খেয়ালি ট্রাম্প কি বিশ্বকে আরেকটি মন্দার দিকে ঠেলে দিলেন

খেয়ালি ট্রাম্প কি বিশ্বকে আরেকটি মন্দার দিকে ঠেলে দিলেন।
খেয়ালি ট্রাম্প কি বিশ্বকে আরেকটি মন্দার দিকে ঠেলে দিলেন।

এক দেশের পণ্য আরেক দেশে ঢুকতে গেলে শুল্ক আরোপ হবে, তাই স্বাভাবিক; কিন্তু তা নিয়ে খেয়ালি ডনাল্ড ট্রাম্প যা করলেন, তা কি ঘটে কখনও? অর্থনীতিবিদদের উত্তর আসছে, কস্মিনকালেও নয়।

বিবিসির অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক ফয়সাল ইসলাম বলেছেন, গত ১০০ বছরে বিশ্ববাণিজ্যে এত বড় পরিবর্তন আর কখনও দেখা যায়নি। সিএনএনের প্রতিবেদক স্টিফেন কলিনসন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এর আগের কোনো প্রেসিডেন্ট দেশের অর্থনীতি নিয়ে এত বড় জুয়া খেলেননি।

কী করেছেন ট্রাম্প, তা এরই মধ্যে সবার জানা হয়ে গেছে বুধবার তার সংবাদ সম্মেলনের পরপরই। শতাধিক দেশের পণ্যে সম্পূরক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এক কথায় শুল্ক ঝড় বইয়ে দিয়েছেন তিনি।

তার এই ঝড় সারাবিশ্বের পুঁজিবাজারই টালমাটাল করে দিয়েছে। এশিয়া থেকে আমেরিকা পর্যন্ত কোনো শেয়ার বাজারেই স্বস্তি ছিল না। অজানা আশঙ্কা নিরাপদ বিনিয়োগের পণ্য সোনার দর চড়িয়েছে আকাশে।

ধনকুবের ট্রাম্প যে নীতি ধরে এগোচ্ছেন, তাতে ১৯৩০ সালের পর আরেকটি মহামন্দার পদধ্বনির সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান জে পি মর্গান।

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেই ট্রাম্প চীন, মেক্সিকো ও কানাডার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরও দেশের ওপরও শুল্ক বসানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি।

বুধবার হোয়াইট হাউজের লনে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই তিনি ‘খুব ভালো’ খবর নিয়ে আসার ঘোষণা দেন। এরপর শতাধিক দেশের পণ্যে সম্পূরক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানান তিনি।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’- ভোটের প্রচারে ট্রাম্পের স্লোগান ছিল এটাই; শুল্ক আরোপের সেই ঘোষণা ওই নীতিরই প্রতিফলন বলে তুলে ধরেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, এই দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিন ধরে অপেক্ষা করছে। এই দিনকে আমেরিকান শিল্পের ‘পুনর্জন্ম’ এবং আমেরিকাকে ‘আবার সম্পদশালী’ করার দিন হিসেবে সবাই মনে রাখবে।

সিএনএনের কলিনসন লিখেছেন, ট্রাম্প ঠিকই বলেছেন, এই দিনটি সবাই মনে রাখবে। তবে মনে রাখবে বাণিজ্য শুধু শুরুর দিন হিসাবে।

আন্তর্জাতিক কোনো রীতি-নীতির পরোয়া না করে বেসামাল ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বিশ্ববাণিজ্যের গতিপথই বদলে দেবে বলে মনে করেন বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান।

তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে নানা নিয়ম-নীতির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলে আসছে। তার মধ্যে রয়েছে ‘মোস্ট ফেভারড নেশন-এমএফএন প্রিন্সিপাল। এর আওতায় কোনো দেশ অন্য দেশের ওপর ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ করতে পারে না।

“কিন্তু এখানে আমি দেখছি, ঘটনাটি একেবারে ভিন্ন। এমএফএন প্রিন্সিপালের বড় ধরনের ভায়োলেশন হচ্ছে। এখানে আমরা ডব্লিউটিওর ক্ষমতা সেভাবে দেখছি না। এর মধ্যদিয়ে ডব্লিউটিওর অক্ষমতা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে।”

এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে- সেই আভাস দিয়ে তিনি বলেছেন, “বোঝাই যাচ্ছে, ডব্লিউটিওর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আস্থা নেই এবং এরপর কিন্তু নানা ধরনের ইমপ্লিকেশন আমরা দেখতে পাব। এই অবস্থায় কোনও দেশের ডব্লিওটিএর কাছে গিয়ে প্রতিকার পাওয়ার কোনও সুযোগ হয়ত আমরা দেখতে পাব না।”

আবার ট্রাম্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও দেশ যদি এভাবে খেয়াল-খুশি মতো শুল্ক বসাতে থাকে, তাহলে গোটা বিশ্বের বাণিজ্যিক ব্যবস্থা জটিল রূপ নেবে বলে তার আশঙ্কা।

ট্রাম্পের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপের উন্নত দেশ থেকে শুরু করে এশিয়ার গরিব দেশ, সবাই সমালোচনায় মুখর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন, সেই যুদ্ধে নামতে সবাই নানা কৌশল সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এর মধ্যে জে পি মর্গানের বিশ্লেষকরা মন্দার শঙ্কা দেখার কথা জানিয়ে বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। এই মন্দায় যে শুধু যুক্তরাষ্ট্র পড়বে, তা নয়; বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশটি গোটা বিশ্বকে নিয়েই পড়বে।

বুধবার হোয়াইট হাউজে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

জে পি মর্গানের সতর্কবার্তা নিয়ে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যে ২০২৫ সালে ৪০ শতাংশ মন্দার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের নীতি অর্থনীতির গতি ধীর করে দেবে, এমন শঙ্কায় এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম গেছে পড়ে।

বিবিসির ফয়সাল ইসলাম বলছেন, ট্রাম্পের ঘোষণা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। এতদিন ধরে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলোর যে সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা ভেঙে পড়তে পারে।

ট্রাম্পের পরামর্শকদের ওপর উষ্মা প্রকাশ করে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক মাইকেল ব্লক সিএনএনকে বলেন, “তারা ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির এতদিনের সব রীতি-নীতি উপেক্ষা করেছেন। এটা একটি আত্মঘাতী পরিকল্পনা।”

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তাতে আমেরিকার কর আদায় বছরে ৬৬০ বিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে তার বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো হিসাব কষে দেখিয়েছেন।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যতটা দেখাচ্ছে, কর ততটা বাড়বে না। ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডি’র এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জানদি বলছেন, ৬০০ বিলিয়ন ডলার মুখের কথা নয়। ১০০ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলারও যদি বাড়ে, তাতেও সরকারকে সৌভাগ্যবান মনে করতে হবে।

কিন্তু কর বাড়ানোর এই চেষ্টায় মূল্যস্ফীতির ঘোড়া যে ছুটবে, তাতে ট্রাম্প লাগাম দেবেন কীভাবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বেশ কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে গত কয়েকবছর ধরেই হিমশিম অবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হয়, মূল্যস্ফীতিই ভোটের লড়াই ডেমোক্রেটদের ডুবিয়ে রিপাবলিকান ট্রাম্পকে ভাসিয়ে তুলেছে।

মাঝে কিছুটা কমলেও ট্রাম্পের পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি যে আবার চড়বে, সেই বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা মোটামুটি নিঃসন্দেহ। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোটা সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভজঘট লেগে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে আবার ‘শীর্ষ ধনী’ দেশে পরিণত করতেই এসব পদক্ষেপ-জনগণকে তাই বোঝাচ্ছেন ট্রাম্প। কিন্তু জনগণ দেখছে কোন চোখে?

রয়টার্স জনমত জরিপ চালিয়ে দেখেছে, বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর আমেরিকানদের সন্তুষ্টি গেছে কমে।

গত জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের চেয়ারে ফেরার পর তার জনপ্রিয়তা এখনই সবচেয়ে কম বলে এই জরিপে উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৩ শতাংশ বলেছেন, তারা ট্রাম্পের ওপর সন্তুষ্ট। এটা গত মার্চের ২২-২৩ তারিখের চেয়েও ২ শতাংশ পয়েন্ট কম। গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন ৪৭ শতাংশ আমেরিকান।

দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তৃতীয় বারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার অসম্ভব এক স্বপ্ন দেখছেন ট্রাম্প। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে যে ঝড় তুললেন তিনি, তাতে তিনিই না উড়ে যান, সেই সম্ভাবনাও জেগে উঠেছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads