প্রবেশ করেন।
টনি ব্যাস অডিটোরিয়ামে প্রবেশকালে তাকে যুদ্ধের স্মারকগুলো দেখানো হয় – রুশ যানবাহন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমানের বিকৃত ধ্বংসাবশেষ। ২০২২ সালে জেনারেল জাব্রডস্কির মতোই যখন তিনি বাস্কেটবল কোর্টের ওপরের ওয়াকওয়েতে উঠলেন, নিচে কর্মরত অফিসাররা স্বতঃস্ফূর্ত করতালি দিতে শুরু করেন।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট উৎসব করতে ভিজবাডেন আসেননি। ব্যর্থ পাল্টা আক্রমণের প্রেক্ষাপটে, যুদ্ধের তৃতীয় কঠিন শীত আসন্ন হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন হচ্ছিল। নতুন সুবিধা আদায়ের জন্য রাশিয়া পূর্বাঞ্চলে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করছিল। আমেরিকায় ইউক্রেন-সংশয়ী ট্রাম্প আবারও রাজনৈতিকভাবে শক্তি অর্জন করছিলেন; কংগ্রেসের কিছু রিপাবলিকান অর্থায়ন বন্ধ করার কথা বলছিলেন।
এক বছর আগেও জোটটি বিজয়ের কথা বলছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখতে বাইডেন প্রশাসনকে নিজেদের নির্ধারিত সীমা বারবার অতিক্রম করতে বাধ্য হয়।
প্রথমে ভিজবাডেনে জরুরি আলোচনায় জেনারেল ক্যাভোলি ও আগুটো স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের কোনো বাস্তবসম্মত পথ তারা দেখছেন না। কারণ জোট বড় কোনো পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে না। ইউক্রেনও এত বড় সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারবে না। এ অবস্থায় ইউক্রেনকে লক্ষ্য সংযত করতে হবে। ২০২৫ সালে সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণের জন্য সামরিক শক্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি এখন নজর দিতে হবে: পূর্বাঞ্চলে প্রতিরক্ষা লাইন শক্তিশালী করে রুশ অগ্রযাত্রা রোধ ও বিদ্যমান ব্রিগেডগুলো পুনর্গঠন ও নতুন ব্রিগেড গঠন।
জেলেনস্কি এই পরিকল্পনায় তার সমর্থন জানান।

আস্থার অবক্ষয় ও সীমান্ত লঙ্ঘন
যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ জানত, জেলেনস্কি অনিচ্ছা নিয়েই এই পরিকল্পনা মেনে নিয়েছেন। তিনি বারবার স্পষ্ট করেছেন যে দেশের মনোবল ও পশ্চিমা সহায়তা ধরে রাখতে তার একটি বড় বিজয় দরকার।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, জেনারেল জালুঝনিকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ২০২৪ সালের শরৎ নাগাদ রুশ সৈন্যদের ১৯৯১ সালের ইউক্রেনীয় সীমানার বাইরে ঠেলে দিতে। জেনারেল তখন একটি অপ্রত্যাশিত পরিকল্পনা পেশ করে আমেরিকানদের হতবাক করেন। কারণ এই পরিকল্পনা সফলে লাগবে ৫০ লক্ষ গোলাবারুদ ও ১০ লক্ষ ড্রোন। জেনারেল ক্যাভোলি রুশ ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন, “কোথা থেকে পাবেন এগুলো?”
