যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার নতুন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্য আমদানিতে শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর বিভিন্ন দেশ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশের পণ্যের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের এই সিদ্ধান্তকে অনেক দেশই ‘বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করবে এবং বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসতে পারে।
কার কী প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ: ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত জানানোর পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক পর্যালোচনা করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দ্রুত শুল্ক যৌক্তিকীকরণের জন্য বিকল্প চিহ্নিত করছে, যা এই বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয়।
ইইউ: ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রধান উরসুলা ফন ডের লেয়েন বলেছেন, “(উচ্চ শুল্ক আরোপের) এই সিদ্ধান্তের পরিণতি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য ভয়াবহ হবে।” তিনি জানিয়েছেন, ইইউ ইতোমধ্যে ইস্পাত পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিক্রিয়া প্যাকেজ চূড়ান্ত করছে।
চীন: যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে বিশ্বের অনেক দেশের পাশাপাশি চীনা পণ্যেও উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘দৃঢ় পাল্টা ব্যবস্থা’ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন।
কানাডা: ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, “উদ্দেশ্যপূর্ণ ও জোরালোভাবে ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।”
ইতালি: আমদানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপকহারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেনইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। একইসঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বড় আকারে একটি বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া: ট্রাম্প প্রশাসন অস্ট্রেলিয়ার পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানানোর পর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবেনিজ এক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ‘অবন্ধুসুলভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, “এটি কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের কাজ নয়।”
দক্ষিণ কোরিয়া: ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্য আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সু বলেছেন, “বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ এখন বাস্তবতা।”
আয়ারল্যান্ড: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় আয়ারল্যান্ডের সরকারপ্রধান মাইকেল মার্টিন এক ‘অন্যায্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই শুল্কের কোনো ন্যায্যতা তিনি দেখছেন না।
সুইজারল্যান্ড: ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সুইজারল্যান্ডের পণ্য আমদানিতে ৩১ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট করিন কেলার-সুটার অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার দেশ দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।

এর আগে ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে হোয়াইট হাউজে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর নতুন হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
নতুন করে উচ্চ মাত্রায় এই শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান দুই রপ্তানি বাজারের একটি যুক্তরাষ্ট্র। অন্যটি ইউরোপ। দুই বাজারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে বছরে পণ্য রপ্তানি হয় প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলারের, যা প্রধানত তৈরি পোশাক।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ, পাকিস্তানের পণ্যের ওপর ২৯ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কার পণ্যের ওপর ৪৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ৩৪ শতাংশ।
অন্য দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, লাওসের পণ্যে ৪৮ শতাংশ, মাদাগাস্কারের পণ্যে ৪৭ শতাংশ, মিয়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের পণ্যে ৪৬ শতাংশ, থাইল্যান্ডের পণ্যে ৩৬ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ৩২ শতাংশ, সুইজারল্যান্ডের পণ্যে ৩১ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যে ৩০ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে ২৫ শতাংশ, জাপান ও মালয়েশিয়ার পণ্যে ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যে ২০ শতাংশ, ইসরায়েল ও ফিলিপাইনের পণ্যে ১৭ শতাংশ এবং চিলি, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও কলম্বিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রর প্রেসিডেন্ট।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের বিদেশি গাড়ি আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।