নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর চারদিকে আলোচনা বিএনপির মন্ত্রিসভা কেমন হবে, কী হবে পররাষ্ট্র নীতি, কিংবা শেখ হাসিনার বিষয়টিই বা কীভাবে সুরাহা হবে কীভাবে।
প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনে এসে এরকম নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে শনিবারের এ সংবাদ সম্মেলনে তার ডানে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বামে খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
মঈন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ছাড়াও দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে বসে তিনি নানা বিষয়ে আসা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন বেশ ধীরস্থির ভাবে, অল্প কথায়।
নির্বাচনে ২০৯ আসনে জয়ী হয়েছে বিএনপি। সোমবার তাদের শপথ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চে উপবিষ্টদের বেশিরভাগই বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন এমনটি শোনা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে এক প্রশ্ন রাখা হলে তারেক রহমান বলেন, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ছয়শ’র বেশি মামলা হয়েছে শেখ হাসিনার নামে। এর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাদের অভিযোগে একটি মামলায় তাকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দিয়েছে যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল।
মানুষের মধ্যে যেখানে আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক রয়েছে, সেই বিবেচনায় সমস্যা সমাধান বা মিটমাটের জন্য পরিকল্পনা কী, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে।”
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় বা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না- এমন প্রশ্ন করেছিলেন এক সাংবাদিক।
জবাব নিজে না দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কোটে পাঠিয়ে দেন লন্ডনে ১৭ বছর নির্বাসনে থাকা খালেদার ছেলে।
পরে আমীর খসুরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এটি বিচার বিভাগের বিষয়”।
বিএনপি সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চালিয়ে যাবে কি না এমন আরেকটি প্রশ্ন এলেও এড়িয়ে গেছেন বিএনপির নেতারঅ।

সংবাদ সম্মেলনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বেও খুব অল্প কথায় জবাব দিয়ে গেছেন তারেক রহমান।
সম্পর্ক, অর্থনীতি, জুলাই সনদ
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে কেমন সম্পর্কের পরিকল্পনা করছেন তারা। তারেক রহমান বলেন, “আমি ইতোমধ্যে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। তারপরও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাহেবকে বলতে বলছি।”
তখন আমীর খসরু বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্র নীতি ইতোমধ্যে আমি বলেছি। দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে আমাদের পলিসি হবে।”
তারেক রহমান বলেন, ‘‘আমাদের দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে আমরা সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ব। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, অভিন্ন স্বার্থ প্রাধান্য পাবে সবার আগে।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, “আমাদের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চাইনিজ বন্ধুরা আছেন। আমরা আশা করি, দুই দেশ সামনের দিনগুলো আরও নিবিড়ভাবে একসঙ্গে কাজ করবে।”
জুলাই আন্দোলনের পর দেশের অর্থনীতি শ্লথ হয়ে যায়। কমে যায় বিদেশি বিনিয়োগ। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি সচল করতে বিএনপি সরকারের উদ্যোগ জানতে চান আরেক সাংবাদিক।
জবাবে তারেক রহমান বলেন, “বেশি বেশি বিনিয়োগ আনতে হবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।” আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি মোকাবেলার বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা বলেছি যে, আইন সবার জন্য সমান।
“আইন যদি সবার জন্য সমান হয়ে থাকে, আমরা ইনশাল্লাহ সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পরে চেষ্টা করব, আইন যেন আইনের মতো করে চলে। সেটাই আমাদের পজিশন।”
বিগত সরকারের সময়ে লুটপাট ও পাচারকৃত অর্থ ফেরানোর বিষয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে সরাসরি জবাব না দিয়ে নিজেদের ইশতেহারের প্রসঙ্গ টানেন তিনি।
‘‘আপনি যদি আমাদের ইশতেহার দেখেন, সেখানে আপনার এই প্রশ্নের জবাবগুলো সুন্দরভাবে পাবেন। আমি ইশতেহারে বলেছি যে, গণতান্ত্রিক অর্থনীতি। অর্থাৎ আমরা এমন একটা অর্থনীতি সূচনা করতে চাই, যেখানে সবাই সবার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবেন।”
বিএনপি তাদের ৩১ দফা পরিকল্পনা বা নির্বাচনী ইশতেহারে যেমনটা বলেছে সেগুলোই বাস্তবায়ন করা হবে বলেও একাধিক উত্তরে উঠে আসে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন- ক্রিকেটকে রাজনীতির বাইরে রাখা হবে কি না। তবে এর কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি।
এর আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, “কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে, এজন্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর আমি সারাদেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আল্লাহর দরবারের শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে আমরা বিজয় উৎসব পালন করেছি।”
দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড “বরদাশত করা হবে না” বলেও জানান তিনি।
এছাড়া জুলাই সনদ নিয়ে তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, “আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ।”
সংবাদ সম্মেলনে আল-জাজিরা, বিবিসি, এবিসিসহ চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা বিএনপি চেয়ারম্যানকে প্রশ্ন করেন।