কয়েক সপ্তাহ পর কিয়েভের এক সভায় ক্যাভোলিকে ইউক্রেনীয় কমান্ডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের রান্নাঘরে আটকে রাখেন। প্রচণ্ড উত্তেজনায় ই-সিগারেট টানতে টানতে তিনি শেষ চেষ্টা করেন, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। তার একজন সহকারী বলেন, “তিনি দুই দিক থেকে চাপের মধ্যে ছিলেন – একদিকে প্রেসিডেন্ট, অন্যদিকে মিত্রদেশগুলো।”
একটি সমঝোতার অংশ হিসেবে আমেরিকানরা জেলেনস্কিকে একটি বিজয়ের ঘোষণা দেবার মতো পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। সেটি ছিল একটি বোমাবর্ষণ অভিযান। এতে দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ানদের ক্রিমিয়া থেকে তাদের সামরিক অবকাঠামো সরিয়ে রাশিয়ায় ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে। এটি অপারেশন লুনার হেইল নামে কোড-নামকরণ করা হয়।
এখন পর্যন্ত, ইউক্রেনীয়রা সিআইএ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সহায়তায়, সামুদ্রিক ড্রোন এবং দীর্ঘ-পাল্লার ব্রিটিশ স্টর্ম শ্যাডো ও ফরাসি এসসিএএলপি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ব্ল্যাক সী ফ্লিটে আক্রমণ করেছিল। ভিজবাডেনের অবদান ছিল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ।
তবে ক্রিমিয়ার বড় অভিযান চালাতে ইউক্রেনীয়দের অনেক বেশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হবে। তাদের শত শত এটিএসএমএস প্রয়োজন হবে।
পেন্টাগনের পুরনো সতর্কতাগুলো সম্পূর্ণ দূর হয়নি। তবে জেনারেল আগুটো যখন অস্টিনকে ‘লুনার হেইল’ অপারেশনের সম্ভাব্য সাফল্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানান, তখন একজন সহকারীর স্মৃতিচারণ মতে, অস্টিন বলেন, “ঠিক আছে, এখানে একটি সত্যিকারের জোরালো কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে। এটা শুধু কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার বিষয় নয়।”
ফলে জেলেনস্কি তার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র পাবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, “আমরা জানতাম, তার হৃদয়ের গভীরে তিনি এখনও অন্য কিছু, আরও বড় কিছু করতে চাইছেন।”
জানুয়ারির শেষ দিকে জেনারেল জাব্রডস্কি ভিজবাডেন কমান্ড সেন্টারে থাকাকালে একটি জরুরি বার্তা পেয়ে বাইরে যান।
ফিরে এসে তিনি ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়েন। জেনারেল আগুটোকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে তিনি একটি লাকি স্ট্রাইক সিগারেট টানতে টানতে জানান, ইউক্রেনের নেতৃত্ব সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছে। জেনারেল জালুঝনিকে বরখাস্ত করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল সিরস্কি এই পদে আসীন হবেন।
আমেরিকানরা এই খবরে বিশেষ অবাক হননি। তারা আগে থেকেই প্রেসিডেন্টের অসন্তুষ্টির কথা শুনছিলেন। ইউক্রেনীয়রা এটাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছিল। জনপ্রিয় জালুঝনি যাতে প্রেসিডেন্ট পদে জেলেনস্কির প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতে পারেন, সেই আশঙ্কা থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

একটি স্টাভকা সভায় প্রেসিডেন্ট জালুঝনিকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছিলেন। এরপর জালুঝনি দ্য ইকোনমিস্টে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধ এখন অচলাবস্থায় পৌঁছেছে এবং ইউক্রেনের জন্য প্রযুক্তিগত বিপ্লব প্রয়োজন। অন্যদিকে তার প্রেসিডেন্ট তখন সম্পূর্ণ বিজয়ের কথা বলছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার মতে, জালুঝনি ছিলেন “হাঁটতে থাকা মৃত মানুষ”।
জেনারেল সিরস্কির নিয়োগ মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। আমেরিকানরা আশা করেছিল, এখন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির আস্থাভাজন একজন সহযোগী তারা পাবেন। যার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও সুসংগঠিত হবে। জেনারেল সিরস্কি তাদের কাছে পরিচিত মুখ ছিলেন।
তবে এই পরিচয়ের মধ্যে ছিল ২০২৩ সালের বাখমুতের যুদ্ধের স্মৃতি – যেখানে তিনি কখনও কখনও তাদের পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা নস্যাৎ করার চেষ্টাও করেছিলেন। তবু জেনারেল ক্যাভোলি ও আগুটো মনে করতেন, তারা তার স্বভাব-চরিত্র বুঝতে পারেন। তিনি অন্তত তাদের কথা শুনতেন এবং অন্যান্য কমান্ডারদের চেয়ে আলাদা হিসেবে, তিনি তাদের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের মূল্য বোঝেন ও সাধারণত তা বিশ্বাস করতেন।
কিন্তু জেনারেল জাব্রডস্কির জন্য এই পরিবর্তন ছিল ব্যক্তিগত আঘাত এবং কৌশলগত অনিশ্চয়তা। তিনি জেনারেল জালুঝনিকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং সংসদীয় আসন ছেড়ে তার পরিকল্পনা ও অপারেশন ডেপুটি হয়েছিলেন। অচিরেই তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, এমনকি ভিজবাডেনের দায়িত্ব থেকেও। জেনারেল আগুটো এ খবর শুনে তাকে নর্থ ক্যারোলাইনার তার বীচ হাউসে আমন্ত্রণ জানান নৌকা ভ্রমণের প্রস্তাব দিয়ে। জাব্রোডস্কি জবাব দেন, “পরের জীবনে হয়তো সম্ভব হবে।”
এই নেতৃত্ব পরিবর্তন ঘটেছে জোট সম্পর্কের এক অত্যন্ত অনিশ্চিত মুহূর্তে। ট্রাম্পের প্ররোচনায় কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা ৬১ বিলিয়ন ডলারের নতুন সামরিক সহায়তা আটকে রেখেছিল।
মেলিতোপলের যুদ্ধে কমান্ডাররা প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু যাচাই করতে ড্রোন ব্যবহারে জোর দিতেন। রকেট ও গোলাবারুদের অভাবে সামরিক নেতারা একই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। ভিজবাডেন লক্ষ্যবস্তুর তথ্য তৈরি করলেও ইউক্রেনীয়রা তা খুব কমই ব্যবহার করছে।
জেনারেল জাব্রডস্কি আমেরিকানদের বলেছিলেন, “এখন আমাদের এটা দরকার নেই।”
রেড লাইনগুলো অবিরত পরিবর্তিত হচ্ছিল।
প্রথমে ছিল এটিএসিএমএস। এটি গোপনে বসন্তের শুরুতে পৌঁছেছিল, যাতে রাশিয়ানরা বুঝতে না পারে যে এখন ইউক্রেন ক্রিমিয়া জুড়ে আঘাত করতে সক্ষম।
এছাড়া ছিল এসএমইএস (বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদল)। কয়েক মাস আগে, জেনারেল আগুটোকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল প্রায় এক ডজন কর্মকর্তার একটি ছোট দলকে কিয়েভে পাঠানোর জন্য। এর মাধ্যমে আমেরিকান সেনাদের ইউক্রেনীয় ভূমিতে উপস্থিতি সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল। তবে তারা কিয়েভ এলাকার বাইরে যেতে পারবেন না।
তবে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন রেড লাইন ছিল রাশিয়ার সীমান্ত। শীঘ্রই সেই সীমান্তও নতুন করে আঁকা হবে। এপ্রিলে অর্থায়ন সংক্রান্ত বাধা শেষ হলে ১৮০টি এটিএসিএমএস, ডজনখানেক আর্মারড যান এবং ৮৫ হাজার ১৫৫-মিলিমিটার শেল পোল্যান্ড থেকে ইউক্রেনে যেতে শুরু করেছিল।
তবে জোটের গোয়েন্দা সংস্থা অন্য ধরনের গতিবিধি শনাক্ত করছিল: একটি নতুন রাশিয়ান ফর্মেশন। ৪৪ তম আর্মি কোর, ইউক্রেনীয় সীমান্তের ঠিক উত্তর দিকে বেলগোরোদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনীয়রা যখন আমেরিকান সাহায্য হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, তখন রুশ সেনারা সীমিত সময়ের সুযোগ দেখে উত্তর ইউক্রেনে নতুন একটি সামরিক মঞ্চ খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ইউক্রেনীয়রা বিশ্বাস করছিল, রাশিয়ানরা খারকিভের চারপাশে একটি বড় সড়ক পৌঁছাতে চাচ্ছিল। এটি তাদের ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরে আর্টিলারি দিয়ে আক্রমণ করতে এবং দশ লাখের বেশি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
রুশ সেনারা তাদের সেনাদের সীমান্তের অপর পাশ থেকে আর্টিলারি সহায়তা করতে পারত। কিন্তু ইউক্রেনীয়রা আমেরিকান সরঞ্জাম বা গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে পাল্টা আক্রমণ করতে পারছিল না।
তবে বিপদের মধ্যে একটি সুযোগ ছিল। রুশ সেনারা নিরাপত্তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল। তাদের ধারণা ছিল, আমেরিকানরা কখনও ইউক্রেনীয়দের রাশিয়ায় আক্রমণ করার অনুমতি দেবে না। পুরো ইউনিট এবং তাদের সরঞ্জামগুলো খোলামাঠে, বেশিরভাগ সুরক্ষাহীন অবস্থায় ছিল।

ইউক্রেনীয়রা আমেরিকান সরবরাহকৃত অস্ত্র রাশিয়ার সীমান্তে ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল। জেনারেল ক্যাভোলি ও আগুটো প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, ভিজবাডেন এই আক্রমণগুলো পরিচালনা করতে সাহায্য করবে, যেমনটি তারা ইউক্রেন ও ক্রিমিয়াতে করেছে — গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও সঠিক কোঅর্ডিনেট সরবরাহ করবে।
হোয়াইট হাউস তখনও এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছিল যখন ১০ মে রাশিয়ানরা আক্রমণ শুরু করেছিল।
এটি ছিল সেই মুহূর্ত যখন বাইডেন প্রশাসন খেলার নিয়ম পরিবর্তন করল। জেনারেল ক্যাভোলি ও আগুটোকে একটি ‘‘অপস বক্স” তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই অপস বক্স হলো রাশিয়ার ভূখণ্ডে এমন একটি এলাকা যেখানে ইউক্রেনীয়রা আমেরিকান সরবরাহকৃত অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে এবং ভিজবাডেন তাদের আক্রমণে সহায়তা করবে।
প্রথমে তারা একটি বিস্তৃত বক্সের পক্ষে ছিল। এতে যুক্ত ছিল গ্লাইড বোম্ব। সোভিয়েত যুগের মর্টার বোম্বগুলোকে এবং ফিনসহ সঠিক অস্ত্র হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এই বোমা খারকিভে রীতিমত আতঙ্ক সৃষ্টি করছিল। প্রায় ১৯০ মাইল বিস্তৃত একটি বক্স ইউক্রেনীয়দের তাদের নতুন এটিএসিএমএস ব্যবহার করতে দিতো, যাতে তারা গ্লাইড বোম্ব ক্ষেত্র এবং রাশিয়ার গভীরে অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। তবে অস্টিন একে মিশন ক্রিপ হিসেবে দেখলেন: তিনি লুনার হেইল এর জন্য এটিএসিএমএস সরিয়ে নিতে চাননি।
জেনারেলদের দুইটি বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়—একটি প্রায় ৫০ মাইল গভীর, যা হিমরাসের সাধারণ পাল্লার মধ্যে। অন্যটি প্রায় দ্বিগুণ গভীর। তবে জেনারেলদের সুপারিশের বিরুদ্ধে গিয়ে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও তার উপদেষ্টারা সবচেয়ে সীমিত বিকল্পটি বেছে নেন। তবে খারকিভের পাশাপাশি সুমি শহর সুরক্ষিত রাখতে, এই অঞ্চলটি দেশটির উত্তর সীমান্তের বেশিরভাগ অংশজুড়ে বিস্তৃত করা হয়।
সিআইএকে অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে তারা খারকিভ অঞ্চলে তাদের কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সহায়তা করতে পারে।
মে মাসের শেষের দিকে এই “অপস বক্স” কার্যকর হয়। রুশ বাহিনী এতে পুরোপুরি বিস্মিত হয়ে পড়ে। ভিজবাডেনের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ও কোঅর্ডিনেট এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে, হিমরাস হামলা খারকিভ রক্ষায় সহায়তা করে। এতে রুশ বাহিনী যুদ্ধে তাদের অন্যতম বৃহৎ ক্ষতির শিকার হয়।
যা আগে কল্পনাতীত ছিল, তা বাস্তব হয়ে গেল—যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সার্বভৌম ভূখণ্ডে রুশ সেনাদের হত্যার অংশ হয়ে উঠল।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ইউক্রেনের উত্তর ও পূর্বের বাহিনী ছিল চরম চাপের মুখে। তবুও জেনারেল সিরস্কি বারবার আমেরিকানদের বলছিলেন, “আমাকে জিততেই হবে।”
এর পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল মার্চ মাসেই। তখন আমেরিকানরা জানতে পারে, ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (এইচইউআর) গোপনে দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ায় স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে। কিয়েভে সিআইএ স্টেশন প্রধান এই বিষয়ে এইচইউআর এর কমান্ডার জেনারেল কিরিলো বুদানভের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, যদি ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অস্ত্র বা গোয়েন্দা সহায়তা পাবে না। এরপরও এইচইউআর এগিয়ে যায়, কিন্তু দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এমন পরিস্থিতিতে বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা হতাশা নিয়ে বলতেন, রুশদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে তারা রাশিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে বেশি জানে। কিন্তু তাদের ইউক্রেনীয় মিত্রদের পরিকল্পনা সম্পর্কে কম জানে।
ইউক্রেনীয়দের দৃষ্টিতে, “জিজ্ঞেস কোরো না, বলব না” নীতি ছিল “জিজ্ঞেস করে আটকানোর চেয়ে ভালো”। সাবেক ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভ্যালেরি কনড্রাতিয়ুক বলেন, “আমরা মিত্র, তবে আমাদের লক্ষ্য ভিন্ন। আমরা আমাদের দেশ রক্ষা করি, আর আপনারা শীতল যুদ্ধের পুরনো ভয় রক্ষা করেন।”
আগস্টে ভিজবাডেনে জেনারেল আগুটোর দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হতে চলেছিল। তিনি ৯ আগস্ট দায়িত্ব ছেড়ে দেন। একই দিনে ইউক্রেনীয়রা উত্তরে কোনো একটি ঘটনা ঘটতে পারে বলে রহস্যময় ইঙ্গিত দেয়।
১০ আগস্ট সিআইএ স্টেশন প্রধানও সদর দফতরের নতুন দায়িত্ব নিতে চলে যান। এই কমান্ড পরিবর্তনের মধ্যেই জেনারেল সিরস্কি সুযোগ নেন—তিনি সেনাদের দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে পাঠান।
আমেরিকানদের জন্য এটি ছিল গুরুতর বিশ্বাসভঙ্গ। শুধু তথ্য গোপন করাই নয়, ইউক্রেনীয় বাহিনী একটি সম্মত সীমা লঙ্ঘন করেছিল। তারা জোটের দেওয়া সরঞ্জাম নিয়ে রাশিয়ার সেই এলাকায় প্রবেশ করে, যা “অপস বক্স” এর মধ্যে পড়ত। অথচ এই বক্স তৈরি হয়েছিল খারকিভে মানবিক বিপর্যয় রোধের জন্য, রাশিয়ার ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়।
একজন উচ্চপদস্থ পেন্টাগন কর্মকর্তা বলেন, “এটি প্রায় ব্ল্যাকমেইল ছিল না, এটা আসলেই ব্ল্যাকমেইল।”

আমেরিকানরা চাইলে এই “অপস বক্স” বন্ধ করে দিতে পারত। কিন্তু প্রশাসনের এক কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন, তা করা হলে একটি বিপর্যয় নেমে আসতে পারত—কুর্স্কে থাকা ইউক্রেনীয় সেনারা হিমরাস রকেট ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা ছাড়া প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ত।
আমেরিকানদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কুর্স্ক অভিযানই ছিল সেই বিজয়, যার ইঙ্গিত এতদিন ধরে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দিয়ে আসছিলেন। এটি তার কৌশলগত পরিকল্পনারও প্রমাণ।
তিনি এখনো সম্পূর্ণ বিজয়ের কথা বলছেন। তবে আমেরিকানদের কাছে তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল কৌশলগত সুবিধা অর্জন। রুশ ভূখণ্ড দখল করে তা ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেনের হারানো জমির বিনিময়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আগে নিষিদ্ধ থাকা উসকানিমূলক অভিযান অনুমোদিত হয়ে যায়।
জেনারেল জাব্রডস্কি দায়িত্ব হারানোর আগে তিনি ও জেনারেল আগুটো “অপারেশন লুনার হেইল”-এর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছিলেন। এই অভিযানের জন্য বিশেষ পর্যায়ের তদারকি প্রয়োজন ছিল, যা জেনারেল ডনাহুর সময়ের পর আর দেখা যায়নি। প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে আমেরিকান ও ব্রিটিশ কর্মকর্তারা সরাসরি যুক্ত ছিলেন—তারা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ হিসাব করা পর্যন্ত সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
ক্রিমিয়ায় প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কের্চ প্রণালী সেতু। এটি রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উপদ্বীপটিকে যুক্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন এই সেতুকে ক্রিমিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখতেন। অন্যদিকে এটি ধ্বংস করাই হয়ে উঠেছিল প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অন্যতম লক্ষ্য।
তবে এটি ছিল আমেরিকার জন্য একটি নিষিদ্ধ লক্ষ্যবস্তু। ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে এই সেতুতে হামলার ক্ষেত্রে কোনো সহায়তা দিতে নিষেধ করেছিল। এমনকি ক্রিমিয়ার দিকের প্রবেশপথও রাশিয়ার সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা নিজ উদ্যোগে সেতুতে হামলা চালিয়ে কিছুটা ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছিল।
অপারেশন লুনার হেইল নিয়ে ঐক্যমতে পৌঁছানোর পর হোয়াইট হাউস ইউক্রেন, ব্রিটেন এবং নিজেদের সামরিক বাহিনী ও সিআইএ-কে গোপনে সেতু ধ্বংসের পরিকল্পনা তৈরি করার অনুমতি দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেতুর দুর্বল স্থানগুলোতে আঘাত হানা হবে। এরপর সামুদ্রিক ড্রোন দিয়ে সেতুর স্তম্ভগুলোতে বিস্ফোরণ ঘটানো হবে।
কিন্তু যখন ড্রোনগুলোর প্রস্তুতি চলছিল, রাশিয়া তাদের প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করে।
ইউক্রেন প্রস্তাব দেয়, এটিএসিএমএস দিয়েই হামলা চালানো হোক। তবে জেনারেল ক্যাভোলি ও আগুটো এতে আপত্তি জানান। তারা বলেন, এটিএসিএমএস একা সেতু ধ্বংস করতে পারবে না। তাই ইউক্রেনকে ড্রোন প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে অথবা হামলা বাতিল করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত আমেরিকানরা আপত্তি তুলে নেয়। এরপর আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ভিজবাডেনের অনিচ্ছাকৃত সহযোগিতায় ইউক্রেন এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে সেতুটি ধসে পড়েনি। হামলার ফলে কিছু গর্ত তৈরি হয়, যা রাশিয়া দ্রুত সংস্কার করে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “কখনও কখনও ওদের ব্যর্থ হতে হয়, যাতে বুঝতে পারে আমরা ঠিক বলেছিলাম।”

কের্চ সেতু হামলার ব্যর্থতা সত্ত্বেও, অপারেশন লুনার হেইলকে সফল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। রুশ যুদ্ধজাহাজ, বিমান, কমান্ড পোস্ট, অস্ত্রের গুদাম ও মেরামত কেন্দ্র ধ্বংস হয় বা হামলা এড়াতে মূল ভূখণ্ডে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কের্চ সেতুতে ব্যর্থ হামলা ও এটিএসিএমএস এর স্বল্পতা দেখে বাইডেন প্রশাসন বুঝতে পারে, ইউক্রেনের দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন ব্যবহারে সহায়তা করা জরুরি। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা এড়িয়ে সঠিকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা।
নীতিগতভাবে সিআইএ রুশ ভূখণ্ডের লক্ষ্যবস্তুর ওপর গোয়েন্দা তথ্য দিতে পারত না। তবে প্রশাসন বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য রাশিয়ার ভেতরে হামলায় সহায়তা করার অনুমোদন দেয়।
গোয়েন্দা তথ্য থেকে জানা যায়, ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে ২৯০ মাইল উত্তরে তোরোপেৎস নামে একটি শহরে বিশাল অস্ত্রগুদাম রয়েছে। সেখান থেকে খারকিভ ও কুর্স্কে রুশ বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। প্রশাসন এই মিশনের জন্য অনুমোদন দেয়।
সিআইএ কর্মকর্তারা অস্ত্র গুদামের দুর্বলতা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চিহ্নিত করেন। তারা গণনা করেন, হামলার জন্য কতগুলো ড্রোন প্রয়োজন হবে এবং কীভাবে সেগুলো উড়বে যাতে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া যায়।
১৮ সেপ্টেম্বর একঝাঁক ড্রোন রুশ অস্ত্রগুদামে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের শক্তি ছোটখাটো ভূমিকম্পের মতো ছিল। এতে একটি ফুটবল মাঠের সমান বড় গর্ত সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে বিশাল আগুনের গোলা ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী লেকের ওপরে উঠতে দেখা যায়।
তবে কের্চ সেতুর মতোই এই ড্রোন হামলাও কৌশলগত মতপার্থক্য প্রকাশ করে।
আমেরিকানরা যুক্তি দেন, ড্রোন হামলা শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপরই হওয়া উচিত। ২০২৩ সালের পাল্টা আক্রমণের সময় মেলিতোপোলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে দেওয়া তাদের যুক্তির মতোই এটি ছিল। কিন্তু ইউক্রেনীয়রা আরও বিস্তৃত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে চায়। এর মধ্যে তেল-গ্যাস স্থাপনা ও মস্কোর আশপাশের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল স্থানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এসব হামলায় তারা সিআইএ’র সহায়তা নেয়নি।
সেপ্টেম্বরে কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনকে জেলেনস্কি বলেন, “রুশ জনগণ পুতিনের বিরুদ্ধে চলে যাবে। আপনি ভুল ভাবছেন। আমরা রুশদের চিনি।”
অক্টোবরে অস্টিন ও জেনারেল ক্যাভোলি কিয়েভ সফর করেন। বছর বছর ধরে বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে আরও উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং বহু সীমারেখা অতিক্রম করেছে। তবু প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও জেনারেল যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্বল পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
রুশ বাহিনী পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের দুর্বল সেনাদের বিরুদ্ধে ধীর কিন্তু স্থির অগ্রগতি করছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল পোকরোভস্ক শহর। তারা কুর্স্ক অঞ্চলের কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করছিল। যদিও রুশ সেনাদের দৈনিক ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ১ থেকে দেড় হাজারে পৌঁছেছিল। তারা তবুও আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল।
পরে অস্টিন বর্ণনা করেন, কিভাবে তিনি এই জনবল বৈষম্য নিয়ে ভাবছিলেন, যখন তার সাঁজোয়া গাড়ি কিয়েভের রাস্তায় চলছিল। তিনি লক্ষ্য করেন, রাস্তায় অনেক তরুণ ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রায় কেউই সেনাবাহিনীর পোশাকে ছিল না। তিনি সহকারীদের বলেন, যুদ্ধরত দেশে এই বয়সী পুরুষরা সাধারণত ফ্রন্টলাইনে থাকে।
এটাই ছিল কঠিন বার্তাগুলোর একটি, যা আমেরিকানরা কিয়েভে এসে দিতে চেয়েছিল। তারা ব্যাখ্যা করলেন, ২০২৫ সালে ইউক্রেনের জন্য তারা কী করতে পারবে এবং কী পারবে না।
জেলেনস্কি ইতোমধ্যে একটি ছোট পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ন্যূনতম বয়স ২৫-এ নামিয়ে এনেছিলেন। তবু ইউক্রেনীয় বাহিনী বিদ্যমান ব্রিগেড পূরণ করতেও হিমশিম খাচ্ছিল, নতুন ব্রিগেড গঠন তো দূরের কথা।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী অস্টিন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে চাপ দেন আরও বড় ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে—১৮ বছর বয়সীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করতে। কিন্তু জেলেনস্কি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, “আমি আরও সেনা সংগ্রহ করব কেন? তাদের দেওয়ার মতো কোনো সরঞ্জামই আমাদের নেই।”
উপস্থিত এক কর্মকর্তার মতে, অস্টিন পাল্টা বলেন, “আপনার জেনারেলরা বলছেন যে আপনার ইউনিটগুলো জনবলের ঘাটতিতে ভুগছে। তাদের কাছে থাকা সরঞ্জামের তুলনায় সৈন্যসংখ্যা কম।”

এটাই ছিল দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা। ইউক্রেনীয়দের মতে, আমেরিকানরা তাদের জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছিল না। আর আমেরিকানদের মতে, ইউক্রেনীয়রা নিজেদের জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছিল না।
জেলেনস্কি প্রায়ই বলতেন, ইউক্রেন তার ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছে। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা সেই ভবিষ্যতের স্থপতি। কিন্তু এক আমেরিকান কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, “যদি তারা নিজেদের জনগণকে লড়াইয়ে নামাতে না চায়, তবে এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নয়।”
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জেনারেল বাল্ডউইন কিয়েভ সফর করেছিলেন। তিনি প্রথম দিকে জোট কমান্ডারদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তখন পাল্টা আক্রমণ থেমে যাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন আসন্ন ছিল এবং ইউক্রেনীয়রা আফগানিস্তান সম্পর্কে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল।
তিনি স্মরণ করেন, ইউক্রেনীয়রা ভীত ছিল যে তাদেরকেও পরিত্যাগ করা হবে। তারা বারবার জিজ্ঞাসা করত: “কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা জিতলে কী হবে? ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে কী ঘটবে?” তিনি সবসময় তাদের উৎসাহিত করতে বলতেন। তবে স্বীকার করেন, “আমি আড়ালে আঙুল পাকাতাম। কারণ সত্যিই আর কিছু জানতাম না।”
ট্রাম্প জিতলে সেই ভয় সত্যি হতে চলেছিল।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার শেষ দিনগুলোতে ইউক্রেন প্রকল্প বাঁচাতে কিছু তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত নেন। তিনি চূড়ান্ত সীমারেখা অতিক্রম করে অপারেশন বক্স সম্প্রসারিত করেন। এতে রাশিয়ার ভেতরে এটিএসিএমএস ও ব্রিটিশ স্টর্ম শ্যাডো আক্রমণ চালানো যায়। উত্তর কোরিয়া যখন হাজারো সৈন্য পাঠিয়ে রাশিয়াকে কুর্স্ক থেকে ইউক্রেনীয়দের তাড়াতে সাহায্য করে, তখন প্রথম যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আক্রমণে উত্তর কোরিয়ান কমান্ডার কর্নেল জেনারেল কিম ইয়ং বোক আহত হন।
প্রশাসন ভিজবাডেন ও সিআইএকে দক্ষিণ রাশিয়ার একটি অংশে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণে সহায়তা করার অনুমতি দেয়। এই এলাকা পক্রোভস্ক আক্রমণের জন্য রুশ সৈন্য সমাবেশের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এছাড়া সামরিক উপদেষ্টাদের কিয়েভ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি কমান্ড পোস্টে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
ডিসেম্বরে জেনারেল ডনাহু তার চতুর্থ স্টার পেয়ে ইউএস আর্মি ইউরোপ ও আফ্রিকার কমান্ডার হিসেবে ভিজবাডেনে ফিরে আসেন। কাবুলের বিশৃঙ্খল পতনের সময় তিনি ছিলেন সেখান থেকে প্রস্থানকারী যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সৈন্য। এখন তাকে ইউক্রেনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মোকাবেলা করতে হবে।
জেনারেল ডনাহুর দুই বছরের অনুপস্থিতিতে অনেক কিছু বদলে গেছে। কিন্তু ভূখণ্ডের প্রশ্নে তেমন পরিবর্তন হয়নি। যুদ্ধের প্রথম বছরে ভিজবাডেনের সহায়তায় ইউক্রেন সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ২০২২ সালের রুশ আক্রমণের পর হারানো অর্ধেকের বেশি ভূমি তারা পুনরুদ্ধার করেছিল। এখন তারা পূর্বাঞ্চলে (এবং কুর্স্কে) ছোট ছোট ভূমিখণ্ডের জন্য লড়ছে।
পেন্টাগন কর্মকর্তার মতে, জেনারেল ডনাহুর ভিজবাডেনে মূল লক্ষ্য হবে এই সামরিক জোটকে শক্তিশালী করা এবং নতুন প্রাণসঞ্চার করা – রুশ অগ্রযাত্রা রোধ করা, এমনকি কিছু এলাকা থেকে তাদের পিছু হটানোও।
জানুয়ারির শুরুতে জেনারেল ডনাহু ও ক্যাভোলি কিয়েভে জেনারেল সিরস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পেন্টাগন কর্মকর্তা জানান, তারা ইউক্রেনীয় ব্রিগেডগুলো পুনর্গঠন এবং প্রতিরক্ষা লাইন শক্তিশালী করার পরিকল্পনায় সম্মত হন। এরপর তারা রামস্টাইন বিমান ঘাঁটিতে যান। সেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অস্টিনের সঙ্গে জোট প্রতিরক্ষা প্রধানদের শেষ সম্মেলন হয়। কিন্তু এরপর সবকিছু বদলে যায়।
বন্ধ দরজার পিছনে অস্টিনের সহকর্মীরা তাকে এই জোটের “গডফাদার” ও “স্থপতি” হিসেবে অভিহিত করেন। আস্থাহানি ও বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও এই জোটই ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ ও আশাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। ২০২২ সালের সেই বসন্তের দিনে ভিজবাডেনে জেনারেল ডনাহু ও জাব্রডস্কির প্রথম সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।
অস্টিন দৃঢ়চেতা ও আবেগপ্রবণতার বাইরের মানুষ। কিন্তু যখন তিনি তাদের প্রশংসার জবাব দিলেন, তার কণ্ঠ যেন আটকে গেল।
বিদায়কালে চোখের পানি সামলে তিনি বলেন, “বিদায়ের বদলে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি আপনাদের সবার জন্য সাফল্য, সাহস ও দৃঢ়তা কামনা করি। মহোদয় ও মহোদয়াগণ, এগিয়ে যান।”
নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।
পূর্ববর্তী পর্ব: